হাদিস

নবীজির (সা.) উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি: ৩

মহানবীর দাওয়াতি কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ ছিল ‘উপমা’। কোনো নির্দিষ্ট গুণের ভিত্তিতে যদি দুটো জিনিস একই রকমের হয়, তখন উপমা খুব দ্রুতই অপরিচিত জিনিসটিকে মানসপটে চিত্রিত করে তোলে। তাঁর উপমা থেকে স্পষ্ট হয় প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কত গভীর ছিল।

সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দিতে গিয়ে নবীজি (সা.) প্রায়ই প্রাণ ও প্রকৃতির পরিচিত ছবি টেনে আনতেন। কখনো প্রাণীর আচরণ, কখনো ফলের স্বাদ, আবার কখনো নদী ও সমুদ্রকে উপমা বানাতেন।

এসব উপমা থেকে তার প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য ও গভীর পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই নিবন্ধে আমরা এমনই কিছু উপমা হাজির করছি:

আগুন ও পতঙ্গ 

একদিন নবীজি (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার এবং মানুষের উদাহরণ ঠিক সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল, এরপর যখন চারদিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গ ও আগুনে আকৃষ্ট পোকাগুলো তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল।

লোকটি তখন সেগুলোকে আগুন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু তারা লোকটিকে পরাজিত করে আগুনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। (তেমনইভাবে) আমি তোমাদের কোমর ধরে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য টেনে ধরছি, অথচ তোমরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪৮৩)

এই হাদিসে মূল উপমান হলো আগুনে আকৃষ্ট পোকা। এই পোকা দিয়ে উদ্দেশ্য হলো অবিবেচক মানুষ। নবীজি (সা.) নিজের ভূমিকা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন যে আমার কাজ হলো মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানো, যদিও মানুষ সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পাগলপারা।

ঘোড়া

নবীজি (সা.) বলেন, ‘মুমিন এবং ইমানের উদাহরণ হলো সেই ঘোড়ার মতো, যাকে একটি খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঘোড়াটি আশপাশে ঘোরাঘুরি করে ঠিকই, কিন্তু শেষমেশ সে তার সেই খুঁটির কাছেই ফিরে আসে।

মুমিন ব্যক্তিও ঠিক তেমনই (মাঝেমধ্যে) অমনোযোগী হয়ে পড়ে, কিন্তু আবার সে ইমানের কাছেই ফিরে আসে। সুতরাং তোমরা তোমাদের খাবার থেকে পরহেজগারদের খাওয়াও এবং তোমাদের সৎকর্ম মুমিনদের দিকে ফেরাও।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩,৮৩৭; শুআবুল ইমান, বায়হাকি, হাদিস: ১০,৪৬০)

এখানে বোঝানো হয়েছে, মুমিন ব্যক্তি গোনাহ করতেই পারে, কিন্তু এরপরও সে তওবা করে ফিরে আসে। তার ইমান তাকে তওবা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না।

লেবু ও খেজুর

নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে মুমিন কোরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো উতরুজ্জাহ (লেবু–জাতীয় সুগন্ধি ফল)-এর মতো; যার স্বাদ মজাদার আর ঘ্রাণও চমৎকার। আর যে মুমিন কোরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো খেজুরের মতো; যার স্বাদ তো মিষ্টি কিন্তু কোনো ঘ্রাণ নেই।

অন্যদিকে যে পাপাচারী কোরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো রায়হানা (তুলসী–জাতীয় ফুল)–এর মতো; যার ঘ্রাণ তো চমৎকার কিন্তু স্বাদ তিক্ত। আর যে পাপাচারী কোরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো হানজালা (মাকাল ফল)–এর মতো; যার স্বাদও তিক্ত আর কোনো ঘ্রাণও নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,০২০)

গরু

নবীজি (সা.) বলেন, ‘অচিরেই এমন এক জাতির আবির্ভাব ঘটবে, যারা তাদের জিহ্বা দিয়ে এমনভাবে (দুনিয়ার ধনদৌলত) ভক্ষণ করবে, যেভাবে গরু তার জিহ্বা দিয়ে মাটি থেকে ঘাস খায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১,৫১৭)

একেই বাংলা বাগ্‌ধারায় ‘গোগ্রাসে খাওয়া’ বলে। নবীজি (সা.) এখানে এটাই উদ্দেশ্য করেছেন।

নদী

একদিন নবীজি (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘বলো তো যদি তোমাদের কারও বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকবে?’

তারা (সাহাবিরা) বললেন, ‘না, তার শরীরে কোনো ময়লাই বাকি থাকবে না।’

আল্লাহর রসুল (সা.) বললেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ ঠিক তেমনই; এর মাধ্যমেই আল্লাহ (বান্দার) গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮)

দলছুট ভেড়া

নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়াকে আঁকড়ে ধরো। কেননা, নেকড়ে সেই ভেড়াটিকে খেয়ে ফেলে, যে পাল থেকে আলাদা হয়ে দূরে চলে যায়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫৪৭)

স্বর্ণ ও রুপার খনি

নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষ হলো স্বর্ণ ও রুপার খনির মতো। তাদের মধ্যে যারা জাহেলি যুগে (ইসলামপূর্ব সময়ে) উত্তম ও শ্রেষ্ঠ ছিল, তারা ইসলাম গ্রহণ করার পরও শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে—যদি তারা (দ্বীনের) সঠিক জ্ঞান ও গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৬৩৮)

এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে মানুষের ভেতরে জন্মগতভাবে কিছু সম্ভাবনা থাকে। কেউ যদি কাফের হয়, তবু তার মধ্যে সম্ভাবনা থাকতে পারে। এরপর সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে এবং ধর্মীর গভীরতা নিয়ে চিন্তাফিকির করে, তবে সেই সম্ভাবনা তাকে আরও উচ্চতর স্থানে পৌঁছে দেবে।

সাহাবিদের মধ্যে হজরত ওমর ও খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) কাফের অবস্থাতেও সম্ভাবনাময় ছিলেন, এরপর ইসলামের মাধ্যমে তারা নিজেদের এই শক্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে সক্ষম হন।

ছাগল ও কুকুর

নবীজি (সা.) বলেন, যে মজলিশে বসে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা শোনে, কিন্তু পরে প্রচার করার সময় সে যা শুনেছে তার মধ্য থেকে শুধু মন্দ অংশটুকুই বর্ণনা করে—তার উদাহরণ সেই লোকের মতো, যে একজন রাখালের কাছে গিয়ে বলল, ‘হে রাখাল, তোমার পাল থেকে আমাকে একটা জবাই করার মতো ছাগল দাও।’

রাখাল তাকে বলল, ‘যাও, পালের মধ্যে তোমার যেই ছাগলটা সবচেয়ে ভালো মনে হয়, তার কান ধরে নিয়ে এসো।’ তখন লোকটি গিয়ে পালের (রক্ষা করার কাজে নিয়োজিত) কুকুরের কান ধরল! (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯,২৬০)

গাছ

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, (ফরজ গোসলের সময়) চুলের গোড়াগুলো ভেজাবে এবং চামড়া ভালোভাবে পরিষ্কার করবে। কারণ, যারা ভালোভাবে গোসল করে না, তাদের উদাহরণ হলো সেই গাছের মতো—যার ওপর পানি ছিটানো হয়েছে, কিন্তু তার পাতাও ভেজেনি আর গোড়াতেও প্রয়োজনমাফিক পানি পৌঁছায়নি। (আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবরানি, ২৫/৩৬; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস: ১,৪৭৪)

সমুদ্র

একবার মদিনায় শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিল। নবীজি (সা.) তখন সাহাবি আবু তালহার (সা.) ‘মানদুব’ নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন। এরপর তার ওপর সওয়ার হয়ে সীমান্তের দিকে চক্কর দিয়ে আসেন। ফিরে এসে বলেন, ‘আমি ভয় পাওয়ার মতো কিছু দেখিনি। কিন্তু এই ঘোড়াটি উত্তাল সমুদ্রের মতো (বেগবান) পেয়েছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৩০৭; সহিহ বুখারি, হাদিস: ২,৮৬২)

 mawlawiashraf@gmail.com

 মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক