কোরআন কেবল একটি গ্রন্থ হিসেবে নাজিল হয়নি, বরং তা এসেছিল মানবতার এক নতুন যুগের সূচনাবার্তা নিয়ে।
মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর দাসত্বের মহিমা গেঁথে দিতে, মহাবিশ্ব আবাদের প্রেরণা জোগাতে এবং সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কোরআনের এই আধ্যাত্মিক শক্তি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এটি এমন এক জীবন্ত সত্তা, যা মৃতপ্রায় হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে, কলুষিত সমাজকে করে পরিশুদ্ধ।
মানুষের ওপর কোরআনের প্রভাব
কোরআনের প্রভাব কেবল মানবহৃদয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জড়বস্তু ও এই সুবিশাল মহাবিশ্বের ওপরও এর গভীর প্রভাব বিদ্যমান।
আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের ওপর নাজিল করতাম, তবে তুমি দেখতে যে আল্লাহর ভয়ে তা বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।” (সুরা হাশর, আয়াত: ২১)
অটল ও কঠিন পাহাড় যদি আল্লাহর কালামের ভয়ে প্রকম্পিত হতে পারে, তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের হৃদয় কেন বিগলিত হবে না?
ফুজায়েল ইবনে ইয়াজের জীবনের গল্পটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি ছিলেন এক দস্যু। একদিন একটি বাড়ির দেয়ালে উঠছিলেন, তখন ভেতর থেকে কারো তেলাওয়াত তার কানে ভেসে এল, “মুমিনদের কি সেই সময় আসেনি যে আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাজিল হয়েছে তাতে তাদের হৃদয় বিগলিত হবে?” (সুরা হাদিদ, আয়াত: ১৬)
এই আয়াত ফুজায়েল ইবনে ইয়াজের হৃদয়ে বজ্রের মতো আঘাত করল। তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বলে উঠলেন, “হে আমার প্রতিপালক, অবশ্যই সেই সময় এসেছে।”
সেই রাতেই তিনি এক অন্ধকার গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিনি শুনতে পেলেন একদল পথিক কথা বলছে। কেউ বলছে, “চল রওনা হই,” অন্যজন বলছে, “না, দস্যু ফুজায়েল তো পথেই ওত পেতে আছে!”
এই কথা শুনে ফুজায়েলের মনে তীব্র অনুশোচনা জাগল। তিনি ভাবলেন, আমি পাপে নিমগ্ন আর মুসলমানরা আমার ভয়ে তটস্থ! আল্লাহ বোধ হয় আমাকে সতর্ক করতেই এখানে পাঠিয়েছেন।
তিনি তওবা করলেন এবং বাকি জীবন মক্কার হেরেম শরিফের পাশে কাটানোর সংকল্প করলেন। (আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৮/৮৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮)
কোরআনের এই রুহানি প্রভাব ফুজায়েল ইবনে ইয়াজকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, তার পরবর্তী জীবন হয়ে ওঠে জ্যোতির্ময়।
তিনি বলতেন, “মানুষের জন্য সত্যবাদিতা ও হালাল রিজিক অন্বেষণের চেয়ে উত্তম কোনো সৌন্দর্য নেই।”
তার পুত্র আলী যখন বললেন, “বাবা, হালাল তো এখন বড় দুর্লভ,” তখন ফুজায়েল উত্তর দিয়েছিলেন, “বৎস, হালাল অল্প হলেও আল্লাহর কাছে তা অনেক।”
সামান্য হালাল উপার্জনকে আল্লাহ বরকতময় করে দেন, যা মানুষের অন্তরকে প্রশান্তি দেয় এবং নেক আমলের পথে ধাবিত করে। (ইবনুল জাওজি, সিফাতুস সাফওয়াহ, ২/২৩৬, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০০)
বিরোধীদের হৃদয়ে কোরআনের কম্পন
কোরআনের প্রভাব কেবল পাপিষ্ঠ মুমিনকেই ফেরায় না, বরং এর অলৌকিকত্ব অবিশ্বাসীদের অন্তরকেও নাড়িয়ে দেয়।
মক্কার কোরাইশরা কোরআনের এই সম্মোহনী শক্তি নিয়ে তটস্থ থাকত। হজরত আবু বকর (রা.) যখন নিজ বাড়ির আঙিনায় নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন মক্কার নারী ও শিশুরা ভিড় জমাত। তার কান্নাজড়িত তেলাওয়াত তাদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত টান তৈরি করত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৯৪)
কোরাইশ নেতারা ভয় পেত, আবু বকরের এই তেলাওয়াত শুনলে তাদের পরিবারের সদস্যরা ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। এই ভীতিই প্রমাণ করে, কোরআন যখন অন্তর থেকে পড়া হয়, তখন তা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তিকে (ফিতরাত) নাড়িয়ে দেয়।
কোরআনের সঙ্গে সংযোগের সঠিক পথ
কোরআনের আধ্যাত্মিক সুধা পান করার প্রধান শর্ত হলো—দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে মনকে মুক্ত করে গভীর অভিনিবেশ্র সঙ্গে তেলাওয়াত করা। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, কোরআন স্বয়ং রব্বুল আলামিনের সরাসরি সম্বোধন।
যখন আমরা আয়াতুল কুরসির মতো মহান আয়াত পাঠ করি, তখন আমাদের আত্মার সঙ্গে আল্লাহর এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।
আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫)
যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করে যে মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের রিজিকদাতা এবং রক্ষক একমাত্র আল্লাহ, তখন তার মন থেকে জাগতিক সব ভয় দূর হয়ে যায়।
“আসমান ও জমিনের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই।” (সুরা ফাতহ, আয়াত: ৪)
এই বিশাল সৃষ্টিজগতের মালিক যখন আমার অভিভাবক, তখন আর কিসের চিন্তা? কোরআনের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্ক মানুষকে জীবনের চরম সংকটেও অবিচল রাখে।
কোরআনের রুহানিয়াতের ফল হলো মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা। যখন কেউ নিজের শক্তি বা ক্ষমতার মোহে মত্ত হয়, কোরআন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, “তুমি তো কখনো পদভারে পৃথিবীকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড় সমান হতে পারবে না।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩৭)
অসুস্থতার হতাশায় কোরআন শোনায়, “যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।” (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ৮০)।
দারিদ্র্য বা দুঃখের দিনে কোরআন সান্ত্বনা দেয়, “নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫)
পাপের বোঝায় নুয়ে পড়লে অভয় দিয়ে বলে, “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)