রমজানের প্রস্তুতির মাস শাবান শুরু

শাবান মাস শুরু হয়েছে। ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান। এটি মূলত পবিত্র রমজান মাসের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। মুমিনের জীবনে শাবান হলো প্রস্তুতির মাস, অনুশীলনের মাস এবং আত্মশুদ্ধির মাস। পূর্বেকার আলেমগণ একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে এই মাসের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

তাঁরা বলতেন, রজব মাস হলো বীজ বপনের সময়, শাবান মাস হলো সেই বীজে পানি সেচ দিয়ে চারাগাছ বড় করার সময়, আর রমজান হলো ফসল কাটার মাস। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ১২১, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ২০০৪)

শাবান মাস আমাদেরকে ধীরে ধীরে রমজানের ইবাদতের পরিবেশে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে যেমনিভাবে এই মাসে ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, তেমনি সাহাবিদেরও শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাব সংরক্ষণ করতে উৎসাহিত করতেন। 

আল্লাহর রাসুল (সা.) শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাবের প্রতি এত অধিক লক্ষ্য রাখতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না।
হজরত আয়েশা (রা.), সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩২৫

আয়েশা (রা.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল (সা.) শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাবের প্রতি এত অধিক লক্ষ্য রাখতেন, যা অন্য মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩২৫)

অধিক হারে নফল রোজা

আল্লাহর রাসুল (সা.) এই মাসে বছরের অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় বেশি নফল রোজা রাখতেন। এটি ছিল মূলত রমজানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘ সিয়াম সাধনার একটি আগাম অনুশীলন।

আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি আল্লাহর রাসুলকে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে শাবানের চেয়ে অধিক রোজা পালন করতে দেখিনি। শাবানের অল্প কয়েক দিন ছাড়া প্রায় পুরো মাসই তিনি রোজা রাখতেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৩৭; সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৯)

শাবান মাসে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।  আনাস (রা.) বলেন, একবার নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হলো, রমজানের পর কোন মাসের রোজা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ? উত্তরে তিনি বলেন, “রমজানের সম্মানার্থে শাবানের রোজা।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৬৩)

বার্ষিক আমলনামা পেশের মাস

অনেকেই জানি যে, প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার মহান আল্লাহর কাছে বান্দার সাপ্তাহিক আমলনামা পেশ করা হয়। কিন্তু হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো বছরের আমলনামা উপস্থাপন করা হয় কোন মাসে পেশ করা হয় শাবান মাসে। এই বাস্তবতা শাবান মাসকে আমাদের জন্য সচেতনতা ও আত্মসমালোচনার মাসে পরিণত করে।

শাবান মাস শুরু হলে পূর্ব যুগের আলেমদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আমলের গতি বেড়ে যেত। তাঁরা এই মাসকে ‘কোরআন পাঠের মাস’ (শাহরুল কুররা) হিসেবে গণ্য করতেন।

ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে শাবান মাসে অন্যান্য মাস অপেক্ষা বেশি নফল রোজা রাখতে দেখি।’ তিনি বললেন, “রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এই মাসটি সম্পর্কে মানুষ গাফেল থাকে। এটি এমন একটি মাস, যে মাসে মানুষের সকল কর্মকাণ্ড উভয় জগতের প্রতিপালকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই আমি চাই আমার আমলনামা যখন আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।” (সুনানে নাসাই, হাদিস: ২৩৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৭৫৩)

কোরআন তেলাওয়াত ও দান-সদকা

শাবান মাস শুরু হলে পূর্ব যুগের আলেমদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আমলের গতি বেড়ে যেত। তাঁরা এই মাসকে ‘কোরআন পাঠের মাস’ (শাহরুল কুররা) হিসেবে গণ্য করতেন। যারা রমজানে বেশি খতম দিতে চান, তারা এই মাস থেকেই তেলাওয়াতের সময় বাড়িয়ে দিতেন। 

আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, শাবান মাস শুরু হলে মুসলমানরা কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়তেন। (ইবনে রজব হাম্বলি, লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ১২৬, দারু ইবনি কাসির, ২০০৪)

পাশাপাশি দান-সদকার বিষয়টিও এ মাসে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সদকা মানুষের পাপের কালিমা ধুয়ে দেয়।  মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “সদকা পাপকে মিটিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬১৬)

আলেমগণ শাবান মাসেই তাঁদের জাকাত আদায় করে দিতেন, যাতে অভাবী মানুষরা রমজানের আগেই স্বচ্ছলতা লাভ করতে পারে এবং শান্তিতে রোজা ও ইবাদত পালনের শক্তি পায়।

কাজা রোজা আদায় ও ইস্তিগফার

যাঁদের আগের রমজানের কোনো কাজা রোজা বাকি আছে, তাঁদের জন্য শাবান মাস হলো সেই রোজাগুলো আদায়ের শেষ সুযোগ।  আয়েশা (রা.) বলেন, “আমার ওপর রমজানের কাজা রোজা থাকত, যা শাবান মাস ছাড়া আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫০)

তাই মা-বোনদের উচিত এ মাসে তাঁদের কাজা রোজাগুলো দ্রুত শেষ করা।

আলেমগণ শাবান মাসেই তাঁদের জাকাত আদায় করে দিতেন, যাতে অভাবী মানুষরা রমজানের আগেই স্বচ্ছলতা লাভ করতে পারে এবং শান্তিতে রোজা ও ইবাদত পালনের শক্তি পায়।

এ ছাড়া এই মাসে বেশি বেশি তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন। কারণ আমলনামা পেশের সময় আল্লাহর কাছে পবিত্র হয়ে উপস্থিত হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “সুসংবাদ তার জন্য, যে তার আমলনামায় অনেক বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) পেয়েছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮১৮)

শাবান মাস হলো মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। যারা এ মাসে অবহেলা করবে, তাদের জন্য রমজানের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাই আমাদের উচিত অধিক হারে নফল রোজা রাখা (অন্তত সোম ও বৃহস্পতিবার এবং আইয়ামে বিজের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ), কোরআন তেলাওয়াত বাড়ানো এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবান মাসে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের রমজানের জন্য কবুল করুন। আমিন।

writerismat@gmail.com 

ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক