
আমরা যেকোনো মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে মন খুলে চাইতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর কাছে চাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল-কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (সুরা গাফির, আয়াত: ৬০)
তবে ইসলামে এমন কিছু বিশেষ ও বরকতময় মুহূর্তের কথা বলা হয়েছে, যখন বান্দার ডাক সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায় এবং দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। হাদিসের আলোকে এমন ১০টি অনন্য সময়ের কথা জানা যায়, যা দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত।
দোয়া কবুলের সবচেয়ে বরকতময় সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। যখন পুরো পৃথিবী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, চারপাশ শান্ত থাকে, তখন যে বান্দা বিছানা ছেড়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে হাত তোলে, তার আবেদন কখনোই ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
নামাজের মধ্যে সেজদা হলো মানুষের অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সর্বোচ্চ অবস্থা। সেজদার সময়ে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে আমাদের রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন—কে আছো যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে চাইবে আর আমি তাকে দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব? (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান এবং জামাত শুরুর জন্য দেওয়া একামতের মাঝখানের সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সামান্য সময়টি আমরা প্রায়ই গল্পগুজব বা মোবাইল দেখে পার করে দিই।
অথচ এ সময়ে দোয়া করলে তা ফেরত দেওয়া হয় না। মহানবী (সা.) বলেছেন, আজান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়ে যে দোয়া করা হয়, তা ফেরত দেওয়া হয় না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১২)
নামাজের মধ্যে সেজদা হলো মানুষের অহংকার বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সর্বোচ্চ অবস্থা। সেজদার সময়ে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
নামাজের সেজদায় মন খুলে নিজের মনের আকুতি ও অভাব আল্লাহর কাছে তুলে ধরা উচিত।
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ শেষ করার ঠিক আগের মুহূর্তটি—অর্থাৎ আত–তাহিয়্যাতু ও দরুদ শরিফ পাঠ করার পর সালাম ফেরানোর আগের সময়টি দোয়া কবুলের অন্যতম সেরা সময়।
নবীজিকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন সময়ের দোয়া সবচেয়ে বেশি শোনা হয়? তিনি জবাবে বললেন, গভীর রাতের দোয়া এবং ফরজ নামাজের শেষ ভাগের দোয়া। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৯৯)
জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম যদি সে সময়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়রত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেবেন।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫
শুক্রবার দিনে এমন একটি গোপন মুহূর্ত রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছু চাইলে তিনি তা অবশ্যই দান করেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম যদি সে সময়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়রত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫)
আলেমদের মতে, এই মুহূর্তটি জুমার খুতবা ও নামাজের সময় কিংবা আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার পর রোজাদার ব্যক্তি যখন ইফতারির সামনে বসে অপেক্ষা করে, তখন সে অত্যন্ত বিনয়ী ও আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থাকে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তের দোয়া আল্লাহ–তাআলা কবুল করেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে এবং মজলুম বা নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫২৬)
আকাশ থেকে যখন বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তখন রহমতের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। এটি কেবল প্রকৃতির শুষ্কতা দূর করে না, বরং এটি বান্দার দোয়া কবুলেরও এক বিশেষ ক্ষণ।
মহানবী (সা.) বলেছেন, দুটি সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না অথবা খুব কমই ফেরত দেওয়া হয়—আজানের সময়ের দোয়া এবং বৃষ্টির বর্ষণের সময়ের দোয়া। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪০)
জিলহজ মাসের ৯ তারিখ অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিনটি পুরো বছরের মধ্যে দোয়া কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। কেবল হজ পালনকারীদের জন্যই নয়, বিশ্বজুড়ে সব মুসলিমের জন্য এই দিনটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৮৫)
বিশেষ সময়গুলোকে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে অন্য সময়ে দোয়া করা যাবে না। বরং আমরা সারাদিনের যেকোনো সময়ে, যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর কাছে চাইতে পারি।
রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা কদরের রাত হলো হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত। এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হতে থাকে।
আয়েশা (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই, তবে কী দোয়া করব? আল্লাহর রাসুল তাঁকে শেখালেন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা পছন্দ করো, তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)
মানুষ যখন কঠিন বিপদে পড়ে বা কারও ওপর অন্যায়-অবিচার করা হয়, তখন তার অন্তর একেবারে ভেঙে পড়ে। এই অসহায় মুহূর্তে কেউ যখন অন্তর থেকে আল্লাহকে ডাকে, সেই ডাক সরাসরি আরশে আজিমে পৌঁছে যায়।
মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, মজলুমের বদদোয়া বা ডাককে ভয় করো, কারণ তার দোয়া এবং আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা থাকে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৮)
এছাড়া কঠিন বিপদের সময়ে আন্তরিকভাবে দোয়া করলে আল্লাহ তা দূর করে দেন। (সুরা নামল, আয়াত: ৬২)
পরিশেষে, দোয়া হলো আল্লাহর সঙ্গে অন্তরের গভীর সম্পর্ক গড়ার এক সেতু। নির্দিষ্ট এই বিশেষ সময়গুলোকে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে অন্য সময়ে দোয়া করা যাবে না। বরং আমরা সারাদিনের যেকোনো সময়ে, যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর কাছে চাইতে পারি।
তবে এই বিশেষ মুহূর্তগুলোর মর্যাদা জেনে তা কাজে লাগাতে পারলে আমাদের আত্মিক জীবনের প্রশান্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে।