তাফসির ও কোরআন গবেষকেরা ওহি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ওহি কত প্রকার ও কীভাবে আসত, সে বিষয়ে তাঁরা কথা বলেছেন।
বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমেই আমরা পবিত্র কোরআনের আসল উৎস সম্পর্কে জানতে পারি। কোরআন কীভাবে আমাদের কাছে পৌঁছাল, তা বোঝার জন্য ওহি সম্পর্কে জানা জরুরি।
কিছু মানুষ শুধু দেখা যায় এমন বস্তুতে বিশ্বাস করে এবং অদেখা জগৎকে (গায়েব) অস্বীকার করে। এটা তাদের বুঝের অভাব। শরীরের জন্য যেমন খাবারের প্রয়োজন, আত্মার উন্নতির জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ শক্তির প্রয়োজন। আল্লাহ তাঁর পছন্দমতো পবিত্র মনের মানুষদের ওহি পাঠানোর জন্য বেছে নেন। তাঁরা হলেন নবী ও রাসুল।
মানুষ ইতিহাসের পাতায় ওহির প্রভাব দেখেছে। ওহির নির্দেশ পালন করে অনেক সভ্যতা ও জাতি শক্তিশালী হয়েছে। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-ই প্রথম ওহি পাননি, বরং তাঁর আগেও অনেক রাসুল ওহি পেয়েছেন।
মানুষের কাছে কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে আমি তাদেরই মধ্যকার একজন লোকের কাছে ওহি পাঠিয়েছি যে লোকদের সতর্ক করে দাও।কোরআন, সুরা ইউনুস, আয়াত: ২
বর্তমানে মানুষ মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলছে বা ছবি দেখছে। মানুষ যদি নিজের বুদ্ধিতে দূর থেকে যোগাযোগের উপায় বের করতে পারে, তবে আল্লাহ কি তাঁর নবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা কথা বলতে পারেন না? এটি অস্বীকার করা বা আশ্চর্য হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। (দিরাসাতুন ফি উলুমিল কুরআন, ফাহাদ রুমি, পৃ. ১৮৯)
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কাছে কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে আমি তাদেরই মধ্যকার একজন লোকের কাছে ওহি পাঠিয়েছি যে লোকদের সতর্ক করে দাও, আর যারা ইমান আনে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে মহা মর্যাদা, (কিন্তু) কাফেররা বলে, “এ ব্যক্তি তো প্রকাশ্য জাদুকর।”’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ২)
মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত। দেহের খাবারের যেমন ভালো-মন্দ দিক আছে, আত্মার খাবারেরও তেমনি ভালো-মন্দ আছে। মানুষ যখন আত্মাকে সঠিক খাবার দেয়, তখন সে উপকৃত হয় এবং যাবতীয় রোগ থেকে মুক্ত থাকে। আর আত্মার সঠিক খাবার হলো শুদ্ধ বিশ্বাস এবং একত্ববাদ (তাওহিদ)। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমেই আত্মা সুস্থ থাকে।
আল্লাহ আত্মার এই খাবারের ব্যবস্থা নিজের পক্ষ থেকেই করেছেন। তিনি ওহির মাধ্যমে রাসুলদের কাছে এই দিকনির্দেশনা পাঠান। এই ওহি মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল নিশ্চিত করে। রাসুলরা মানুষের কাছে এই ওহি পৌঁছে দেন। এরপর কেউ সঠিক পথে চলে, আবার কেউ পথভ্রষ্ট হয়। আল্লাহ মানুষের ওপর কোনো জুলুম করেন না। তিনি দেহ ও আত্মা—উভয়ের খাবারের ব্যবস্থাই করে রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এভাবে আমি তোমার প্রতি আরবি ভাষায় কোরআন ওহি করেছি, যাতে তুমি মূল জনপদ (মক্কা) ও তার আশপাশের মানুষদের সতর্ক করতে পারো। আর সতর্ক করতে পারো কেয়ামত দিবস সম্পর্কে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেদিন একদল থাকবে জান্নাতে আর একদল থাকবে জাহান্নামে।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৭)
সহজ কথায়, সাধারণ লোক জানবে না, এমন কৌশলে কাউকে দ্রুত কোনো সংবাদ পৌঁছানোকেই আরবি ভাষায় শাব্দিক অর্থে ওহি বলা হয়।
শাব্দিক অর্থে ওহি মানে হলো অত্যন্ত গোপনে এবং খুব দ্রুত কোনো তথ্য বা সংবাদ জানানো।
এটি মূলত এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে যাকে সংবাদ দেওয়া হচ্ছে শুধু সেই বুঝতে পারে; বাইরের অন্য কেউ তা বুঝতে পারে না। আভিধানিক ইমাম ইবনে ফারিস এ সম্পর্কে বলেছেন:
‘ওহি হলো, ইশারা করা, লিখে দেওয়া বা চিঠি পাঠানো। মোটকথা, আপনি যেকোনো উপায়ে অন্যের কাছে কোনো বিষয় পৌঁছে দিলেন এবং সে তা জেনে গেল, তাকেই ওহি বলা হয়।’ (মাকাইসুল লুগাহ, ইবনে ফারিস, ৬/৯৩)
সহজ কথায়, সাধারণ লোক জানবে না, এমন কৌশলে কাউকে দ্রুত কোনো সংবাদ পৌঁছানোকেই আরবি ভাষায় শাব্দিক অর্থে ওহি বলা হয়।
শরিয়তের পরিভাষায় ওহি হলো, আল্লাহ তাঁর নবীদের বিশেষ পন্থায় তাঁর হুকুম, শরিয়তের আইন বা অদেখা জগতের যে খবর জানান, তাকেই ওহি বলা হয়। (আল-ওহিউল মুহাম্মাদি, রশিদ রেজা, পৃ. ৪৪)
ওহির শাব্দিক অর্থ অনেক ব্যাপক হলেও শরিয়তের পরিভাষায় এটি আল্লাহ ও তাঁর নবীদের মধ্যকার একটি বিশেষ যোগাযোগ। অনেক আলেম ওহি বলতে ‘আল্লাহর কালাম’ বা পবিত্র কোরআনকেও বুঝিয়ে থাকেন। ওহির মাধ্যমে পাওয়া এই জ্ঞানে কোনো সন্দেহ বা ভুলের অবকাশ নেই। (দিরাসাতুন ফি উলুমিল কুরআন, ফাহাদ রুমি, পৃ. ১৭৬)
ওহির সপক্ষে কোরআনে অনেক দলিল আছে।
আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন ওহির মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করে। তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়। এভাবে (উপরিউক্ত তিনটি উপায়েই) আমার নির্দেশের মূল শিক্ষাকে তোমার কাছে আমি ওহিযোগে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৫১-৫২)
শরিয়তের পরিভাষায় ওহির ধরন ও স্তর মৌলিকভাবে চারটি।
এক. ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন (স্বপ্নাদেশ): এটি ওহির প্রথম ধাপ। নবীদের স্বপ্ন সত্য ও ওহি হিসেবে গণ্য। আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাসুলের কাছে ওহি শুরু হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা সকালের ভোরের আলোর মতো বাস্তব হয়ে ধরা দিত।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর: ৬৯৮২)
দুই. হৃদয়ে ওহি ফুঁকে দেওয়া (ইলহাম): ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) যখন অদৃশ্য থেকে নবীর অন্তরে কোনো বিষয় সরাসরি প্রবেশ করিয়ে দিতেন। এটি মূলত হাদিসের ক্ষেত্রে বেশি হতো।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (রুহুল কুদুস) আমার হৃদয়ে এ কথা ফুঁকে দিয়েছেন যে কোনো মানুষ তার বরাদ্দকৃত রিজিক শেষ না করা পর্যন্ত মরবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুন্দর উপায়ে রিজিক সন্ধান করো।’ (শারহুস সুন্নাহ, বাগাভি, ১৪/৩০২)
আত্মার প্রশান্তি এবং সঠিক পথের দিশা পেতে মানুষ যেমন আল্লাহর মুখাপেক্ষী, ঠিক তেমনি সেই দিশা পৌঁছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ওহি।
তিন. পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি কথা বলা: যখন আল্লাহ সরাসরি কোনো নবীর সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু নবী আল্লাহকে দেখেন না। এটি নবী মুসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে হয়েছে এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে মিরাজের রাতে হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমার কাছে ওহি পাঠিয়েছি যেমন নুহ ও তার আগের নবীদের নিকট ওহি পাঠিয়েছিলাম, আর ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধর আর ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সোলাইমানের কাছেও ওহি পাঠিয়েছিলাম আর আমি দাউদকে জাবুর প্রদান করেছিলাম। আমি সেই রাসুলদের প্রতিও ওহি পাঠিয়েছি যাদের সম্পর্কে আমি তোমাকে আগেই বলেছি, আর অনেক রাসুল যাদের কথা আমি তোমাকে বলিনি। আর আল্লাহ মুসার সঙ্গে কথা বলেছেন সরাসরি।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৬৩-১৬৪)
চার. ফেরেশতার মাধ্যমে আসা ওহি: জিবরাইল (আ.) যখন আল্লাহর বার্তা নিয়ে নবীর সামনে আসতেন। কখনো তিনি নিজের আসল রূপে, আবার কখনো মানুষের বেশ ধরে আসতেন। পবিত্র কোরআনের সবটুকু এই পদ্ধতিতেই নাজিল হয়েছে। একে বলা হয় ওহিয়ে জলি বা সুস্পষ্ট ওহি।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাইল) একে নিয়ে অবতরণ করেছে, তোমার অন্তরে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ১৯৩-১৯৪)
ওহি মহান সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর প্রেরিত রাসুলদের মধ্যে যোগাযোগের এক অকাট্য ও অতিপ্রাকৃতিক মাধ্যম। আত্মার প্রশান্তি এবং সঠিক পথের দিশা পেতে মানুষ যেমন আল্লাহর মুখাপেক্ষী, ঠিক তেমনি সেই দিশা পৌঁছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ওহি। পবিত্র কোরআনের প্রতিটি বাণী ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর ভিত্তি হলো এই ওহি।
ওহির মাধ্যমেই মানুষ অদেখা জগৎ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করে এবং নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পায়।
সুতরাং ওহিকে মানবসভ্যতার উন্নয়ন ও আত্মিক মুক্তির চূড়ান্ত গাইডলাইন হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ওহির আলোই মানুষকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে মুক্ত করে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে পরিচালিত করে।
abdullahalbaqi00@gmail.com
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী