পাথেয়

কাউকে উপদেশ দেওয়ার আগে ৮টি কথা মনে রাখুন

মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং সমাজকে সুন্দর করার অন্যতম সেরা উপায় হলো গঠনমূলক উপদেশ বা ‘নসিহত’ করা। কিন্তু পরামর্শ দেওয়ার কৌশল না জানা থাকলে সেই শুভাকাঙ্ক্ষাই অনেক সময় সম্পর্কে ফাটল ধরায়।

উপদেশ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো অপর মানুষকে ভালো হতে সাহায্য করা, তাকে হেয় করা বা অপমান করা নয়। ইসলামে উপদেশ দেওয়া শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি নবীদের সুন্নত এবং একটি বিশেষ শিল্প। পবিত্র কোরআনে ‘নসিহত’ বা উপদেশ দেওয়ার বিষয়টি অন্তত ১৩টি স্থানে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

নবী হুদ (আ.) তাঁর জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “আমি আমার প্রতিপালকের বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত উপদেশদাতা।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬৮)

যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে সংশোধন করে, সে তাকে উপদেশ দিল; আর যে প্রকাশ্যে সংশোধন করতে যায়, সে তাকে মূলত লজ্জিত ও হেয় করল।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)

নিজের ভুলত্রুটি মানুষ নিজে সহজে দেখতে পায় না। তাই বিশ্বাসীরা পরস্পরের জন্য আয়নার মতো কাজ করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়নাস্বরূপ।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯১৮)

কিন্তু কীভাবে উপদেশ দিলে তা মানুষের অন্তরে স্থান করে নেবে? এর জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা ও সঠিক কৌশল। কীভাবে সম্পর্ক বজায় রেখে নম্রতার সঙ্গে সঠিক উপায়ে উপদেশ দেওয়া যায়, তারই কিছু বাস্তবমুখী নীতি নিয়ে এই আলোচনা:

১. নিয়ত পরীক্ষা করা

পরামর্শ দেওয়ার আগে নিজের মনের নিয়ত পরীক্ষা করা আবশ্যক। আমি কি সত্যি সত্যি ওই মানুষের ভালো চাই, নাকি নিজের জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাই? উপদেশ হতে হবে খাঁটি মনে, শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

নিজের ব্যক্তিগত অহংকার প্রকাশের জন্য যে উপদেশ দেওয়া হয়, তা অন্তরকে কষ্ট দেয়।

২. একান্তে বলা

উপদেশ দেওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো তাকে একান্তে বলা। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, উপদেশ ও কটূক্তির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো উপদেশ দেওয়া হয় একান্তে ও নম্রভাবে, আর প্রকাশ্যে ভুল ধরিয়ে দেওয়া হলো এক ধরনের কটূক্তি। (আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ২/১৮২)

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইকে গোপনে সংশোধন করে, সে তাকে উপদেশ দিল; আর যে প্রকাশ্যে সংশোধন করতে যায়, সে তাকে মূলত লজ্জিত ও হেয় করল। (আশ-শাফেয়ি, দিওয়ানুশ শাফেয়ি, মাকতাবাতু ইবনে সিনা, কায়রো, ১৯৮৮ খ্রি., পৃষ্ঠা: ৫৪)

৩. অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা

কাউকে পরামর্শ দেওয়ার নামে তার ব্যক্তিগত জীবন বা গোপন বিষয় নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের গোপন ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহ তার গোপন ত্রুটি প্রকাশ করে দেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০৩২)

যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়ার আগে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে শোনা প্রয়োজন। পরিস্থিতি আমরা দূর থেকে যেমন দেখি, তা সবসময় তেমন না–ও হতে পারে।

৪. অনুমতি চাওয়া 

হঠাৎ করে আগ বাড়িয়ে অনাহূত পরামর্শ দেওয়া অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। তাই কথা বলার আগে সম্মতি নেওয়া উচিত। যেমন—‘আমি কি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’ এটি অন্য মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।

কথা শুরুর সময় সরাসরি ভুল না ধরে আগে তার ভালো দিকগুলোর প্রশংসা করা উচিত। এতে অপর মানুষটির মন শিথিল হয় এবং সে খোলামনে পরামর্শ গ্রহণ করে।

৫. আগে মন দিয়ে শোনা, তারপর বলা

যেকোনো সমস্যার সমাধান দেওয়ার আগে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে শোনা প্রয়োজন। পরিস্থিতি আমরা দূর থেকে যেমন দেখি, তা সবসময় তেমন না–ও হতে পারে। আগে মন দিয়ে শুনলে অপর মানুষের সঙ্গে মানসিক একটি আত্মিক সংযোগ তৈরি হয়। কথা না শুনে চট করে সিদ্ধান্ত বা উপদেশ দিলে তা ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৬. মতামত চাপিয়ে না দেওয়া

উপদেশদাতা হিসেবে নিজের মতামত প্রকাশ করা দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু তা মেনে নিতে বাধ্য করা অন্যায়।

দার্শনিক ইবনে হাজাম আন্দালুসি (রহ.) বলেছেন, “অনুরোধ বা পরামর্শ এই শর্তে দেওয়া উচিত নয় যে তা মানতেই হবে। এর বাইরে গেলে তা উপদেশ থাকে না; বরং তা হয় কর্তৃত্ব ও আনুগত্য আদায়ের জোরজুলুম।” (আল-আন্দালুসি, আল-আখলাক ওয়াস-সিয়ার ফি মুদাওয়াতির নুফুস, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৯৩ খ্রি., পৃষ্ঠা: ৪৪–৪৫)

৭. কথা ও কাজের মিল রাখা

উপদেশদাতার নিজের জীবনে যদি সেই কথার প্রতিফলন না থাকে, তবে সেই উপদেশের প্রভাব অন্যদের ওপর পড়ে না। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, “আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় যে তোমরা তা বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না।” (সুরা সাফ, আয়াত: ৩)

নম্রতা যে বিষয়েই থাকুক না কেন, তা সেই বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে; আর যা থেকে নম্রতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪

খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জীবন শুধরে ভাইকে ধর্মীয় বিষয়ে পরামর্শ দেয়, সে সর্বোত্তম উপহার প্রদান করল। (আবু নুআইম আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৫ খ্রি., ৫/৩৩৬)

৮. নম্র ভাষার ব্যবহার

উপদেশের ভাষা হওয়া উচিত বরফের মতো কোমল। মহানবী (সা.) বলেছেন, “নম্রতা যে বিষয়েই থাকুক না কেন, তা সেই বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে; আর যা থেকে নম্রতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪)

ইংরেজ কবি কোলরিজ বলেছেন, “পরামর্শ হলো তুষারপাতের মতো; এটি যত মৃদুভাবে ঝরে পড়ে, হৃদয়ে তত দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় এবং অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে।” (Samuel Coleridge, Specimens of the Table Talk of Samuel Taylor Coleridge, John Murray Publishing, London, 1835, p. 112)

কাউকে সুন্দর পথে আহ্বান করা ও শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়া মুমিনের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহাবি জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, “আমি নবীজির হাতে ইসলাম গ্রহণের বায়াত বা শপথ নিয়েছিলাম এই শর্তে যে—আমি নামাজ কায়েম করব, জাকাত দেব এবং প্রতিটি মুসলিমের কল্যাণকামী হবো ও ভালো পরামর্শ দেব।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭)