ধর্ম–দর্শন

কোরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত ‘আলেম’ কে

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইলম বা জ্ঞানের মর্যাদা এবং আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত হলো, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।” (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (যেমন: বিভিন্ন রং, পাহাড়ের গঠন ও সৃষ্টিবৈচিত্র্য) সংক্রান্ত আলোচনার সমাপ্তিতে এসেছে। এটি নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্বের সৃষ্টিশৈলী ও কুদরত যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তারাই আল্লাহর মহিমা ও একত্ববাদ বুঝতে সক্ষম হন এবং তাদের মনেই প্রকৃত ‘খশিয়ত’ বা ভয় জাগ্রত হয়।

যার অন্তরে খোদাভীতি নেই, কোরআনের পরিভাষায় সে প্রকৃত আলেম নয়। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, আত-তাফসিরুল মুনির, ২২/২৬২, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ১৯৯১)

যে আল্লাহকে যত বেশি জানবে, তার মনে আল্লাহর ভয় তত প্রবল হবে। আলেমগণ আল্লাহর গুণাবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক অবগত বলেই তাঁদের ভীতি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি।

খোদাভীতি কি আলেমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ

এই আয়াতে ‘ইন্‌নামা’ শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহর ভয়কে শুধু আলেমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, সাধারণ মানুষের মনে আল্লাহর ভয় থাকতে পারে না। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো:

১. পূর্ণাঙ্গ ‘মারিফাত’: যে আল্লাহকে যত বেশি জানবে, তার মনে আল্লাহর ভয় তত প্রবল হবে। আলেমগণ আল্লাহর গুণাবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক অবগত বলেই তাঁদের ভীতি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি।

২. জাহেলিয়াত ও ভীতি: ইমাম ইবনে আশুরের মতে, এটি একটি তুলনামূলক আলোচনা। যারা জাহেল বা অজ্ঞ, তারা আল্লাহর কুদরত সম্পর্কে উদাসীন থাকে বলে তাদের অন্তরে সেই ভয় থাকে না যা একজন জ্ঞানীর থাকে। (ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২২/৩০৫, আদ-দারুত তিউনিসিয়্যাহ, তিউনিসিয়া, ১৯৮৪)

আলেম তিনিই, যিনি না দেখেও দয়াময় রহমানকে ভয় করেন এবং আল্লাহ যা পছন্দ করেন তাতে আগ্রহী হন।
হাসান বসরি (রহ.)

প্রকৃত আলেমের সংজ্ঞা

আয়াতে উল্লেখিত ‘আলেম’ বলতে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়নি। সালাফদের দৃষ্টিতে প্রকৃত আলেমের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • ইবনে আব্বাস: আলেম তাঁরাই, যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/৫৪৪, দারুত তাইয়্যিবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)

  • আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ: অধিক হাদিস জানাই জ্ঞান নয়, বরং আল্লাহর প্রতি অধিক ভয় রাখাই হলো প্রকৃত জ্ঞান" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৫৮ 

  • তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবায়ের: ‘খশিয়ত’ বা ভয় হলো তা-ই, যা আপনাকে আল্লাহর নাফরমানি বা পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (আহমদ ইবনে হাম্বল, কিতাবুয জুহদ, পৃষ্ঠা: ২৯১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৯) 

  • ইমাম মালেক: ইলম শুধু অধিক বর্ণনার নাম নয়, বরং ইলম হলো একটি ‘নূর’ বা আলো, যা আল্লাহ মুমিনের হৃদয়ে স্থাপন করেন। (ইবনুল কাইয়্যিম, মিফতাহু দারিস সাআদাহ, ১/১১৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০২)

  • হাসান বসরি: আলেম তিনিই, যিনি না দেখেও দয়াময় রহমানকে ভয় করেন এবং আল্লাহ যা পছন্দ করেন তাতে আগ্রহী হন। (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৪/৩৪৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৬)

জ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস ও অগ্রাধিকার

ইমাম গাজালি (র.) জ্ঞানকে তাঁর গুরুত্ব অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে আল্লাহ–তাআলা, তাঁর গুণাবলি এবং আখেরাত সংক্রান্ত জ্ঞান হলো সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞান, যা মানুষের পরকালীন মুক্তির পাথেয় (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/৩৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ২০১০)

ইবনে কুদামা এই আলোচনার রেশ ধরে বলেন, জ্ঞানকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:

১. সর্বোচ্চ প্রশংসনীয় জ্ঞান: আল্লাহ তাআলা, তাঁর গুণাবলি এবং আখেরাত সংক্রান্ত জ্ঞান। এটি যত বেশি অর্জন করা যায়, ততই মঙ্গল।

২. সীমিত প্রশংসনীয় জ্ঞান: চিকিৎসা, গণিত বা ফিকহের খুঁটিনাটি বিষয়—যা সমাজের প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শেখা জরুরি। তবে নিজের আত্মশুদ্ধির আগে এসবে অতিরিক্ত ডুবে যাওয়া উচিত নয়।

৩. নিন্দনীয় জ্ঞান: যা দুনিয়া বা আখেরাতে কোনো উপকার দেয় না বরং ক্ষতি করে; যেমন—জাদুবিদ্যা বা জ্যোতিষশাস্ত্র। মূল্যবান জীবনকে এসবে ব্যয় করা এক ধরনের অপচয়। (মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন, পৃষ্ঠা: ২০, দারুল বায়ান, দামেস্ক, ১৯৭৮)

যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় পায় না, সে যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেন, কোরআনের পরিভাষায় সে আলেম নয়। কেননা, ইলম বা জ্ঞানের মূল নির্যাস হলো বিনয় ও তাকওয়া।

ইমাম ইবনে আশুর ও অন্যান্য মুফাসসিরদের মতে, এখানে আলেম বলতে মূলত আল্লাহ ও তাঁর শরিয়ত সম্পর্কে যারা জ্ঞানী, তাঁদের বোঝানো হয়েছে। তবে যারা আধুনিক বিজ্ঞানের (পদার্থ, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি) চর্চা করেন, তাঁরাও যদি সৃষ্টির নিপুণতা দেখে স্রষ্টার বড়ত্ব অনুভব করেন, তবে তাঁরাও এই ভয়ের একটি অংশীদার হবেন।

কিন্তু শুধু পার্থিব জ্ঞান যা মানুষকে স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছায় না, তা প্রকৃত ইলম হিসেবে গণ্য নয়। (ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২২/৩০৫, আদ-দারুত তিউনিসিয়্যাহ, তিউনিসিয়া, ১৯৮৪)

সারকথা

একজন মানুষের জ্ঞান তাকে কতটা আল্লাহভীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা-ই হলো তার প্রকৃত আলেম হওয়ার মাপকাঠি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় পায় না, সে যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেন, কোরআনের পরিভাষায় সে আলেম নয়।

কেননা, ইলম বা জ্ঞানের মূল নির্যাস হলো বিনয় ও তাকওয়া।