পরিবার হলো মানুষের অস্তিত্বের শেকড়। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবিচার কিংবা খোদায়ী পরীক্ষার অংশ হিসেবে বহু মানুষ তাদের আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখি আল্লাহর প্রেরিত নবীরাও এমন চরম বিচ্ছেদের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই যাতনা কীভাবে কল্যাণে রূপান্তরিত হয়েছিল, তা আমাদের জন্য বড় এক শিক্ষার উৎস।
হজরত মুসা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল এক বিভীষিকাময় সময়ে। তৎকালীন মিশরের শাসক ফেরাউন বনি ইসরায়েলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।
পবিত্র কোরআনে সেই ভয়াবহতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে এভাবে, ‘নিশ্চয় ফেরাউন দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং সেখানের অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে তাদের একটি দলকে দুর্বল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্রসন্তানদের জবাই করত এবং নারীদের জীবিত রাখত। নিশ্চয় সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৪)
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সেই শিশুটি ভেসে গিয়ে পৌঁছাল স্বয়ং শত্রু ফেরাউনের প্রাসাদে। আল্লাহর অপার মহিমায় ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়ার মনে শিশুটির প্রতি মমতা জন্মে গেল।
এমন পরিস্থিতিতে মুসা (আ.)-এর মা যখন তাকে নিয়ে শঙ্কিত, তখন আল্লাহ–তাআলা তাকে এক অকল্পনীয় নির্দেশ দিলেন—সন্তানকে একটি বাক্সে ভরে নীল নদে ভাসিয়ে দিতে।
একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষা আর কী হতে পারে? কিন্তু আল্লাহর প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল অবিচল। আল্লাহ তাকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘মুসার মায়ের প্রতি নির্দেশ পাঠালাম, তাকে দুধ পান করাও। যখন তুমি তার ব্যাপারে কোনো আশঙ্কা করবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করো। ভয় পেয়ো না এবং চিন্তিত হয়ো না। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের একজন করব।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭)
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সেই শিশুটি ভেসে গিয়ে পৌঁছাল স্বয়ং শত্রু ফেরাউনের প্রাসাদে। আল্লাহর অপার মহিমায় ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়ার মনে শিশুটির প্রতি মমতা জন্মে গেল।
শেষ পর্যন্ত মুসা (আ.)-কে দুধ পান করানোর জন্য তাঁর নিজের মাকেই ধাত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এভাবেই আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আরেকটি হৃদয়বিদারক উদাহরণ হজরত ইউসুফ (আ.)। তবে নবী মুসার ক্ষেত্রে শত্রু ছিল বাইরের কেউ, আর নবী ইউসুফের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের কারণ ছিল তাঁর আপন ভাইদের ঈর্ষা। তারা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত একটি অন্ধকার কূপে ফেলে দেয়।
তারা তাদের বৃদ্ধ বাবা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলেছিল যে, ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা রাতের বেলা কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার কাছে এলো। বলল, হে আমাদের পিতা, আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের আসবাবপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৬-১৭)
যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।কোরআন, সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৭
একদিকে কিশোর ইউসুফ পরিবার থেকে দূরে দাসের বাজারে বিক্রি হয়ে মিশরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন, অন্যদিকে তাঁর পিতা ইয়াকুব (আ.) প্রিয় সন্তানের শোকে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর এই বিচ্ছেদ স্থায়ী ছিল। কিন্তু ইয়াকুব (আ.) কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। তিনি তাঁর ছেলেদের বলেছিলেন, ‘হে আমার ছেলেরা, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৭)
পরিশেষে, আল্লাহ–তাআলা ইউসুফ (আ.)-কে মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করেন এবং পুরো পরিবারের পুনর্মিলন ঘটান। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ ছিল ইউসুফ (আ.)-কে ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং একটি জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে গড়ে তোলার খোদায়ী কৌশল।
সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনও ছিল বিচ্ছেদ ও হারানোর বেদনায় ঘেরা। জন্মের আগেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় গিয়েছিলেন স্বামীর কবর জিয়ারত করতে। ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মা অসুস্থ হয়ে মারা যান।
কল্পনা করুন, একটি ছয় বছরের শিশু মরুভূমির মাঝে আপন বলতে থাকা একমাত্র মানুষটি—তার মাকেও হারিয়ে ফেলল।
এরপর তিনি বড় হয়েছেন দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে, তাঁর মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিবের কাছে। শৈশবের এই ধারাবাহিক বিচ্ছিন্নতা ও অভিভাবক পরিবর্তন তাঁকে মানসিকভাবে দৃঢ় এবং অন্যের দুঃখ বোঝার মতো সংবেদনশীল করে গড়ে তুলেছিল।
আল্লাহ–তাআলা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পথহারা অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।’ (সুরা দোহা, আয়াত: ৬-৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই অনাথ জীবন ছিল কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল অসহায় ও পরিবারবিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য এক বড় সান্ত্বনা।
বর্তমানে যারা বিভিন্ন কারণে পরিবার থেকে দূরে আছেন বা একাকিত্বে ভুগছেন, তাদের উচিত নবীদের জীবনী থেকে শক্তি সঞ্চয় করা।
নবীদের এই জীবনের গল্পগুলো কেবল ইতিহাস নয়, বরং আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা প্রিয়জনকে হারানো চরম কষ্টের বিষয় হলেও মুমিন কখনো ভেঙে পড়ে না।
১. আল্লাহর ওপর ভরসা: মুসা (আ.)-এর মা এবং ইয়াকুব (আ.)-এর ধৈর্য আমাদের শেখায় যে পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময় মঙ্গলের জন্য হয়।
২. নিরাশ না হওয়া: চরম সংকটেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী আমাদের শেখায় যে, অন্ধকারের পরেই আলোর দেখা মেলে।
৩. ধৈর্যের ফল সুমিষ্ট: নবীদের জীবনে বিচ্ছেদ ছিল সাময়িক, কিন্তু সেই বিচ্ছেদের বিনিময়ে তারা যে সম্মান ও মাকাম লাভ করেছেন, তা চিরস্থায়ী।
বর্তমানে যারা বিভিন্ন কারণে পরিবার থেকে দূরে আছেন বা একাকিত্বে ভুগছেন, তাদের উচিত নবীদের জীবনী থেকে শক্তি সঞ্চয় করা। মনে রাখতে হবে, মানুষের পরিকল্পনা যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর কুদরতের পরিকল্পনা সেখান থেকেই শুরু হয়।