প্রবাদ আছে, ‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ কথাটি যেমন সত্য, তেমনি এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোথায় ও কীভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিচ্ছি, তার ওপর। ইসলামি ঐতিহ্যে মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও শিক্ষাকেন্দ্র।
কিন্তু বর্তমান সময়ের একটি বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের মসজিদগুলো কি কিশোর ও তরুণদের জন্য যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ? তারা কি মসজিদে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, নাকি সেখানে কেবল বড়দের ‘গম্ভীর শাসন’ আর ‘চুপচাপ থাকার’ নির্দেশ তাদের নিরুৎসাহিত করছে?
যদি আমরা সত্যিই চাই যে আমাদের সন্তানেরা আদর্শ মুসলিম হিসেবে বড় হোক, তবে মসজিদগুলোকে তাদের জন্য একটি আনন্দময় ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য।
কিশোর বয়সের ধর্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিকতা কেবল কিতাবি আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই বয়সে তারা এমন একটি পরিবেশ খোঁজে, যেখানে তাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি আছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ‘আসহাবে কাহাফ’ বা গুহাবাসীদের উদাহরণ দিয়েছেন, যারা ছিল একদল নির্ভীক তরুণ। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তারা ছিল কয়েকজন তরুণ, যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ইমান এনেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৩)
শিক্ষকেরা যেমন শিক্ষার্থীদের মনের খবর রাখেন, মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্যদেরও তেমনই হওয়া উচিত। তাঁরা যেন কিশোরদের কাছে কেবল ‘শাসক’ নন, বরং ‘সহজ বন্ধু’ হিসেবে আবির্ভূত হন।
এই আয়াত স্পষ্ট করে, তরুণদের হৃদয়ে যখন বিশ্বাসের বীজ রোপণ করা হয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্য ও শক্তি আসে।
মসজিদকে কিশোরবান্ধব করার প্রথম ধাপ হলো তাদের বুঝতে চেষ্টা করা। অনেক সময় মসজিদের বয়োজ্যেষ্ঠরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মগ্ন থাকেন এবং তরুণদের উপস্থিতি এড়িয়ে চলেন। অথচ তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, তাদের আগ্রহের জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ছুটির দিনের স্কুলগুলোতে শিক্ষকেরা যেমন শিক্ষার্থীদের মনের খবর রাখেন, মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্যদেরও তেমনই হওয়া উচিত। তাঁরা যেন কিশোরদের কাছে কেবল ‘শাসক’ নন, বরং ‘সহজ বন্ধু’ হিসেবে আবির্ভূত হন।
কিশোরদের জন্য মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় হলো জুমার নামাজ। ১১-১২ বছরের একজন কিশোরের কাছে জুমা মানে হলো অনেক মানুষের সমাগম, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং নিজেকে একটি বৃহত্তর সমাজের অংশ মনে করা। এই অনুভূতি তাদের মধ্যে একধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও আত্মমর্যাদা তৈরি করে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) যুবকদের এই আধ্যাত্মিক সংযোগের গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, কেয়ামতের কঠিন দিনে যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে, তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো ‘সেই যুবক, যার হৃদয় মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
এই সংযোগ তৈরির জন্য কেবল ইবাদত নয়, বরং মসজিদের নানা সামাজিক আয়োজনে তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। যেমন মসজিদের কমিউনিটি প্রোগ্রামে তরুণদের ভলান্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। যখন তারা নিজের হাতে সেবা দেবে, তখন মসজিদের প্রতি তাদের নিজস্ববোধ তৈরি হবে।
মসজিদ যদি কেবল প্রার্থনার স্থানে পরিণত হয় এবং সামাজিক কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তরুণ প্রজন্ম সেখানে আর নিজেদের খুঁজে পায় না।
একটি মসজিদকে কিশোরবান্ধব করতে হলে প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সব মসজিদের আর্থিক সামর্থ্য সমান না হলেও ছোট ছোট কিছু পদক্ষেপ অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কেয়ামতের কঠিন দিনে যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে, তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো ‘সেই যুবক, যার হৃদয় মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে’।সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০
১. খেলার মাঠ: ছোট শিশুদের জন্য মসজিদে একটি ছোট খেলার জায়গা বা প্লে-গ্রাউন্ড থাকা অত্যন্ত কার্যকর। এটি একবারের বিনিয়োগ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। সাত-আট বছরের শিশু যখন মসজিদে গিয়ে খেলার সুযোগ পায়, তখন মসজিদের প্রতি তার একধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়।
২. বিনোদন ও শরীরচর্চা: অনেক কিশোর সাঁতার কাটতে বা ফুটবল-ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ যদি মাঝেমধ্যে স্থানীয় কোনো পুল বা মাঠ ভাড়া করে তরুণদের জন্য বিশেষ খেলার আয়োজন করে, তবে মসজিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর হয়। রাসুল (সা.) স্বয়ং তরুণদের কুস্তি ও ঘোড়দৌড়ের মতো শারীরিক কসরতে উৎসাহিত করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৭৫)
বিশেষ করে তরুণীদের জন্য ইসলামসম্মত উপায়ে ক্রীড়া বা বিনোদনমূলক ইভেন্টের ব্যবস্থা করা আধুনিক সময়ের বড় দাবি।
৩. শুধু জুমার দিনে নয়: আজকের দিনের কিশোর-তরুণেরা পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে অনেক ব্যস্ত থাকে। তাই মসজিদের কার্যক্রম কেবল জুমার দিনে সীমাবদ্ধ না রেখে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। তাদের স্কুলের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছোট ছোট সেশন বা কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে।
মসজিদকে কিশোরবান্ধব করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মনস্তাত্ত্বিক। অনেক সময় মসজিদের বড়রা মনে করেন, শিশুরা মসজিদে এলে পরিবেশ নষ্ট হয় বা হইচই করে নামাজের বিঘ্ন ঘটে। অথচ রাসুল (সা.)-এর সুন্নত ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
একবার এক ছোট শিশু রাসুলের পিঠে চড়ে বসেছিল, যখন তিনি সেজদায় ছিলেন এবং তিনি দীর্ঘ সময় সেজদা দীর্ঘায়িত করেছিলেন, যেন শিশুটি বিরক্ত না হয়। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১১৪১)
শিশুদের প্রতি এই যে অসীম ধৈর্য ও মমতা, এটাই মসজিদকে তাদের কাছে প্রিয় করে তোলার মূলমন্ত্র।
মসজিদ কেবল বড়দের জন্য নয়, এটি সবার জন্য। শিশুদের দুষ্টুমি, কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর তরুণদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিই একটি মসজিদকে প্রকৃত অর্থে জীবন্ত করে তোলে।
আরেকটি সমস্যা হলো বাজেট ও জনবল। অনেক মসজিদের ফান্ড কেবল ভবন রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয়, তরুণদের জন্য কোনো আলাদা বাজেট থাকে না। এই ক্ষেত্রে কমিউনিটির বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।
আবার যদি পরিচালনা কমিটির কাছে সময় না থাকে, তবে তরুণদের কাজগুলো ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক তৈরির মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহ.) উল্লেখ করেছেন, যুবকদের আলস্য থেকে বাঁচাতে হলে তাদের গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখা ওয়াজিব। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/১২০, দারুল ওয়াফা, জেদ্দা, ২০০৫)
যখন একটি কিশোর দেখবে যে তার মসজিদের ইমাম সাহেব তার নাম জানেন, তার পড়াশোনার খোঁজ নেন এবং তাকে মসজিদে কোনো একটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে।
এই গুরুত্ববোধ তাকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করবে। আজকের কিশোরেরা যখন মসজিদে ভালোবাসার সঙ্গে বেড়ে উঠবে, তারাই আগামী দিনে মসজিদের যোগ্য নেতৃত্ব দেবে।
মসজিদ কেবল বড়দের জন্য নয়, এটি সবার জন্য। শিশুদের দুষ্টুমি, কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর তরুণদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিই একটি মসজিদকে প্রকৃত অর্থে জীবন্ত করে তোলে। আমরা যদি তাদের আজ মসজিদের দরজা থেকে ফিরিয়ে দিই, তবে কাল হয়তো তারা আর কোনো দিনই এই চৌকাঠে পা রাখবে না।