অনেকে দাবি করেন, ইসলাম নারীকে পুরুষের অধীনস্থ বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করেছে।
কিন্তু ইসলামের মৌলিক উৎস—পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলাম নারীকে পুরুষের ‘অনুগামী’ নয় বরং ‘পরিপূরক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর যে মর্যাদা ইসলাম দিয়েছে, তা সমকালীন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এক অনন্য বিপ্লব।
যারা ইসলামকে নারী অধিকার হরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, তাদের জন্য ঐতিহাসিক উইল ডুরান্টের দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন (সভ্যতার ইতিহাস) বইটি একটি বড় জবাব হতে পারে।
তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামপূর্ব আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় নারী ছিল বিক্রয়যোগ্য পণ্য বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্থাবর সম্পত্তির মতো। অনেক আরব গোত্রে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নৃশংস প্রথা চালু ছিল। অনেক ধর্মে নারীকে শয়তানের দোসর বা আজন্ম পাপী হিসেবেও দেখা হতো।
কোরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কন্যাসন্তান জন্মের সংবাদ শুনে মা-বাবার চেহারা কালো হয়ে যাওয়া বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসলাম এসে জাহেলি যুগের এই অন্ধকার প্রথাগুলোকে সমূলে উৎপাটন করেছে। কোরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কন্যাসন্তান জন্মের সংবাদ শুনে মা-বাবার চেহারা কালো হয়ে যাওয়া বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৮)
নারীকে পণ্য হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করার পথ বন্ধ করে দিয়ে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “যারা ইমান এনেছ, তোমাদের জন্য বৈধ নয় যে তোমরা জোরপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবে।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯)
এছাড়া ইসলাম পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষায় বিবাহযোগ্য ও হারাম সম্পর্কের সীমারেখা টেনে দিয়ে নারীকে অবমাননার হাত থেকে রক্ষা করেছে।
বাইবেলীয় বা ইহুদি-খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে অনেক সময় দাবি করা হয়, বিবি হাওয়ার প্ররোচনাতেই নবী আদম (আ.) জান্নাত থেকে বিচ্যুত হন। এই ধারণাটি নারীকে ‘পাপের উৎস’ হিসেবে দেখার একটি মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু কোরআেনর বর্ণনাভঙ্গী বলছে যে এটি নারীর প্রতি একটি অপবাদ। সুরা তোয়াহা-এর ১১৭ থেকে ১২১ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শয়তান আদমকে প্ররোচনা দিয়েছে বলে আদমই তাঁর প্রতিপালকের আদেশ পালনে বিচ্যুত হয়েছেন।
কোরআন অনুযায়ী, এই ভুলের দায়ভার আদমের একক অথবা তাঁদের উভয়ের ছিল; কোনোভাবেই কেবল হাওয়ার নয়।
কোরআনের ভাষায় নারী ও পুরুষ উভয়ই একই উৎসের অধিকারী, “হে মানবজাতি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি (নফস) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১)
আধুনিক সভ্যতা আজও অনেক ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারেনি। অনেক উন্নত দেশেও ব্যাংকের চেক নগদায়নের জন্য স্বামীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।
কোরআনের বহু আয়াতে নারী ও পুরুষকে সমানভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। সুরা আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—এভাবে সমান্তরালভাবে ১০টি গুণের উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং পরকালের বিচারও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের আমলের ভিত্তিতে করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১৯৫)
আধুনিক সভ্যতা আজও অনেক ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারেনি। অনেক উন্নত দেশেও ব্যাংকের চেক নগদায়নের জন্য স্বামীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।
কিন্তু ইসলাম নারীকে পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে। একজন মুসলিম নারীর সম্পত্তিতে একক অধিকার আছে এবং তিনি নিজ নামে ব্যবসা বা সম্পদ পরিচালনা করতে পারেন।
ইসলামে নারীর অবস্থান কোনোভাবেই পুরুষের নিচে নয়। যারা ‘পুরুষতন্ত্রের’ দোহাই দিয়ে ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তারা আসলে ইসলামের প্রকৃত ভাষ্য পাঠ করেননি।
ইসলাম নারীকে যে সম্মান, নিরাপত্তা এবং স্বতন্ত্র সত্তা দিয়েছে, তা অনেক আগেই স্বীকৃত হয়েছে। নারী পুরুষের অনুগামী নয়, বরং তারা একে অপরের বন্ধু ও সহযোগী—এই শাশ্বত সত্যই ইসলামের মূল শিক্ষা।