মাসআলা

ফিতরার বিধান:  ১০টি প্রশ্ন ও উত্তরে সমাধান

১. সাদাকাতুল ফিতর অর্থ কী

সাদাকাতুল ফিতর দুটি আরবি শব্দ। সাদাকা মানে দান আর ফিতর মানে রোজার সমাপন বা ঈদুল ফিতর।। অর্থাৎ,  ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করা সদকাকেই সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়।

এটিকে জাকাতুল ফিতর বা ফিতরাও বলা হয়ে থাকে।

২. ফিতরার হুকুম কী

ইসলামি শরিয়তে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ফিতরা অপরিহার্য করেছেন।

এর পরিমাণ হলো, আধা সা গম, এক সা জব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন পরাধীন সবার ওপরই এটি ওয়াজিব। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫১২) 

এক সা সমান ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম প্রায়।

৩. ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব

ফিতরার নিসাব জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ। 

অর্থাৎ, কারো কাছে সাড়ে ৭ ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রূপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় বিদ্যমান থাকলে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে।

যার ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের  অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির, ২/২৬১)

৪. ফিতরা কখন ওয়াজিব

ফিতরার সম্পর্ক রোজার সঙ্গে।

ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। কাজেই রোজা পালন শেষে ঈদের খুশিতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের পরিবারের প্রতিটি সদস্য এমনকি ঈদের দিন সুবহে সাদেকের আগে যে সন্তান  জন্মগ্রহণ করবে, তার পক্ষ থেকেও তা আদায় করা ওয়াজিব। (কিতাবুল ফাতাওয়া, ৩/৩৫৪)

৫. ফিতরা কার পক্ষ থেকে দিতে হবে

নিসাব পরিমাণ মালের মালিক যিনি, ফিতরা আদায় করা তার পক্ষ থেকে ওয়াজিব। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা বাবার ওপর ওয়াজিব।

আর সে যদি নিসাবের মালিক হয়, তাহলে তার সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা বাবার জন্য জরুরি নয়। কিন্তু সে যদি বাবার লালন পালনে থাকে আর বাবা তার পক্ষ থেকে আদায় করে দেন, তাহলে আদায় হয়ে যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৫৩৩-৫৩৬)

স্ত্রীর ফিতরা আদায় স্বামীর ওপর ওয়াজিব নয়। তবে স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে। এতে অনুমতি নিয়ে হোক বা না হোক। (আদ-দুররুল মুখতার, ৩/৩৮৫)

৬. ফিতরা কখন আদায় করবেন

উত্তম হলো ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা। এ সময় আদায় করা সম্ভব না  হলে পরে যখন ইচ্ছা আদায় করতে পারবে। পরে যখনই তা আদায় করা হবে, আদায় বলে গণ্য হবে, কাজা বলা যাবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৫৪৬)

৭. ফিতরার পরিমাণ কত

ফিতরা সম্পর্কিত হাদিসগুলোয় পাঁচ ধরনের খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। জব, খেজুর, পনির, কিশমিশ ও গম। জব, খেজুর, পনির বা  কিশমিশ দ্বারা আদায় করা হলে প্রত্যকের জন্য এক সা দিতে হবে। আর গম বা গমের আটা বা ছাতু  দ্বারা আদায় করলে আধা সা দিতে হবে।

এটা হলো ওজনের দিক দিয়ে ওফাত। আর মূল্যের দিক থেকে তো পার্থক্য রয়েছে

গম, গমের আটা বা গমের ছাতু যদি হয়, তবে তা পৌনে দুই সের। সাবধানতাবশত পুরো দুই সের দেওয়া ভালো। এর সমপরিমাণ মূল্যও দেওয়া যায়।

যদি খেজুর, কিশমিশ, যব, যবের ছাতু এসবের কোনো একটি দ্বারা  ফিতরা দেওয়া হয়, তাহলে তিন কেজি তিনশ গ্রাম অথবা এর সমপরিমাণ মূল্য দিতে হবে।

বর্ণিত যে বস্তুর হিসাবে দেওয়া হোক, কিছু বেশি দেওয়াই ভালো। কারণ সামান্য কম হলে ফিতরা আদায় হবে না। আর বেশি দিলে সওয়াব পাওয়া যায়। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১৯৩) 

৮. রমজানে ফিতরা আদায় করা যাবে

রমজান মাসে ঈদের দিনের আগে ফিতরা আদায় করা জায়েজ। চাই তা রমজানের যেকোনো দিনেই হোক না কেন। (ফাতাওয়া দারুল উলুম, ৬/৩০৫) 

৯. ফিতরা কাকে দেওয়া যাবে

ফিতরা ও জাকাত প্রদানের খাত একই। মোট আট ধরনের ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়ার কথা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।  অর্থাৎ, যেসব খাতে জাকাতের টাকা খরচ করা যায় সেসব খাতেই ফিতরা আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া শামি, ৩/৩২৫)

 ১০. সম্পূর্ণ ফিতরা কি একজনকে দেওয়া যাবে

একজনের ফিতরা একজনকে দেওয়া উত্তম। একজনের ফিতরা  কয়েকজন ফকিরকে ভাগ করে দেওয়া অনুচিত। তবে কয়েকজনের ফিতরা একজনকে দেওয়া জায়েজ, কোনো অসুবিধা নেই। (ফাতাওয়া শামি, ৩/৯২১)

আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী: শিক্ষক, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম টঙ্গী গাজীপুর।