৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সম্পন্ন হওয়া নবীজির প্রথম বিবাহের ঘটনা সিরাতের শুধু একটি পারিবারিক অধ্যায় নয়; এটি মক্কার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
দ্বিতীয় শাম সফর থেকে ফেরার পর তাঁর সততা ও বাণিজ্যিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) এই বিবাহে এগিয়ে আসেন।
বিবাহের সময়কাল
দ্বিতীয় শাম সফর থেকে ফেরার দুই-আড়াই মাস পর এই বিবাহ সম্পন্ন হয়। সিরিয়ার বুসরা থেকে গ্রীষ্মকালীন কাফেলাটি মক্কায় ফিরে আসে আনুমানিক আগস্ট ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে (২৮ হিজরি পূর্বের সফর মাসের শেষ ভাগে)।
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও হিজরি পূর্ব পঞ্জিকার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিবাহটি সম্পন্ন হয়েছিল ২৮ হিজরি পূর্ব সনের রবিউল আউয়াল মাসের প্রথমার্ধে (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ)। (ইবনে সাদ,আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
বিবাহকালে নবীজির বয়স তখন পঁচিশ বছরের কিছু বেশি (২৫ বছর ২ মাস); যেহেতু তাঁর জন্ম ৫৩ হিজরি পূর্বের রবিউল আউয়াল মাসে। এ বিষয়ে সিরাতের উৎসগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই।
খাদিজার বয়স: একটি অমীমাংসিত বিতর্ক
নবীজির বয়স নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও খাদিজার (রা.) বয়স নিয়ে ধ্রুপদি ও আধুনিক গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। সবচেয়ে প্রচলিত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্ণনায় তাঁর বয়স চল্লিশ বছর বলা হয়েছে, যা ইবনে সাদ ও ইবনে হিশামসহ একাধিক সূত্রে সমর্থিত। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩২)
চল্লিশ বছরের মতের বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এই বিবাহের পর খাদিজারর ঘরে একে একে ছয়জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ কন্যা ফাতিমার জন্ম হয় নবীজির নবুয়তপ্রাপ্তির সামান্য আগে বা পরে।
বিপরীতে একদল গবেষক আটাশ বছরের বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দেন, যার মূল ভিত্তি ইবনে ইসহাকের একটি বর্ণনা, যা ইমাম হাকিমের আল-মুসতাদরাক (৩/১৮২), বাইহাকির দালাইলুন নবুওয়াহ, (২/৭১) এবং ইবনে কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে (৫/১২০) উদ্ধৃত হয়েছে।
এ ছাড়া ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ বছরের একাধিক মতও ইতিহাসে পাওয়া যায়। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ৩/৪২; আল-বালাজুরি আনসাবুল আশরাফ, ১/৯৮)
চল্লিশ বছরের মতের বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এই বিবাহের পর খাদিজারর ঘরে একে একে ছয়জন (বা সাতজন) সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ কন্যা ফাতিমার জন্ম হয় নবীজির নবুয়তপ্রাপ্তির সামান্য আগে বা পরে (আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে)।
খাদিজার বয়স যদি ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর হয়ে থাকে, তবে ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে ফাতিমারর জন্মকালে তাঁর বয়স দাঁড়ায় ৫০ বা ৫১ বছর। তৎকালীন আরবের প্রতিকূল পরিবেশে প্রসূতিসেবা ছাড়া ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যবর্তী সময়ে একজন নারীর পক্ষে সফলভাবে ছয় বা সাতটি সন্তানের জন্ম দেওয়া শারীরতাত্ত্বিক বিচারে বিরল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে এই জীবতাত্ত্বিক যুক্তিটি সর্বসম্মত নয়, আধুনিক জনতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণেও সেকালে নারীর চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে একাধিক সন্তান জন্মদানের নজির আছে।
প্রকৃতপক্ষে চল্লিশ বছরের বর্ণনার পক্ষে বর্ণনার সংখ্যা ও প্রাচীনত্ব বেশি বলে বহু ধ্রুপদি ও আধুনিক গবেষক এখনো একেই অগ্রাধিকার দেন, আবার কেউ কেউ মাঝামাঝি অবস্থান হিসেবে ত্রিশের কোঠার বয়সকে সমন্বয়ী সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করেছেন।
প্রস্তাবের মধ্যস্থতা
মক্কার শীর্ষ ধনী নারী হিসেবে খাদিজার কাছে ইতিপূর্বে একাধিক প্রভাবশালী কোরাইশ নেতার বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রস্তাবদাতাদের মধ্যে ছিলেন আবু জাহেল, উকবা ইবনে আবি মুয়াইত কিংবা আস ইবনে ওয়ায়েল। কিন্তু তিনি তাদের অন্ধ সামাজিক অহংকার ও বৈষয়িক মানসিকতার খাদিজার পছন্দ ছিল না। (ইবনে হিশাম,আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮৯, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
মুহাম্মদের চরিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী এক নারীকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাঠান, যাঁর নাম সিরাতগ্রন্থে এসেছে ‘নাফিসা বিনতে মুনইয়াহ’। মুনইয়াহ ছিলেন তাঁর মা, যাঁর নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন।
নাফিসা কৌশলে যুবক মুহাম্মদের কাছে জানতে চান, সমবয়সীরা তো সংসার শুরু করেছে, তিনি বিবাহ করছেন না কেন? নবীজি সংসার করার মতো আর্থিক অসঙ্গতির কথা জানালেন। নাফিসা জানতে চাইলেন, যদি এমন প্রস্তাব দেওয়া হয় যেখানে সৌন্দর্য, সম্পদ, আভিজাত্য এবং মর্যাদা সবই রয়েছে, তবে তিনি গ্রহণ করবেন কি না।
তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তিনি কে?” নাফিসা বললেন, “খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ।” মুহাম্মদ (সা.) বললেন, “তিনি কি এতে সম্মত হবেন?” নাফিসা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “সেই দায়িত্ব আমার।” নবীজি সম্মতি জানালে নাফিসা খাদিজাকে গিয়ে জানান। (ইবনে কাসির,আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১১৯, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
আবু তালিব উচ্চমার্গীয় আরবি গদ্যে এক অবিস্মরণীয় বক্তব্য দেন, যেখানে তিনি নবীজির বংশমর্যাদা আর চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, সম্পদের সাময়িক ঘাটতি থাকলেও ভবিষ্যতে তাঁর ভাতিজার এক মহিমান্বিত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাবে।
অভিভাবকত্ব ও একটি প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা
খাদিজার পিতা খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ এই বিবাহের আগেই, এমনকি ফিজারের যুদ্ধের আগেই মারা যান বলে ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এসেছে, ফলে বিবাহের মজলিসে তাঁর অভিভাবক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তাঁর চাচা আমর ইবনে আসাদ। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯০)
ওয়াকিদির সূত্রে প্রচলিত একটি বর্ণনায় দাবি করা হয়েছিল, খাদিজা তাঁর পিতাকে মদ পান করিয়ে সম্মতি আদায় করেছিলেন—তবে ইবনে কাসির, ইবনে হাজার আসকালানি ও সুহাইলিসহ অধিকাংশ হাদিসবিশারদ এই বর্ণনাকে দুর্বল ও গ্রহণযোগ্যতাহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। (আস-সুহাইলি,আর-রাওদুল উনুফ, ১/২১২, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ২০০০)
জাহেলি যুগেও খাদিজা (রা.) তাঁর পবিত্র চরিত্রের কারণে ‘আত-তাহিরাহ’ (পরম পবিত্রা) নামে খ্যাত ছিলেন। সেখানে পিতার মাতলামির আশ্রয় নেওয়া জাহেলি আরবের সুস্থ আভিজাত্যের সঙ্গেও মেলে না। সত্য হলো, তাঁর চাচা আমর ইবনে আসাদ সুস্থ ও সচেতন অবস্থাতেই এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।
বিবাহের মজলিস ও দেনমোহর
নির্দিষ্ট দিনে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পরিবারের প্রবীণ ও সম্মানিত সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে খাদিজার বাড়িতে উপস্থিত হন। বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন তাঁর চাচা আবু তালিব, হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং অন্যান্য কয়েকজন।
মজলিসে অভিভাবক হিসেবে বনু হাশিমের পক্ষ থেকে আবু তালিব উচ্চমার্গীয় আরবি গদ্যে এক অবিস্মরণীয় বক্তব্য দেন, যেখানে তিনি নবীজির বংশমর্যাদা আর চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, সম্পদের সাময়িক ঘাটতি থাকলেও ভবিষ্যতে তাঁর ভাতিজার এক মহিমান্বিত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাবে। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৯০)
কনেপক্ষের হয়ে খুওয়াইলিদের জ্ঞাতি ভাই ও তৎকালীন তাওহিদবাদী পণ্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নওফেল অথবা চাচা আমর ইবনে আসাদ দাঁড়িয়ে উত্তর দেন, যা বলেছের, আপনারা সত্যিই তার চেয়েও মর্যাদাবান। আপনাদের শ্রেষ্ঠত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্টির সঙ্গে খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদকে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করছি। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩২)
দেনমোহর হিসেবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বর্ণনায় বিশটি তরুণ উটের কথা এসেছে, যা আবু তালিব ও হামজা যৌথভাবে পরিশোধের নিশ্চয়তা দেন (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩২)। কিছু বর্ণনায় এই উটের মূল্যকে তৎকালীন সাড়ে বারো উকিয়া বা ৫০০ দিরহাম রুপার সমতুল্য বলা হয়েছে। (আস-সুহাইলি, আর-রাওদুল উনুফ, ১/২১৩)
ঐতিহাসিক আল-আজরাকির বর্ণনানুযায়ী, বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর নবীজি একটি বা দুটি উট (মতান্তরে ভেড়া) জবাই করে মক্কার সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক প্রীতিভোজের (অলিমা) আয়োজন করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩২)
খাদিজার উপহার
এই বিবাহের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র জায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) কাহিনি। খাদিজার ভ্রাতুষ্পুত্র হাকিম ইবনে হিজাম উকাজের মেলা থেকে অপহৃত বালক জায়েদকে ৪০০ রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) কিনে এনে ফুফুকে উপহার দেন, আর বিয়ের পর খাদিজা তাঁকে নবীজিকে উপহার দেন।
নবীজি সঙ্গে সঙ্গে জায়েদকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে নিজের সন্তানের মর্যাদায় গ্রহণ করেন—কোরআনের সুরা আহজাবে দত্তক-সংক্রান্ত বিধান নাজিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ‘জায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ নামেই পরিচিত ছিলেন।
এই বাড়িতেই পরে প্রথম ওহি অবতীর্ণের পর তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন, এখানেই খাদিজা ইসলামের প্রথম গ্রহণ করেন, আর খাদিজার মৃত্যু পর্যন্ত পঁচিশ বছর নবীজি দ্বিতীয় কোনো বিবাহ ছাড়াই তাঁর সঙ্গেই দাম্পত্য জীবন কাটান।
‘দারু খাদিজা’
এই দাম্পত্যে ছয় সন্তানের জন্ম হয়—পুত্র আল-কাসিম (যাঁর নামেই নবীজির উপনাম ‘আবুল কাসিম’) ও আবদুল্লাহ, উভয়েই শৈশবে মক্কায় মারা যান; আর কন্যা জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও সর্বকনিষ্ঠা ফাতেমা। বিবাহের পর নবীজি খাদিজার গৃহেই বসবাস শুরু করেন।
এই ঘরেই বিবাহটি সম্পন্ন হয়েছিল, যা মক্কার ঐতিহাসিক ‘দারু খাদিজা’ নামে পরিচিত। কাবা শরিফের উত্তর-পূর্বে, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের সংযোগস্থলের পেছনের ‘সুকুল লাইল’ নামের প্রাচীন পাড়ায় (বর্তমানে মারওয়া পাহাড়ের বাইরের উন্মুক্ত চত্বরের অংশ) এই বাড়ির অবস্থান ছিল।
এই বাড়িতেই পরে প্রথম ওহি অবতীর্ণের পর তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন, এখানেই খাদিজা ইসলামের প্রথম গ্রহীতা হন, আর খাদিজার মৃত্যু পর্যন্ত পঁচিশ বছর নবীজি দ্বিতীয় কোনো বিবাহ ছাড়াই তাঁর সঙ্গেই দাম্পত্য জীবন কাটান।
উমাইয়া যুগে খলিফা মুয়াবিয়া (রা.) এই ঐতিহাসিক বাসভবনটি ক্রয় করে একে একটি মসজিদে রূপান্তর করেন এবং দীর্ঘকাল তা ‘মাওলিদু ফাতিমা’ ও ‘দারু খাদিজা’ হিসেবে সংরক্ষিত ছিল।
খাদিজার আগের জীবন
নবীজির সঙ্গে বিবাহের আগে খাদিজা (রা.) আরও দুবার বিবাহিত হয়েছিলেন—প্রথমে আতিক ইবনে আয়িজ আল-মাখজুমির সঙ্গে, যাঁর ঘরে কন্যা হিন্দের জন্ম হয়; পরে আবু হালা মালিক ইবনে নাব্বাশ আত-তামিমির সঙ্গে, যাঁর ঘরে হিন্দ ও হারিস নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়।
দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একাই বাণিজ্য পরিচালনা শুরু করেন। তাঁর নিষ্কলুষ চরিত্রের কারণে জাহেলি যুগেই তিনি ‘আত-তাহিরাহ’ (পরম পবিত্রা) ও ‘সাইয়িদাতু নিসায়ি কুরাইশ’ (কোরাইশ নারীদের নেত্রী) উপাধিতে পরিচিত ছিলেন।