পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, ধনীদের সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার এই ঐশী বিধানকে উপেক্ষা করে যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চরম আত্মকেন্দ্রিকতা ও কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতে উদ্গ্রীব হয়, তখন তাদের ওপর অনিবার্যভাবে সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে।
পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কালামে তেমনই একটি ঐতিহাসিক ও শিক্ষণীয় বিবরণ পাওয়া যায়। আল্লাহর নবী হজরত ইসা (আ.)-কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার কিছুদিন পর ইয়েমেনের সানা নগরীর পাশে ঘটে যাওয়া ‘বাগানওয়ালাদের’ এই ঘটনা প্রাচীন আরবদের মধ্যেও বেশ প্রসিদ্ধ ছিল।
এমনকি ইসলাম আসার পর কোরআনের চিরন্তন বাণীর মাধ্যমে আজও এই ঘটনাটি বিশ্ববাসীর কাছে জীবন্ত হয়ে আছে।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এদের পরীক্ষা করেছি, যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম বাগানের মালিকদের; যখন তারা কসম করেছিল যে অবশ্যই তারা ভোরবেলা বাগানের ফল আহরণ করবে। আর তারা ইনশা আল্লাহ বলেনি। অতঃপর তোমার রবের পক্ষ থেকে এক বিপর্যয় বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে গেল, যখন তারা ঘুমন্ত ছিল। ফলে তা পুড়ে কালো ছাইয়ে পরিণত হলো।’ (সুরা আল-কালাম, আয়াত: ১৭-৩১)
পিতার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা সেই বিশাল বাগানের উত্তরাধিকারী হয়। কিন্তু পিতার মানবিক মূল্যবোধ ছেলেদের স্পর্শ করতে পারেনি।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আনুমানিক দুই ফারসাখ (প্রায় ছয় মাইল) দূরে ফলমূলে ভরপুর একটি বিখ্যাত বাগান ছিল। এই বাগানের আদি মালিক ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও সমাজহিতৈষী এক ব্যক্তি। তিনি তাঁর বার্ষিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত গরিব-দুঃখী ও অনাহারী মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন।
তাঁর এই বদান্যতার ফলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো মন খুলে তাঁর জন্য দোয়া করত। এতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত যেন সেই বাগানে উপচে পড়ত।
কালের নিয়মে সেই ভদ্রলোক একদিন মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা সেই বিশাল বাগানের উত্তরাধিকারী হয়। কিন্তু পিতার মানবিক মূল্যবোধ ছেলেদের স্পর্শ করতে পারেনি। পৈতৃক সূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তারা আত্মম্ভরী ও কৃপণ হয়ে ওঠে।
একদিন সব ভাই এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। তাদের মধ্যে দুই ভাই বলল, ‘আমাদের লোকসংখ্যা অনেক এবং পরিবার-পরিজনের তুলনায় বাগানের সম্পদ সীমিত। আমাদের পিতা ছিলেন অবুঝ, তাই তিনি উপার্জনের একটি বড় অংশ গরিবদের দিয়ে দিতেন। আমরা যদি এই ধারা বজায় রাখি, তবে আমাদের সংসারে অনটন দেখা দেবে। সুতরাং, এখন থেকে ফসলের একটি কণাও আমরা বহিরাগতদের দেব না।’
ভাইদের মধ্যে তৃতীয়জন অবশ্য কিছুটা বিবেকবান ছিল। সে এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলল, ‘আমার মনে হয় তোমাদের এই সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। গরিবদের বঞ্চিত করা উচিত হবে না, কিছু অংশ তাদের দেওয়াটাই আমাদের জন্য কল্যাণকর।’ কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে অন্য ভাইয়েরা তার এই সৎ পরামর্শ উপেক্ষা করল এবং নিজেদের অন্যায় সিদ্ধান্তে অটল থাকল।
তাদের অবাধ্যতা ও কৃপণতার শাস্তিস্বরূপ রাতের অন্ধকারে আল্লাহর নির্দেশে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে পুরো বাগানটি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
বাগানের ফসল যখন পেকে লাল হলো, তখন ভাইয়েরা এক অভিনব কুপরিকল্পনা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, পরদিন ভোরের সূর্য ওঠার আগেই, অন্ধকার থাকতে থাকতে তারা বাগানের সব ফসল কেটে ঘরে তুলে আনবে। এতে সকালবেলা গরিবরা টের পাওয়ার আগেই ফল বণ্টনের কাজ শেষ হয়ে যাবে এবং কাউকে কোনো অংশ দিতে হবে না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা শেষরাতে বাগানের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু বাগানে পৌঁছেই তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তাদের চোখের সামনে এক অবর্ণনীয় ও রূঢ় বাস্তবতা।
তাদের অবাধ্যতা ও কৃপণতার শাস্তিস্বরূপ রাতের অন্ধকারে আল্লাহর নির্দেশে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে পুরো বাগানটি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। যে বাগানের ফসল দিয়ে তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের অলীক স্বপ্নে বিভোর ছিল, সেখানে ছিল কেবল কালো কয়লা আর ধূসর ছাই।
অনুতাপ, তওবা ও পুনর্বাসন—সর্বস্ব হারিয়ে ভাইদের চোখ খুলে গেল। তারা বুঝতে পারল, তাদের পিতার পথই সত্য ও সঠিক ছিল। সম্পদ কখনো একা ভোগ করার জিনিস নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করল।
তারা প্রতিজ্ঞা করল, ভবিষ্যতে আর কখনো কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না। আল্লাহ–তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি বাগানওয়ালা ভাইদের এই সম্মিলিত তওবা কবুল করে নিলেন। তাঁর অসীম রহমতে পরের বছর সেই পুড়ে যাওয়া বাগান আবারও আগের মতো সুমিষ্ট ফলে ভরে উঠল।
তবে মানুষ ভুল করতেই পারে, তাই ভুল বুঝতে পেরে খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে ফিরে আসলে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করেন ও পুনরায় রহমত দান করেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি থেকে মানবসমাজ যে শাশ্বত শিক্ষা পায় তা হলো, ধনীদের সম্পদে গরিবদের যে হক রয়েছে, তা নিয়মিত ও সানন্দে আদায় করতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত পেয়ে যারা অহংকার করে, তাদের পতন অনিবার্য।
তবে মানুষ ভুল করতেই পারে, তাই ভুল বুঝতে পেরে খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে ফিরে আসলে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করেন ও পুনরায় রহমত দান করেন।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) গরিব ও অসহায়দের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দরিদ্র মুমিনরা ধনীদের চেয়ে অর্ধেক দিন আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর আখেরাতের অর্ধেক দিনের পরিমাণ হলো পৃথিবীর পাঁচ শ বছর।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১২২)
ইলিয়াস মশহুদ : প্রাবন্ধিক ও গবেষক