আধুনিক ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রে নেতৃত্বকে প্রায়শই পদবি, ক্ষমতা বা নির্বাচনের ফ্রেমে বেঁধে দেখা হয়। কিন্তু কোরআনের সুরা কাহাফ আমাদের নিয়ে যায় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সফরে, যেখানে দেখা যায় নেতৃত্ব কোনো উপাধি নয়, বরং এটি একটি ‘মুহূর্তের চেতনা’।
যখন কোনো গোষ্ঠী বা জাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন তাদের ভেতর থেকেই নেতৃত্বের স্ফুরণ ঘটে। সুরা কাহাফে আমরা তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তিনটি ভিন্ন নেতৃত্বের ধরন দেখতে পাই: সংকটে অটল তারুণ্য, জ্ঞান অন্বেষণে বিনয়ী নবী এবং এক ন্যায়পরায়ণ প্রতাপশালী শাসক।
এই তিনটি চিত্রপট মূলত সফল নেতৃত্বের এক পূর্ণাঙ্গ পাঠশালা।
সুরা কাহাফের প্রথম দৃশ্যে আমরা দেখি একদল যুবককে, যারা তাদের বিশ্বাসের কারণে চরম অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত। যখন চারপাশ থেকে বিপদ ঘিরে ধরেছে, তখন তাদের মধ্যে থেকে একজন ধীরস্থির কণ্ঠে প্রস্তাব দিলেন, “অতএব তোমরা গুহায় আশ্রয় নাও; তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য তাঁর করুণা বিস্তার করবেন।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৬)
নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য:
দৃষ্টিভঙ্গি: নেতার কাজ হলো ঘোর অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো দেখানো। তিনি কেবল গুহায় পালানোর কথা বলেননি, বরং আল্লাহর করুণার ওপর আস্থা রাখার রূপকল্প (ভিশন) দিয়েছেন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ: ঘুম থেকে ওঠার পর তাদের খাবার সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল আধুনিক ‘ডেলিগেশন’ বা দায়িত্ব বন্টনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কাকে পাঠানো হবে (যোগ্যতা), সঙ্গে কী থাকবে (রুপার মুদ্রা - সম্পদ), এবং গোপনীয়তা রক্ষা (নিরাপত্তা)—এই প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল অত্যন্ত পেশাদার।
যৌথ প্রজ্ঞা: এখানে নেতৃত্ব ছিল অংশীদারত্বমূলক। কেউ কারো ওপর জোর খাটাননি, বরং আলোচনার মাধ্যমে সবচেয়ে নিরাপদ পথটি বেছে নিয়েছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখি জ্ঞান অর্জনের এক অদ্ভুত সফর। এখানে নেতৃত্ব কেবল আদেশ দেওয়া নয়, বরং অনুসারীর ‘মনন গঠন’ করা। হজরত খিজির (আ.) যখন মুসা (আ.)-কে বললেন, “যদি তুমি আমার অনুসরণ করোই, তবে আমাকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যতক্ষণ না আমি নিজেই তোমাকে সে বিষয়ে কিছু বলি।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ৭০)
নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য:
পদ্ধতিগত শৃঙ্খলা: খিজির (আ.) শিক্ষার একটি পরিষ্কার ফ্রেমওয়ার্ক বা নিয়মাবলি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একজন নেতাকে জানতে হয় কখন তথ্য প্রকাশ করতে হয় এবং কখন অনুসারীকে ধৈর্য ধরতে শিখাতে হয়।
গভীর পর্যবেক্ষণ: এই নেতৃত্ব আমাদের শেখায় যে, ঘটনার বাহ্যিক রূপ আর প্রকৃত সত্য এক নাও হতে পারে। নেতা কেবল চোখের সামনের ঘটনা দেখেন না, তিনি তার অন্তর্দৃষ্টি বা ‘ইনসাইট’ দিয়ে সুদূরপ্রসারী ফলাফল বিচার করেন।
মেন্টরশিপ: মুসা (আ.)-এর মতো একজন বড় মাপের নবীকেও এখানে অত্যন্ত বিনয়ী ছাত্র হিসেবে দেখা যায়, যা নেতৃত্বের ‘শিখন মানসিকতা’কে ফুটিয়ে তোলে।
সুরা কাহাফের শেষ ভাগে আমরা দেখা পাই এক মহাপ্রতাপশালী শাসকের, যিনি প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য শাসন করছেন। কিন্তু তার আসল নেতৃত্ব প্রকাশ পায় যখন একটি দুর্বল জাতি তাকে প্রাচীর তৈরির অনুরোধ জানায়।
নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য:
সম্পদ ব্যবস্থাপনা: তিনি তাদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেননি, বরং তাদের শ্রম ও কাঁচামাল ব্যবহার করেছেন। তিনি জানতেন কীভাবে স্থানীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হয়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনা: লোহা সংগ্রহ করা, তাতে আগুন দেওয়া এবং গলিত তামা ঢেলে দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি সুসংগঠিত ‘ওয়ার্কশপ’ বা কর্মশালার মতো। তিনি নিজে সব কাজ করেননি, বরং জনগণকে কাজের অংশীদার বানিয়েছেন।
টেকসই নিরাপত্তা: তিনি কেবল একটি দেয়াল তোলেননি, বরং একটি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়েছেন। এটিই হলো ক্ষমতায়নমূলক নেতৃত্ব (এমপাওয়ারিং লিডারশিপ)।
সুরা কাহাফ আমাদের শেখায় যে নেতৃত্ব কোনো একরোখা বা একমুখী বিষয় নয়। এটি স্থান, কাল ও পাত্রভেদে পরিবর্তিত হয়।
আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসী) থেকে আমরা শিখি প্রতিকূলতায় একতা ও বিশ্বাসের নেতৃত্ব।
মুসা ও খিজির (আ.) থেকে আমরা শিখি ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক নেতৃত্ব।
জুলকারনাইন থেকে আমরা শিখি কৌশলগত পরিকল্পনা ও জনসম্পৃক্ততার নেতৃত্ব।
এই তিনটি মডেলের সমন্বয়ই একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে উন্নীত করে। এই তিনটি শিক্ষা কেবল ইতিহাসের গল্প নয়, বরং আজকের কর্পোরেট জগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে এই আদর্শগুলো সমানভাবে কার্যকর।