পাথেয়

সুখী দাম্পত্য জীবন পেতে ইসলামের ৫ কৌশল

রাত নয়টা। অফিস থেকে ফিরলেন। কাপড় বদলে সোফায় বসলেন। হাতে ফোন। স্ত্রীও রান্নাঘরের কাজ শেষে পাশে এসে বসল। তার হাতেও ফোন। দুজন একই ঘরে। কিন্তু কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। খাবার টেবিলেও তেমন কথা হলো না।

সন্তানের স্কুল, বাজারের হিসাব, বিদ্যুৎ বিল, এটুকুই। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলেন, শেষ কবে দুজনে প্রাণ খুলে গল্প করেছিলেন? কবে শেষবার কোনো কারণ ছাড়াই একসঙ্গে হেসেছিলেন? মনে পড়ল না। এভাবেই চলছে জীবন। দিন দিন সংসারের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বর্ণিত কাল্পনিক দৃশ্যপট যদি আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে জেনে রাখুন, আধুনিক সময়ে এই সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এক ঘরে বসবাস করেও আমরা একে অপরের থেকে শতবর্ষ দূরে। আসুন, জেনে নিই কোরআন এ ব্যাপারে কী বলে।

তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন আছে।
সুরা রুম, আয়াত: ২১

কোরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন আছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

এই আয়াতের তিনটি শব্দ খেয়াল করুন। প্রথমত, ‘যেন তোমরা প্রশান্তি পাও’। বিয়ের প্রথম উদ্দেশ্যই প্রশান্তি। সংসার মানে শুধু দায়িত্ব পালনের জায়গা নয়, প্রশান্তি পাওয়ার জায়গাও। দ্বিতীয়ত, ‘ভালোবাসা’।

ভালোবাসা প্রকাশ পায় কাজে, কথায়, আচরণে। তৃতীয়ত, দয়া। ভালোবাসা ও দায়িত্বের পাশাপাশি মমতা, সহানুভূতি ও যত্ন না থাকলে সে ভালোবাসা পূর্ণ হয় না।

সুন্দর দাম্পত্যের জন্য করণীয়

১. পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ: প্রকৃত ভালো মানুষের পরিচয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)

মহানবী (সা.) মানুষের ভালো হওয়ার মাপকাঠি ঠিক করে দিয়েছেন এই হাদিসে। বাইরে কেউ যত ভালো ব্যবহার করুক, ঘরে সেই আচরণ না থাকলে সেটা প্রকৃত ভালো মানুষের পরিচয় নয়।

২. পস্পরের ত্রুটি মেনে নেওয়া: সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আসল চাবিকাঠি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার মধ্যে কোনো স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব নিশ্চয়ই পছন্দ হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)

কোনো মানুষই নিখুঁত নয়, জীবনসঙ্গীও নন। একটা খারাপ দিক দেখে পুরো মানুষটাকে বিচার করা ঠিক নয়। যে সংসারে এই ভারসাম্য থাকে, সেই সংসারেই স্থিরতা থাকে।

পোশাক শরীর ঢেকে রাখে, রক্ষা করে, সুন্দর করে তোলে। স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের জন্য তেমনই। একে অপরের দোষ-ত্রুটি বাইরে প্রকাশ না করা, একে অপরকে আগলে রাখা, এটাই আয়াতের শিক্ষা।

৩. সংসারের কাজে হাত লাগানো: এটা নবীজির সুন্নত। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহানবী (সা.) ঘরে কী করতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি নিজের পরিবারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য বের হতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)

নবীজি (সা.) নিজে ঘরের কাজে হাত লাগাতেন। সংসারের কাজ শুধু একজনের দায়িত্ব নয়, যিনি যতটুকু পারেন এগিয়ে আসাটাই সুন্নাহ।

৪. সদাচরণ বজায় রাখা: এটা আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ। আল্লাহ সুরা নিসায় বলেন, ‘আর তাদের সঙ্গে সদাচরণে জীবন যাপন করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)

‘মারুফ’ মানে যা সমাজে ও ইসলামে ভালো বলে স্বীকৃত। মন খারাপ থাকলেও, কষ্ট থাকলেও, ভালো ব্যবহার বজায় রাখতে হবে। এটা ঐচ্ছিক নয়। বাধ্যতামূলক।

৫. একে অপরের রক্ষাকবচ হওয়া: গোপনীয়তা ও দুর্বলতা আগলে রাখা। আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাক, আর তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

পোশাক শরীর ঢেকে রাখে, রক্ষা করে, সুন্দর করে তোলে। স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের জন্য তেমনই। একে অপরের দোষ-ত্রুটি বাইরে প্রকাশ না করা, একে অপরকে আগলে রাখা, এটাই এই আয়াতের শিক্ষা।

সিরাত থেকে শিক্ষা

আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। একবার তিনি নবীজিকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। পরে যখন তাঁর শরীর কিছুটা ভারী হয়ে যায়, আরেকবার প্রতিযোগিতা হলে মহানবী (সা.) জিতে যান। তখন তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘এটা ছিল তোমার আগের জয়ের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)

এই ছোট্ট ঘটনার মধ্যে কত বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। নবুয়তের গুরুদায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরও মহানবী (সা.) স্ত্রীর সঙ্গে খুনসুটি করার সময় বের করতেন। তার মানে সংসার শুধু দায়িত্ব আর কর্তব্য নয়, সংসার আনন্দময় হবে।

যে সংসারে প্রশান্তি আছে, ভালোবাসা আছে, দয়া আছে, সেই সংসারই আসলে সফল সংসার। বাকি সবকিছু এর পরে।

একটু থামুন

আজ রাতে ফোনটা একটু সরিয়ে রাখুন। জীবনসঙ্গীর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করুন, দিনটা কেমন গেল। একটি প্রশংসা করুন। একসঙ্গে হেসে কিছুক্ষণ গল্প করুন। জীবনসঙ্গীকে সুখী রাখতে আন্তরিকতা, হাসিমুখে একসঙ্গে কাটানো কিছু সময় কখনো কখনো বিশাল আয়োজনের থেকেও বড় আনন্দ এনে দিতে পারে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।’ উত্তম ব্যক্তি হতে চাইলে অবশ্যই এই মানদণ্ড মাথায় রাখতে হবে।

যে সংসারে প্রশান্তি আছে, ভালোবাসা আছে, দয়া আছে, সেই সংসারই আসলে সফল সংসার। বাকি সবকিছু এর পরে।

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়