নবী-রাসুলদের জীবন মানবজাতির জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। তাঁদের জীবনের প্রতিটি ঘটনা মানুষকে ধৈর্য, ইমান ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার শিক্ষা দেয়। তবে এসব ঘটনার সবই যে নির্ভরযোগ্য ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত, এমন নয়।
কালের প্রবাহে কিছু ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত কাহিনিও সমাজে প্রচলিত হয়েছে। হজরত আইয়ুব (আ.)–এর শরীরে পোকা পড়ার কাহিনি তেমনই একটি বহুল প্রচলিত কিন্তু অপ্রমাণিত বর্ণনা।
জনশ্রুতি আছে, হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর শরীরের গোশত ক্ষয়ে যায়, শরীরে পোকা জন্ম নেয় এবং দুর্গন্ধের কারণে মানুষ তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যায়।
কোথাও কোথাও বলা হয়, তাঁকে জনপদ থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে কেবল তাঁর স্ত্রীই তাঁর পাশে ছিলেন।
বর্ণনাটি নিঃসন্দেহে মানুষের আবেগ স্পর্শ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কোথায়?
পবিত্র কোরআনে হজরত আইয়ুব (আ.)–এর পরীক্ষার কথা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আইয়ুবের কথা স্মরণ করুন, যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকে বলেছিলেন, “আমি দুঃখ–কষ্টে পতিত হয়েছি, আর আপনি তো হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোরআনের কোথাও তাঁর শরীরে পোকা পড়া, দেহ পচে যাওয়া বা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার কোনো উল্লেখ নেই। বরং কোরআন তাঁর ধৈর্য, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
হাদিসবিশারদদের মতে, শরীরে পোকা পড়া বা দেহ পচে যাওয়ার বর্ণনার উৎস মূলত ‘ইসরায়েলি রেওয়ায়েত’। অর্থাৎ পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের কিছু লোককথা ও বর্ণনা, যা পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে।
অনেক সময় আবেগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে কিছু বক্তা বা লেখক এসব বর্ণনাকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেন। ফলে সাধারণ মানুষ সেগুলোকেই নিশ্চিত ইতিহাস বলে ধরে নেয়।
এই কাহিনি গ্রহণযোগ্য না হওয়ার প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে:
১. নির্ভরযোগ্য উৎসের অনুপস্থিতি: শরীরে পোকা পড়া, দেহ পচে যাওয়া বা দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি কোরআন কিংবা নির্ভরযোগ্য হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই ইসলামি ইতিহাস ও হাদিসশাস্ত্রের দৃষ্টিতে এ কাহিনি প্রমাণিত নয়।
২. ইসলামি বিশ্বাসের পরিপন্থী : ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীগণ আল্লাহর নির্বাচিত, সম্মানিত ও পবিত্র বান্দা। তাঁদের সম্পর্কে এমন কোনো বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়, যা তাঁদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে বা মানুষের মনে তাঁদের প্রতি বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করে।
৩. আমাদের জন্য শিক্ষা: হজরত আইয়ুব (আ.)–এর জীবনের মূল শিক্ষা তাঁর রোগের ভয়াবহতায় নয়; বরং তাঁর অসীম ধৈর্য, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি অটল আস্থায় নিহিত।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়:
বিপদের সময় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
কঠিন মুহূর্তেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা
ধৈর্য ও সবরের মাধ্যমে পরীক্ষাকে মোকাবিলা করা
কষ্টের মধ্যেও ইবাদত ও দোয়া অব্যাহত রাখা
নবী-রাসুলদের জীবনকে আমরা যত বেশি নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে বুঝব, ততই তা আমাদের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা হয়ে উঠবে। আবেগনির্ভর ও অনির্ভরযোগ্য বর্ণনার চেয়ে তাঁদের জীবনের প্রমাণিত শিক্ষা গ্রহণ করাই আমাদের দায়িত্ব।
(তথ্যসূত্র: তাফসিরে কুরতুবী: ১৫/১৪৭, বৈরুত)
রায়হান আল ইমরান : লেখক ও গবেষক