জিজ্ঞাসা

কোনো মুসলমানকে কি জাহান্নামি বলা যাবে

কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানকে নিশ্চিতভাবে ‘জাহান্নামি’ বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ভয়াবহ বিষয়। অন্যায়কে অন্যায় বলা যাবে, গুনাহ থেকে সতর্ক করা যাবে, তবে ওহির দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে

জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে। তিনিই মানুষের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। 

কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয় তোমার রবই সবচেয়ে ভালো জানেন, কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সৎপথপ্রাপ্ত।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১১৭) 

হেদায়েত ও গোমরাহির শেষ অধ্যায় কখন কোথায় লেখা হবে, তা মানুষের অজানা। আজকের গুনাহগার হয়তো আগামীকাল এমন তওবা করবে, যা তার সমগ্র অতীতকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেবে। আবার বাহ্যত নেককার বলে পরিচিত কেউ জীবনের শেষ মুহূর্তে বিপথে চলে যেতে পারে। এ কারণেই নিজের পরিণতি নিয়ে সবার উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। অন্যের আখিরাতের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা উচিত নয়।

ইসলাম কোনো হারাম কাজকে হারাম বলতে নিষেধ করেনি। মদ্যপান, জুলুম, সুদ, ব্যভিচার, ঘুষ কিংবা অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষকে সতর্ক করা অবশ্যই প্রয়োজন।

পাপী মুসলমান কি নিশ্চিত জাহান্নামি:

কোনো মুসলমান মহাপাপ ( (কবিরা গুনাহ) লিপ্ত হলেই তাকে নিশ্চিতভাবে জাহান্নামি বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া যাবে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া অন্য কোনো পাপ নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তাকে ক্ষমা করবেন, চাইলে অপরাধের অনুপাতে শাস্তি দেবেন। (শরহুল আকায়েদ আন-নাসাফিয়্যাহ, ২৬২-২৬৩, দারুত-তাকওয়া, দিমাশক, ২০২০)

আল্লাহ-তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, এটা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)

অতএব, কোনো পাপীকে দেখে “সে নিশ্চিত জাহান্নামে যাবে” এমন মন্তব্য করা আল্লাহর নিরঙ্কুশ ইচ্ছার সীমারেখা অতিক্রম করার শামিল।

কাজের বিধান ও ব্যক্তির পরিণতি এক নয়

এখানে একটা মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। ইসলাম কোনো হারাম কাজকে হারাম বলতে নিষেধ করেনি। মদ্যপান, জুলুম, সুদ, ব্যভিচার, ঘুষ কিংবা অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষকে সতর্ক করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কোনো কাজকে ‘জাহান্নামের কারণ’ বলা আর নির্দিষ্ট একজন মানুষের ব্যাপারে ‘সে জাহান্নামি’ বলে রায় দেওয়া এক কথা নয়।

কোনো মানুষকে তার পাপের কারণে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত মনে করা কতটা বিপজ্জনক, তা একটি মর্মস্পর্শী হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। রাসুল (সা.) বনি ইসরাইলের দুই ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাদের একজন ছিল গুনাহগার, আর অন্যজন ছিল অধিক ইবাদতকারী। ইবাদতকারী ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বারবার পাপ করতে দেখে তাকে উপদেশ দিত এবং আল্লাহকে ভয় করতে বলত। একপর্যায়ে পাপী ব্যক্তির অবস্থা দেখে সে এমন কথা বলে ফেলল, যা বলা তার জন্য উচিত ছিল না।‌ সে বলল, “আল্লাহর কসম, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না।”

অর্থাৎ নিজের ধারণায় সে অন্য ব্যক্তির আখিরাতের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে দিল। তখন আল্লাহ-তাআলা বললেন, “কে সে, যে আমার ব্যাপারে কসম করে বলছে, আমি অমুককে ক্ষমা করব না? আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমার আমল নষ্ট করে দিলাম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২১)

তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না, কে প্রকৃত মুত্তাকি, তিনিই তা ভালো জানেন।
সুরা নাজম, আয়াত: ৩২

তওবার দরজা এখনও খোলা:

যে মানুষ আজ গুনাহে ডুবে আছে, তার জন্যও আল্লাহর রহমতের দুয়ার খোলা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

যে আল্লাহ নিজেই বান্দাকে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে বলেছেন, তাঁর কোনো বান্দাকে মানুষ কীভাবে নিশ্চিত ভাষায় ‘জাহান্নামি’ বলবে?

আত্মপ্রশংসা নিষেধ

কোনো মানুষ যখন অন্যের জন্য জাহান্নামের রায় ঘোষণা করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার ভেতর আত্মঅহংকার জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে নিজের অবস্থানকে নিরাপদ এবং অন্যকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাবতে শুরু করে। অথচ কোরআন মানুষকে আত্মপ্রশংসা থেকেও বিরত থাকতে বলেছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না, কে প্রকৃত মুত্তাকি, তিনিই তা ভালো জানেন।” (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)

তবে একটা বিষয় ব্যতিক্রম। কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসে যাদের সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জান্নাত বা জাহান্নামের সংবাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সেই সংবাদ বর্ণনা করা যাবে। এখানে মানুষের অনুমান বা ব্যক্তিগত ফতোয়া নেই, রয়েছে ওহির অকাট্য ঘোষণা। (শরহুল আকিদা আত-তহাবিয়্যাহ, ২/৬৫১, কায়রো, ২০১১)

যেমন আবু লাহাব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “অচিরেই সে লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবে।” (সুরা লাহাব, আয়াত: ৩) অতএব, আবু লাহাবের ব্যাপারে জাহান্নামের কথা বলা মানে আল্লাহর ঘোষিত সংবাদ বর্ণনা করা। এতে কোনো সমস্যা নেই।

পাপকে পাপ বলব, মানুষকে সংশোধনের পথে ডাকব, কিন্তু ওহির সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানকে ‘নিশ্চিত জাহান্নামি’ বলব না। চূড়ান্ত বিচার সেই মহান রবের, যিনি প্রকাশ্য কাজের পাশাপাশি মানুষের অন্তরের গোপনতম অবস্থা এবং জীবনের শেষ পরিণতিও পূর্ণাঙ্গভাবে জানেন।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা