জীবনে ইসলাম

অন্যের ঘরে প্রবেশ: ইসলাম যেভাবে অনুমতি নিতে বলে

অন্যের ঘরে বা ব্যক্তিগত স্থানে হঠাৎ প্রবেশ করে কাউকে অপ্রস্তুত বা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা সামাজিক অপরাধ। এ জন্যই ইসলাম অন্যের গৃহে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি প্রার্থনাকে একটি অপরিহার্য নৈতিক ও ধর্মীয় বিধান করেছে।

কোরআনের নির্দেশ 

কারও ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া কোরআনের অলঙ্ঘনীয় আদেশ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে প্রবেশ কোরো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নাও এবং গৃহবাসীদের সালাম দাও। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৭)

পরের আয়াতে ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আরও স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা ঘরে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ কোরো না। আর যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র পদ্ধতি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৮)

অনুমতি প্রার্থনার সুন্নাহ পদ্ধতি

অনুমতি চাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো, আগে সালাম দেওয়া, তারপর প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করা।

এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে সালাম না দিয়েই ঘরের বাইরে থেকে বলল, ‘আমি কি ভেতরে ঢুকব?’ নবীজি (সা.) তাঁর খাদেমকে বললেন, ‘তুমি বাইরে গিয়ে তাকে আদব শেখাও। তাকে বলো, প্রথমে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলো, এরপর বলো, ‘আমি কি ভেতরে আসতে পারি?’’ লোকটি সেভাবেই অনুমতি চাইল এবং নবীজি তাকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৭৭)

পেছন দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করায় কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য হলো যে তাকওয়া অবলম্বন করে। অতএব তোমরা ঘরের মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করো।
সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৯

সদর দরজা দিয়ে প্রবেশের নির্দেশ

ঘরে প্রবেশের সময় অবশ্যই মূল বা সদর দরজা ব্যবহার করতে হবে। গোপন পথ, পেছনের বেড়া বা দেয়াল টপকে ঢোকা ইসলামে নিষিদ্ধ।

জাহেলি যুগে মানুষ হজের ‘ইহরাম’ অবস্থায় ঘরের দরজা দিয়ে না ঢুকে পেছনের দেয়াল টপকে প্রবেশ করত এবং এটিকে ধার্মিকতা ভাবত।

কোরআনে এই প্রথা বাতিল করে আল্লাহ বলেন, ‘পেছন দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করায় কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য হলো যে তাকওয়া অবলম্বন করে। অতএব তোমরা ঘরের মূল দরজা দিয়ে প্রবেশ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৯)

অর্থাৎ যেকোনো ঘরে প্রবেশের সময় সদর দরজায় উপস্থিত হয়ে অনুমতি চাওয়াই একমাত্র বৈধ পন্থা।

দরজার সামনে দাঁড়ানোর অবস্থান

অনুমতি চাওয়ার সময় দরজার ঠিক মুখোমুখি বা মাঝবরাবর দাঁড়ানো সুন্নাহর পরিপন্থী। কারণ দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভেতরের দৃশ্য বা নারীদের অসতর্ক অবস্থা চোখে পড়তে পারে।

রাসুল (সা.) যখন কারও ঘরের দরজায় উপস্থিত হতেন, তখন দরজার মুখোমুখি দাঁড়াতেন না; বরং দরজার ডান অথবা বাঁ পাশে সরে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, আসসালামু আলাইকুম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৮৬)

দৃষ্টির হেফাজতই অনুমতির মূল কারণ

ঘরের ভেতরে উঁকি দেওয়া বা অনুমতি ছাড়া দৃষ্টিপাত করাকে ইসলামে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এক ব্যক্তি নবীজির ঘরের দরজার ছিদ্র দিয়ে ভেতরের দিকে উঁকি দিল। তখন নবীজির হাতে একটি লোহার চিরুনি ছিল। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আমি যদি জানতাম তুমি উঁকি দিচ্ছ, তবে এটি দিয়ে তোমার চোখ ফুটো করে দিতাম! মূলত দৃষ্টিপাতের বিপদের কারণেই তো অনুমতি নেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪১)

দরজার বাইরে থেকে কে এসেছেন জানতে চাইলে অস্পষ্টভাবে কেবল ‘আমি’ বলা অনুচিত। নিজের স্পষ্ট নাম বা পরিচয় দেওয়া উচিত।

সর্বোচ্চ তিনবার অনুমতি চাওয়া

কারও দরজায় কড়া নাড়া বা অনুমতি চাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা হলো তিনবার। তিনবার সালাম বা আওয়াজ দেওয়ার পরও যদি কোনো সাড়া না মেলে, তবে সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে নীরবে ফিরে আসা সুন্নত।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অনুমতি চাওয়ার নিয়ম তিনবার। যদি তোমাকে অনুমতি দেওয়া হয় তবে প্রবেশ করবে, আর যদি অনুমতি না দেওয়া হয় তবে ফিরে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৫)

পরিচয়ে ‘আমি’ না বলে নাম বলা

দরজার বাইরে থেকে কে এসেছেন জানতে চাইলে অস্পষ্টভাবে কেবল ‘আমি’ বলা অনুচিত। নিজের স্পষ্ট নাম বা পরিচয় দেওয়া উচিত।

সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, আমি আমার পিতার ঋণের ব্যাপারে নবীজির দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’ আমি বললাম, ‘আমি’। তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, ‘আমি, আমি!’ অর্থাৎ তিনি শুধু ‘আমি’ বলাকে অপছন্দ করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৫০)

ঘরের ভেতরেও গোপনীয়তার সীমা

শুধু বাইরের মানুষের ঘরেই নয়, নিজ ঘরের ভেতরেও মা-বাবা বা প্রাপ্তবয়স্কদের কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কোরআনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে ফজর নামাজের পূর্বে, দুপুরের বিশ্রামের সময় এবং এশার নামাজের পর—এই তিন সময়ে এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও গৃহকর্মীদেরও অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতে হবে। (সুরা নূর, আয়াত: ৫৮)

এক সাহাবি রাসুলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমি কি আমার মায়ের ঘরে প্রবেশের সময়ও অনুমতি নেব?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সাহাবি বললেন, ‘আমি তো তাঁর সেবা করি!’ নবীজি বললেন, ‘অনুমতি নিয়ে নাও, তুমি কি তোমার মাকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে চাও?’ (মুওয়াত্তা মালেক, হাদিস: ১৮২৫)

অনুমতি নেওয়ার এই সুন্নাহ বিধান মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা, ঘরের গোপনীয়তা এবং পারিবারিক পবিত্রতার সুরক্ষা দেয়। 

কারও ঘরে হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত না হওয়া, কলিং বেল একটানা না বাজানো এবং কোনো কক্ষ বা কার্যালয়ে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার এই চমৎকার সুন্নাহ চর্চা করা একটি মার্জিত ও দায়িত্বশীল সমাজের প্রধান লক্ষণ।