ইবাদত

কোরআনের মাস রমজান

রমজান যে কোরআনের মাস—এ কথাটি শুধু প্রচলিত বক্তব্য নয়; বরং কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত একটি সত্য। রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক এত গভীর যে এ মাসের পরিচয়ই হয়ে গেছে কোরআন অবতরণের মাস হিসেবে।

এ কারণে রমজানে কোরআন শিক্ষা করা, কোরআন শেখানোর উদ্দেশ্যে জমায়েত হওয়া, যোগ্য কারির নিকট তেলাওয়াত শুনানো এবং অধিকহারে কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকা—এসব আমল বিশেষভাবে মুস্তাহাব ও ফজিলতপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ফাতেমা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে জানা যায়, নবীজি (সা.)–এর কাছে প্রতি বছর জিবরাইল (আ.) একবার করে তেলাওয়াতের মাধ্যমে পূর্ণ কোরআন পেশ করতেন; কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের বছরে তা দুইবার পেশ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭১২)

বোঝা যায়, রমজান মাসে কোরআনের পুনরালোচনা, পাঠচক্র ও খতমের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, এ পাঠচক্রটি হতো রাতে। ফলে রমজানের রাত কোরআন তেলাওয়াতের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী সময়।

রমজান মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫

রাতের ইবাদত সম্পর্কে আল্লাহ–তাআলা  বলেন, “নিশ্চয়ই রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দমনে অধিক সহায়ক এবং উচ্চারণে অধিক স্থির।” (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৬)।

রাতের নির্জনতা, কর্মব্যস্ততার অবসান এবং হৃদয়ের স্থিরতা—এসব কারণে কোরআন গভীর অনুধাবনের জন্য রাত বিশেষ উপযোগী। এ সময় দিল ও জবান একসঙ্গে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে; ফলে তেলাওয়াত শুধু শব্দোচ্চারণে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে।

রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দলিল হলো আল্লাহ–তাআলার ঘোষণা, “রমজান মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

এ আয়াত রমজানকে কোরআনের মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লায়লাতুল কদরের রাতে লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে অবস্থিত ‘বাইতুল ইজ্জত’-এ পূর্ণ কোরআন একবারে অবতীর্ণ করা হয়।

এ বিষয়ে আল্লাহ–তাআলা  বলেন, “নিশ্চয় আমি তা লায়লাতুল কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।” (সুরা কদর, আয়াত: ১)

অন্যত্র বলেন, “নিশ্চয় আমি তা এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি।” (সুরা দুখান, আয়াত: ৩)

এসব আয়াত ও বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয়, রমজান শুধু রোজার মাস নয়; এটি ওহির সূচনা ও কোরআনের অবতরণের মাস।

মুসনাদে আহমাদে ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবী ইব্রাহিম (আ.)–এর সহিফা, মুসা (আ.)–এর তাওরাত, ইসা (আ.)–এর ইনজিল এবং শেষ নবীর ওপর অবতীর্ণ কোরআন—সবই রমজান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৯৮৪)

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রমজান আসমানি কিতাবসমূহের অবতরণের মাস হিসেবেও বিশেষ মর্যাদা রাখে।

নবীজির আমল ছিল রমজানের রাতের নামাজে দীর্ঘ কেরাত করা। হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা.)-এর বর্ণনায় জানা যায়, এক রাতে তিনি নবীজির সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়ে দেখেন—তিনি সুরা বাকারা, তারপর সুরা নিসা, তারপর সুরা আলে ইমরান তেলাওয়াত করছেন। ভয়ের আয়াত এলে থেমে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন।

এত দীর্ঘ তেলাওয়াত ছিল যে দুই রাকাত পড়তে পড়তেই ফজরের সময় এসে যায়। এ ঘটনা রমজানের কিয়ামুল লাইলের গভীরতা ও কোরআনমুখী চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৩৯৯)

তাবেয়িদের যুগে দেখা যায়, আট রাকাতে সুরা বাকারা শেষ হলে তা স্বাভাবিক ধরা হতো; বারো রাকাতে শেষ হলে তা সহজ মনে করা হতো।

খেলাফত লাভের পর ওমর (রা.) তারাবির নামাজে জামাতের ব্যবস্থা করেন এবং উবাই ইবনে কাব ও তামিম দারি (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করেন। তারা প্রতি রাকাতে দুইশত আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেন। মুসল্লিরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে লাঠিতে ভর দিতেন। কখনও খুঁটির সঙ্গে রশি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

