ইসলামি জ্ঞানচর্চায় ‘আকিদা’ বা বিশ্বাসের বিষয়বস্তু হলো স্বয়ং আল্লাহ–তাআলা। একারণেই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের আলোচনাকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ বলে অভিহিত করেছেন।
মানুষের আত্মার প্রশান্তি ও হৃদয়ের সজীবতা শুধু তখনই সম্ভব, যখন সে তার প্রতিপালককে তাঁর নাম, গুণাবলি ও কার্যাবলির মাধ্যমে চিনতে পারে।
আকিদা বা তাওহিদের ওপর ভিত্তি করে রিসালাতের বাকি দুটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে:
১. পথের পরিচয়: আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর রাস্তা বা শরিয়তের বিধান (আদেশ ও নিষেধ)।
২. গন্তব্যের পরিচয়: যারা এই পথে চলবে, তাদের জন্য পরকালীন চিরস্থায়ী নেয়ামত বা জান্নাতের বর্ণনা।
১. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের মূল ভিত্তি: আকিদা হলো সেই সুদৃঢ় রশি যা মানুষের অন্তরগুলোকে পরস্পর জুড়ে দেয়। ইসলামের আগমনের আগে আরবরা গোত্রীয় দাঙ্গা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও লক্ষ্যহীন জীবনে নিমজ্জিত ছিল। আকিদা তাদের এক পতাকাতলে নিয়ে এসে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, “তোমরা সকলে আল্লাহর রশি শক্ত করে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না” (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১০৩)।
২. উম্মাহর মুক্তিদাতা: আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সালাফদের (পূর্বসূরিদের) বিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ আকিদা আঁকড়ে না ধরলে এই উম্মত প্রকৃত হেদায়েত ও বিজয় লাভ করতে পারবে না। এটি আল্লাহর দেওয়া সেই রঙ (সিবগাতুল্লাহ), যা মানুষের স্বভাবজাত ধর্মের সঙ্গে মিশে আছে। দুনিয়াতে আল্লাহর সাহায্য এবং আখেরাতে জান্নাত পাওয়ার একমাত্র শর্ত হলো এই বিশুদ্ধ বিশ্বাস।
৩. আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত: সঠিক আকিদা ছাড়া কোনো নেক আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। বিশ্বাস যদি কলুষিত হয়, তবে মানুষের সারা জীবনের শ্রম বিফলে যাবে।
কোরআন বলছে, “যে বিশ্বাসী অবস্থায় সৎকাজ করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)
বিপরীতে কাফের বা সঠিক আকিদাহীনদের আমল সেই ছাইয়ের মতো, যা প্রচণ্ড ঝড়ের দিনে বাতাসে উড়ে যায়। (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ১৮)
৪. দাওয়াতের অগ্রাধিকার: রাসুল (সা.) নবুয়তের দীর্ঘ ২৩ বছরের মধ্যে মক্কার প্রথম ১৩ বছর শুধু আকিদা ও ইমানি মজবুতির ওপর ব্যয় করেছেন। যখন মানুষের মনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও পরকালের জবাবদিহিতার ভয় বদ্ধমূল হলো, তখনই শুধু ইবাদত ও মুয়ামালাতের (লেনদেন) বিস্তারিত বিধানগুলো নাজিল করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে আমলের আগে আকিদা সংশোধন জরুরি।
৫. সকল নবীর অভিন্ন আহ্বান: পৃথিবীতে আগত সকল নবী ও রাসুলের শরিয়ত ভিন্ন হলেও তাঁদের আকিদা বা বিশ্বাসের মূল কথা ছিল এক। তাঁরা সকলেই এসে বলেছেন, “আল্লাহর বন্দেগি করো এবং তাগুতকে বর্জন করো।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৩৬)
নবী আদম (আ.) থেকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত ইসলামের এই মূল ভিত্তি কখনো পরিবর্তিত হয়নি।
৬. সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য: মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের প্রথম ধাপ হলো আল্লাহকে চেনা। যে ব্যক্তি তার স্রষ্টা ও তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে অজ্ঞ, সে কখনোই প্রকৃত ইবাদত করতে পারে না। আল্লাহর আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি) নিয়ে চিন্তাগবেষণা করা ইমানের স্তরকে বৃদ্ধি করে এবং বান্দাকে দৃঢ় বিশ্বাসের (ইয়াকিন) পর্যায়ে নিয়ে যায়।
৭. কোরআনের প্রধান আলোচ্য বিষয়: পবিত্র কোরআনের এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে আল্লাহর নাম, গুণাবলি বা কার্যাবলির উল্লেখ নেই। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, কোরআনে জান্নাতের বিবরণ বা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আল্লাহর নাম ও গুণের আলোচনা অনেক বেশি।
কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত ‘আয়াতুল কুরসি’ এবং শ্রেষ্ঠ সুরাগুলোর অন্যতম ‘সুরা ইখলাস’ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর পরিচয়ে ভরপুর। যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলিকে ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন।
আকিদা হলো ইসলামের প্রাণ। একজন মুমিনের জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে সে তার রবকে কতটুকু চিনল এবং তাঁর প্রতি কতটা অনুগত হলো তার ওপর। বিশুদ্ধ আকিদা শুধু পরকালের মুক্তির সনদ নয়, বরং এটি দুনিয়াতেও একটি ইনসাফপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের একমাত্র হাতিয়ার।