ধর্ম–দর্শন

সাম্য ও মানবিক মর্যাদায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মহান আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে অসাধারণ মর্যাদা দান করেছেন। পবিত্র কোরআে আল্লাহ–তাআলা এই সম্মানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি এবং তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে পবিত্র রিজিক দান করেছি এবং আমার অনেক সৃষ্টির ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা বনি ইসরায়েল, আয়াত: ৭০)

অপর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে। (সুরা তিন, আয়াত: ৪)

আল্লাহ–তাআলা মানুষের কল্যাণে আসমান ও জমিনের অনেক কিছুকে অনুগত করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তিনিই, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপন্ন করেছেন। তিনি নৌকা ও জাহাজকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর আদেশে তা সমুদ্রে চলাচল করে এবং নদীসমূহকে তোমাদের অনুগত করেছেন। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে, যা সর্বদা আবর্তিত হচ্ছে এবং তোমাদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন রাত ও দিনকে। তোমরা তাঁর কাছে যা চেয়েছ, তার সবকিছুই তিনি তোমাদের দিয়েছেন। যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩২-৩৪)

আমি কি তার জন্য দুটি চোখ বানাইনি? এবং একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট? আর আমি তাকে (ভালো-মন্দের) দুটি পথ দেখিয়েছি।
কোরআন, সুরা বালাদ, আয়াত: ৮-১০

জমিনে যা কিছু আছে, তা মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি জমিনের সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলোকে সুবিন্যস্ত সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯)

মহাবিশ্বের বাহ্যিক নেয়ামতের পাশাপাশি আল্লাহ মানুষকে অনেক অভ্যন্তরীণ নেয়ামতও দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি কি তার জন্য দুটি চোখ বানাইনি? এবং একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট? আর আমি তাকে (ভালো-মন্দের) দুটি পথ দেখিয়েছি।’ (সুরা বালাদ, আয়াত: ৮-১০)

আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি, বিবেক, প্রজ্ঞা ও চিন্তাশক্তির মতো যোগ্যতা দিয়েছেন এবং তাকে ভালোবাসা, মায়া ও ভ্রাতৃত্বের মতো মানবিক অনুভূতিও দান করেছেন। আল্লাহ পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। একইভাবে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও অঞ্চল তৈরি করেছেন, যার মধ্যে আল্লাহর অনেক নিদর্শন রয়েছে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই জ্ঞানীদের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২২)

বিভিন্ন বর্ণ, বংশ ও গোত্রে বিভক্ত করার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করা। সুরা হুজরাতে এই সত্য তুলে ধরা হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (আল্লাহভীরু)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সম্যক অবহিত।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)

এই বিভক্তির মানে এই নয় যে কোনো এক জনগোষ্ঠী বা ভাষাকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে; বরং আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হলো কেবল তাকওয়া।

দুনিয়াতে মানুষ অন্যের সম্মান করে তার বাহ্যিক চেহারা, বংশ পরিচয় বা সম্পদের কারণে। কিন্তু আল্লাহর কাছে মানদণ্ড এটি নয়, বরং মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং তার আমল।

মহানবী মুহাম্মদ (সা.) যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন, তা সমগ্র মানবজাতির জন্য ছিল। তিনি মুক্তি ও সফলতা কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা বংশের জন্য সীমাবদ্ধ করেননি। বিদায় হজের ভাষণে তিনি ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন যে কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; তেমনি কোনো সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি দিনে খুতবায় বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল, তোমাদের প্রতিপালক একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো, তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, সাদার ওপর কালোর এবং কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আমি কি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি?’

মানুষ বলল, ‘হ্যাঁ, পৌঁছে দিয়েছেন।’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘আজ কোন দিন?’ তারা বলল, ‘সম্মানিত (হারাম) দিন।’ তিনি বললেন, ‘এটি কোন মাস?’ তারা বলল, ‘সম্মানিত মাস।’ তিনি বললেন, ‘এটি কোন শহর?’ তারা বলল, ‘সম্মানিত শহর।’

নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের রক্ত ও সম্পদকে একে অপরের জন্য তেমনি সম্মানিত করেছেন, যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর সম্মানিত। আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘যারা উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ২৩৪৮৯)

দুনিয়াতে মানুষ অন্যের সম্মান করে তার বাহ্যিক চেহারা, বংশ পরিচয় বা সম্পদের কারণে। কিন্তু আল্লাহর কাছে মানদণ্ড এটি নয়, বরং মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং তার আমল।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং তোমাদের সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের আমলের দিকে তাকান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহর কাছে পুণ্য ও কল্যাণে এগিয়ে যাওয়ার সমান সুযোগ সবার জন্য রয়েছে। তাই বংশ মর্যাদা বা সম্পদের অহংকারে কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়।

রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, প্রতারণার উদ্দেশ্যে দাম বাড়িয়ে দিও না, পরস্পর ঘৃণা পোষণ করো না, একে অন্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো।

কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য হারাম।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৩

একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই; সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে না। তাকওয়া এখানে (বুকের দিকে ইঙ্গিত করে)।’

তিনি তিনবার নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য হারাম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৩)

এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায় যে বংশ, গোত্র, রূপ কিংবা আর্থিক অবস্থার কারণে কাউকে ছোট ভাবা যাবে না। বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে প্রত্যেক মানুষকে নিজের মতো একজন মানুষ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

মানবজাতির এই সাম্যের শিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্রে ভ্রাতৃত্ব ও সহনশীলতা বৃদ্ধির মূল ভিত্তি। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইফতেখারুল হক হাসনাইন: আলেম ও লেখক