এ দৃশ্য আমাদের জানিয়ে দেয়, কোরআনের প্রতি তাদের ভালোবাসা কত গভীর ছিল।

তবে হজরত ওমর (রা.) বাস্তবতার দিকও বিবেচনায় রাখতেন। তিনি দ্রুত, মধ্যম ও ধীরগতির কারিদের পৃথক নির্দেশনা দেন—কেউ ৩০ আয়াত, কেউ ২৫ আয়াত, কেউ ২০ আয়াত করে তেলাওয়াত করবে। তাবেয়িদের যুগে দেখা যায়, আট রাকাতে সুরা বাকারা শেষ হলে তা স্বাভাবিক ধরা হতো; বারো রাকাতে শেষ হলে তা সহজ মনে করা হতো।

অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল প্রবল, তবে মানুষের সামর্থ্যও বিবেচনায় রাখা হতো।

ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ (রহ.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, প্রতি রাকাতে কত আয়াত তেলাওয়াত করা উচিত—তিনি দশ আয়াতের কমে সম্মতি দেননি। ইমাম মালেক (রহ.)-ও দশ আয়াতের কম তেলাওয়াতকে মাকরুহ মনে করতেন।

কিন্তু ইমাম আহমাদ (রহ.) সময় ও মানুষের অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখে বলতেন, বর্তমান ছোট রাত ও দুর্বল মানুষের কথা বিবেচনা করতে হবে।

একবার তিনি তার শিষ্যকে বলেছিলেন, পাঁচ-ছয়-সাত আয়াত করে তেলাওয়াত করতে। শিষ্য এভাবে ২৭ রমজানে কোরআন খতম করেন। এতে বোঝা যায়, মূল লক্ষ্য কোরআনের সঙ্গে সংযোগ; তবে তা যেন কষ্টসাধ্য হয়ে না পড়ে।

আবু জর (রা.)-এর হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) ২৩ রমজানে রাতের এক-তৃতীয়াংশ, ২৫ রমজানে অর্ধরাত পর্যন্ত সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায় করেন। সাহাবিরা অনুরোধ করলে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে নামাজ আদায় করে এবং ইমাম শেষ করা পর্যন্ত অবস্থান করে, তার আমলনামায় পূর্ণ রাতের নেকি লেখা হয়।

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, জামাতে তারাবি ও কিয়ামুল লাইল আদায় করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮০৬)

পূর্বেকার বুজুর্গদের আমল ছিল রমজানে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা। কেউ তিন রাতে এক খতম করতেন, কেউ সাত রাতে, কেউ দশ দিনে। কাতাদা (রহ.) সারা বছর সাত দিনে খতম করতেন; রমজানে তিন দিনে, আর শেষ দশকে প্রতি রাতে এক খতম করতেন।

যদিও তিন দিনের কমে কোরআন খতম করা সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়, কিন্তু রমজানের মতো বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সময়ে, শবে কদর তালাশের রাতগুলোতে কিংবা মক্কার মতো বরকতময় স্থানে অবস্থানকালে অধিক তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) রমজানে নামাজের বাইরে ষাটবার কোরআন খতম করতেন বলে বর্ণিত আছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ব্যাপারেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব ঘটনা আমাদের কোরআনের প্রতি তাদের নিবেদন ও ভালোবাসার গভীরতা বুঝিয়ে দেয়।

ইমাম জুহরি (রহ.) রমজান এলে বলতেন, এ হলো কোরআন তেলাওয়াতের মাস এবং মানুষকে আহার করানোর মাস। ইমাম মালেক (রহ.) রমজান শুরু হলে হাদিসের দরস ও অন্যান্য মজলিস ছেড়ে কোরআন তেলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন।

সুফিয়ান সাওরি (রহ.) অন্যান্য ইবাদত কমিয়ে কোরআনের দিকে ঝুঁকতেন। হজরত আয়েশা (রা.) প্রভাতে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। জুবাইদ ইয়ামি (রহ.) তার শিষ্যদের নিয়ে কোরআনের পাণ্ডুলিপি সামনে রেখে জমায়েত হতেন। অর্থাৎ রমজান ছিল কোরআনকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মাস।

যদিও তিন দিনের কমে কোরআন খতম করা সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়, কিন্তু রমজানের মতো বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সময়ে, শবে কদর তালাশের রাতগুলোতে কিংবা মক্কার মতো বরকতময় স্থানে অবস্থানকালে অধিক তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। বহু ইমাম এ মত সমর্থন করেছেন।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি কোরআনের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপনের মাস। এ মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, এ মাসে নবীজি জিবরাইলের সঙ্গে কোরআন পুনরালোচনা করেছেন, এ মাসে তিনি দীর্ঘ কেরাতে নামাজ পড়েছেন, সাহাবি ও সালাফগণ কোরআনের খতমে প্রতিযোগিতা করেছেন।

ফলে রমজানকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করতে চাই, তবে কোরআনকে জীবনের কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে—তেলাওয়াত, তাদাব্বুর, আমল ও শিক্ষা—সব দিক থেকেই। রমজান আমাদের শেখায়, কোরআনের সঙ্গে গভীর সংযোগই হলো তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির প্রকৃত পথ।