পাথেয়

ইসলামের দৃষ্টিতে বংশের চার পুরুষের ধারণা

পৃথিবীর কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একসময় যা কিছু অস্তিত্বহীন ছিল, কালের নিয়মেই তা রূপ পরিগ্রহ করেছে; আবার নির্দিষ্ট সময় শেষে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু এই মহাজাগতিক ক্ষণস্থায়িত্বের অন্তরালে মানুষের অর্জন, পুণ্য, চরিত্র ও গুণাবলির স্বাভাবিক আয়ু কতটুকু? মানবিক মূল্যবোধ, ভালো কাজ ও বংশীয় মর্যাদারও একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র বা বয়সের সীমা রয়েছে।

ইতিহাস, ধর্ম ও মানব মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেকোনো বংশ, জাতি বা আদর্শের উত্থান-পতনের এই স্বাভাবিক বয়সকাল মূলত চার পুরুষ বা চার প্রজন্মজুড়ে বিস্তৃত।

ইতিহাস যেভাবে নিজের পুনরাবৃত্তি করে

যেকোনো পরিবার, গোত্র বা জাতির উত্থান ও পতনের গতিপথ প্রধানত চার পুরুষের একটি আবর্তনে ঘটে থাকে।

চার নম্বর প্রজন্মে এসে উত্তরসূরিরা দেখতে পায়, তাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাথা স্বর্ণের সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা ধরে নেয় এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত খ্যাতি চিরস্থায়ী।

১. প্রথম পুরুষ: এই পুরুষ সংগ্রামী ও মূল ভিত্তি। বহু সংগ্রাম, সাধনা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এই পুরুষ ভালো গুণাবলি অর্জন করেন, শিক্ষার বিস্তার ঘটান, রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন বা ধর্মকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করান। তাঁরাই বংশের মূল ভিত্তি।

২. দ্বিতীয় পুরুষ: এই পুরুষ অনুসরণকারী। এরা পিতার ত্যাগ, কষ্ট ও সাফল্য স্বচক্ষে দেখে বড় হয়। ফলে তারা পিতার অনুসৃত পথেই হাঁটে। তবে এরা প্রথম পুরুষের মতো ‘ভিত্তি’ নয়, শুধু ‘অনুসরণকারী’। ফলে তাদের হাতে ঐক্যের দেয়ালে প্রথম সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়।

৩. তৃতীয় পুরুষ: এই পুরুষকে বলা যায় শিথিলকারী। পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম এদের কাছে শুধুই শোনা কথা। ফলে তারা কিছু ঐতিহ্য মেনে চলে, আবার সুবিধার খাতিরে কিছু ছেড়ে দেয়। অবক্ষয়ের এই ফাটল দিন দিন আরও চওড়া হতে থাকে।

৪. চতুর্থ পুরুষ: এরা হয় অহংকারী ও পতনমুখী। চার নম্বর প্রজন্মে এসে উত্তরসূরিরা দেখতে পায়, তাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাথা স্বর্ণের সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা ধরে নেয় এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত খ্যাতি চিরস্থায়ী।

ফলে নতুন করে কষ্ট, সততা বা সংগ্রামের কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করে না। কর্মের প্রেরণা হারিয়ে যখন তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে, তখনই তাদের সেই অজেয় দুর্গ ধসে পড়ে এবং ক্ষমতা ও গৌরব স্থানান্তরিত হয় অন্য কোনো যোগ্য ও পরিশ্রমী গোত্রের কাছে। (মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, যে সত্যের মৃত্যু নেই, পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮৭)

ইসলামের দৃষ্টিতে চার পুরুষের ধারণা

ইসলামি শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসেও চার পুরুষের এই আয়ুষ্কালের সমর্থন মেলে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনল ও ভালো কাজ করল, তারা যা কিছু ভোগ করল তার জন্য জবাবদিহি হবে না। কারণ, তারা ইমান এনেছে, ভালো কাজ করেছে ও পবিত্র জীবন অনুসরণ করেছে। আবার ইমান এনে পবিত্র জীবন যাপন করেছে ও পরোপকার করেছে। মহান আল্লাহ কল্যাণকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৯৩)

সর্বোত্তম যুগ আমার যুগ। তারপর আমার সাহাবিদের যুগ। তারপর তাবেয়িদের যুগ।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫১

এখানে ইমান ও সৎ কাজের মাধ্যমে প্রথম স্তর শুরু করে পরবর্তী তিনটি স্তরের উল্লেখের মাধ্যমে চার স্তরের রূপান্তরকে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে।

নবী ইউসুফের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বংশানুক্রমিক চার পুরুষের সীমা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘সম্মানিত ব্যক্তি, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান; তিনি হলেন ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯০)

পারস্যের বাদশাহ নওশেরোওয়ার সঙ্গে নোমানের ঐতিহাসিক কথোপকথনেও এর দেখা মেলে। আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র কোনটি—বাদশাহর এমন প্রশ্নের জবাবে নোমান বলেছিলেন, যে বংশে টানা তিন বা চার পুরুষ ধরে যোগ্য নেতা জন্মায়, তারাই আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ গোত্র।

এ কথা শুনে নওশেরোওয়া সেই খানদানের প্রতিনিধি হোজাইফা ইবনে বুদাইল ফিরাসিকে ডেকে মর্যাদার সনদ প্রদান করেন। (ইবনে আবদ রাব্বিহ আল-আন্দালুসি, আল-ইকদ আল-ফারিদ, ১/২৭৪-২৭৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৮৪)

চার খলিফার যুগ এবং মহানবীর (সা.) বিখ্যাত হাদিসেও এর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘সর্বোত্তম যুগ আমার যুগ। তারপর আমার সাহাবিদের যুগ। তারপর তাবেয়িদের যুগ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫১)

এখানে তিনি তিনটি যুগের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু চতুর্থ যুগের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি; কারণ ইতিহাস বলে, চতুর্থ যুগ থেকেই পতনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হতো সামাজিক মূল্যবোধ ও শুরার (পরামর্শের) প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে। কিন্তু কালক্রমে সেই শক্তি কেন্দ্রচ্যুত হয়; সমাজব্যবস্থার স্থান দখল করে ব্যক্তিতন্ত্র, আর খেলাফত রূপান্তরিত হয় রাজতন্ত্রে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে উত্তরণের পথ

মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে তার গুণাবলিও বিদায় নেয়। কিন্তু একটি সমাজ বা জাতি বহুকাল বাঁচে। তার সঙ্গে তার চারিত্রিক প্রাণশক্তিও অব্যাহত থাকে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হতো সামাজিক মূল্যবোধ ও শুরার (পরামর্শের) প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে। কিন্তু কালক্রমে সেই শক্তি কেন্দ্রচ্যুত হয়; সমাজব্যবস্থার স্থান দখল করে ব্যক্তিতন্ত্র, আর খেলাফত রূপান্তরিত হয় রাজতন্ত্রে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার এই অভ্যন্তরীণ ব্যাধি একটা সময় পুরো সমাজকে অবসন্ন করে ফেলেছে, যা কোরআনের এই সতর্কবাণীর বাস্তব রূপ, ‘জল ও স্থলে যা কিছু দুর্যোগ ও বিপর্যয় দেখা দেয়, তা মানুষ স্বহস্তে উপার্জন করে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)

আজকের সমাজে নৈতিকতার সজীবতা কিছুটা কমে গেলেও তার আসল ভিত্তি বা কাঠামো এখনো ধ্বংস হয়ে যায়নি। ব্যক্তিনির্ভরতার বদলে সামাজিক ভিত্তি মজবুত করা এবং সঠিক আদর্শিক পদ্ধতি গ্রহণ করাই হতে পারে এই ক্ষয়িষ্ণু জাতিকে আবার নতুন প্রাণস্পন্দনে জাগিয়ে তোলার শ্রেষ্ঠ উপায়।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর