একজন বাবা বা মা সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন কেন? উত্তরটা খুব সহজ—সন্তানদের একটু সুখে রাখার জন্য। এই ‘সুখে রাখা’র সমার্থক শব্দ হিসেবে আমরা সাধারণত ব্যাংক ব্যালেন্স, ফ্ল্যাট বা জমিজমাকুশল সম্পদকেই বুঝে থাকি। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, কেবল অঢেল সম্পদ অনেক সময় সন্তানের সুখের বদলে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, কোনো সম্পদ না রেখেও অনেক মা-বাবা সন্তানদের এমন কিছু দিয়ে গেছেন, যা তাদের বিশ্বজয়ী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল জড় সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর ব্যাপ্তি নৈতিকতা, আদর্শ এবং জীবনবোধের গভীরতম প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
সন্তানদের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের আগামীর সমাজ কাঠামোর ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
মা-বাবা যদি সৎ ও খোদাভীরু হন, তবে মহান আল্লাহ তাঁর কুদরতি ব্যবস্থাপনায় তাদের সন্তানদের হেফাজত করেন।
সন্তানের জন্য মা-বাবার রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় আমানত হলো মা-বাবার নিজস্ব নেক আমল বা পুণ্যময় জীবন। মা-বাবা যদি সৎ ও খোদাভীরু হন, তবে মহান আল্লাহ তাঁর কুদরতি ব্যবস্থাপনায় তাদের সন্তানদের হেফাজত করেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা কাহাফে বর্ণিত খিজির ও মুসা (আ.)-এর সেই দেয়াল মেরামতের ঘটনাটি আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। সেখানে এতিম দুই শিশুর গুপ্তধন রক্ষার জন্য দেয়ালটি মেরামত করা হয়েছিল, যার কারণ হিসেবে আল্লাহ বলেন, “আর তাদের পিতা ছিলেন একজন নেককার মানুষ।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৮২)
পিতার সচ্চরিত্র কীভাবে সন্তানদের রক্ষা করে, সে সম্পর্কে প্রখ্যাত তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির (র.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ একজন নেককার ব্যক্তির কারণে তার সন্তান, নাতি-পুতি এমনকি তার আশপাশের ঘরবাড়িগুলোকেও হেফাজত করেন এবং আল্লাহ তাদের ওপর একটি সুরক্ষা বজায় রাখেন।” (আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৩/১৪৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮)
অর্থাৎ, আমাদের সততা আমাদের অবর্তমানে সন্তানদের জন্য এক অদৃশ্য নিরাপত্তার চাদর হয়ে কাজ করে।
উত্তরাধিকার হিসেবে কেবল বুলি নয়, বরং অভ্যাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শৈশবে কনকনে শীতের রাতে বাবাকে দেখে যে সন্তান ফজরের নামাজে যাওয়ার অভ্যাস করে, সেই অভ্যাস তার জীবনের বড় পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের উত্তরাধিকারের এই তালিকায় কেবল ইবাদত নয়, বরং সামাজিক শিষ্টাচার বা ‘আদব’ থাকা বাঞ্ছনীয়।
বর্তমানে আমাদের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর একটি প্রধান কারণ হলো, আমরা সন্তানদের ‘ক্যারিয়ার’ গড়তে যতটা মনোযোগী, ‘সংসার’ গড়তে ততটা নই।
একজন ছেলেকে যদি পরিবারে দায়িত্বশীলতা না শেখানো হয়, তবে সে ভবিষ্যতে একজন ভালো স্বামী হতে পারে না। একইভাবে, একটি মেয়েকে যদি কেবল ভোগের মানসিকতায় বড় করা হয়, তবে সে দাম্পত্যের ত্যাগ ও মমত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়। আমাদের উচিত সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা অন্যের কথা শুনতে শেখে এবং ভালোটা গ্রহণ করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা অনুসরণ করে; তাদেরই আল্লাহ হেদায়েত দিয়েছেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সুরা জুমার, আয়াত: ১৮)
সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া মা-বাবার অকৃত্রিম উপদেশগুলো হলো তাদের জীবনের দিশারি। দীর্ঘ জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্জিত প্রজ্ঞা যখন অল্প কথায় সন্তানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন তা তাদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করে।
যদিও বর্তমান প্রজন্মের অনেক সন্তান মনে করে মা-বাবা ‘পুরনো ধ্যান-ধারণার’ মানুষ, তবুও আন্তরিক ও ভালোবাসা মাখা উপদেশের প্রভাব কখনো ফুরিয়ে যায় না।
তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়; মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯০৫
ইসলামি ইতিহাসের মহান ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে জীবনের এক শ্রেষ্ঠ নসিহত করেছিলেন। আবদুল্লাহ (র.) বর্ণনা করেন, “আমি বললাম, আব্বা, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, হে বৎস, সবসময় ভালো কাজের নিয়ত রেখো; কারণ যতক্ষণ তুমি ভালোর নিয়ত রাখবে, ততক্ষণ তুমি কল্যাণেই থাকবে।” (আবু বকর আল-খলাল, আস-সুন্নাহ, ১/১০৪, দারুর রায়াহ, রিয়াদ, ১৯৮৯)
এই ছোট একটি বাক্য একজন মানুষের পুরো জীবনের দর্শন বদলে দিতে পারে।
মা-বাবার দোয়া সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়; মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১৯০৫)
আমরা যখন আমাদের সন্তানদের জন্য দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলি, তখন সেই দোয়াগুলো আরশে আজিমে পৌঁছে যায়। সন্তানদের সুস্থতা, নেক হায়াত এবং ইমানের ওপর অটল থাকার জন্য আমাদের দোয়াগুলোই হতে পারে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা আমাদের মৃত্যুর পরও তাদের ছায়া দিয়ে যাবে।
সন্তানের অন্তরে আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস বা ইমান গেঁথে দেওয়া মা-বাবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। জীবনের কঠিন সংকটে যখন মানুষ একা হয়ে পড়ে, তখন কেবল এই ইমানই তাকে হতাশা থেকে মুক্তি দেয়। সন্তানকে শেখানো উচিত যে, দুঃখের পরেই সুখ আসে। আল্লাহ তাআলা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)
এই দৃঢ় বিশ্বাস যদি সন্তানের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া যায়, তবে সে পৃথিবীর কোনো ঝড়েই ভেঙে পড়বে না। সে জানবে যে, তার মা-বাবা পাশে না থাকলেও তার প্রতিপালক সবসময় তার সঙ্গেই আছেন।
আমরা সন্তানদের জন্য যে সম্পদ রেখে যাচ্ছি, তার উৎস কী—তা একবার ভেবে দেখা জরুরি। উপার্জনের মাধ্যম যদি হালাল না হয়, তবে সেই সম্পদ সন্তানের জন্য বরকত নয় বরং অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। হারাম টাকায় বড় হওয়া সন্তানের মধ্যে অবাধ্যতা ও চারিত্রিক স্খলন ঘটা স্বাভাবিক।
যে পরিবারে ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা থাকে, সেই পরিবারে আল্লাহর রহমত সবসময় বর্ষিত হয়।
কেয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার সম্পদের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা তার পা সরাতে পারবে না যতক্ষণ না তাকে চারটি প্রশ্ন করা হয়... তার মধ্যে একটি হলো—সে তার সম্পদ কোথা থেকে আয় করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে?” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
তাই সন্তানদের জন্য পাহাড়সম সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে ‘হালাল’ ও ‘বরকতময়’ সামান্য সম্পদ রেখে যাওয়া অনেক বেশি কল্যাণকর।
মা-বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের বন্টন নিয়ে ভাই-বোনের মধ্যে মারামারি ও মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়া আমাদের সমাজের এক নিত্যনৈমিত্তিক ট্র্যাজেডি। আমরা যদি সন্তানদের উত্তরাধিকার হিসেবে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা দিয়ে যেতে না পারি, তবে কোটি টাকা রেখে গেলেও তারা শান্তিতে থাকবে না।
সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। তাদের শেখাতে হবে যে, রক্ত ও আত্মার সম্পর্ক পৃথিবীর যেকোনো বৈষয়িক স্বার্থের চেয়ে বড়। যে পরিবারে ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা থাকে, সেই পরিবারে আল্লাহর রহমত সবসময় বর্ষিত হয়।
সন্তানের প্রকৃত উত্তরাধিকার হলো একটি সুন্দর আদর্শ, মজবুত চরিত্র এবং নির্মল ভালোবাসা। আমরা যখন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, তখন আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স আমাদের সঙ্গে যাবে না, এমনকি সন্তানদেরও তা চিরদিন আগলে রাখতে পারবে না। কিন্তু আমাদের শেখানো নৈতিকতা, আমাদের নেক আমলের বরকত এবং আমাদের দেওয়া সুশিক্ষা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সাহস জোগাবে।
আসুন, আমরা সন্তানদের কেবল ধনী হিসেবে নয়, বরং ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার উত্তরাধিকার রেখে যাই। কারণ, একটি সৎ ও যোগ্য সন্তানই হলো মা-বাবার জন্য শ্রেষ্ঠ ‘সদকায়ে জারিয়া’।