একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার এই একটামাত্র ক্লিকে আসলে একসঙ্গে চারটি আলাদা পাপ ঘটে যায়
একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার এই একটামাত্র ক্লিকে আসলে একসঙ্গে চারটি আলাদা পাপ ঘটে যায়

জীবনে ইসলাম

স্ক্রিনশট সংস্কৃতি: এক ক্লিকে চার পাপ

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের বাক্‌স্বাধীনতার অবারিত সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এই একই সুযোগ জন্ম দিয়েছে এক ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির, যাকে বলা যায় ‘স্ক্রিনশট সংস্কৃতি’।

কারও ব্যক্তিগত চ্যাটের কথোপকথন, বহু বছর আগের কোনো ভুল মন্তব্য, বা অসতর্ক মুহূর্তের কোনো বার্তার ছবি তুলে অনলাইনে ভাইরাল করে দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

মজার বিষয় হলো, একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার এই একটামাত্র ক্লিকে আসলে একসঙ্গে চারটি আলাদা পাপ ঘটে যায়। কোরআন-হাদিসে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। ৪টি স্তর ভেঙে ভেঙে দেখানো হলো।

কারও সঙ্গে সামান্য দ্বিমত হলেই তার পুরোনো গোপন মেসেজ ফাঁস করে দেওয়ার প্রবণতা—এই মোনাফেকি বৈশিষ্ট্যেরই হুবহু ডিজিটাল রূপ।

১. গোপনীয়তা লঙ্ঘন: অপরাধের শুরু

স্ক্রিনশট সংস্কৃতি শুরু হয় আসলে স্ক্রিনশট নেওয়ার অনেক আগে থেকে। পুরোনো চ্যাট ঘেঁটে দেখা, কারও অতীতের ভুল খুঁজে বের করার চেষ্টা থেকে।

এই ‘গোয়েন্দাগিরি’ নিয়ে কোরআনের নির্দেশ স্পষ্ট, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের গোপন অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

লক্ষণীয়, এই আয়াতে গোপন অনুসন্ধান আর গিবত দুটিকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। কারণ, একটা ছাড়া আরেকটা ঘটে না। কেউ আগে খুঁজে বের করে, তারপর প্রচার করে।

স্ক্রিনশট সংস্কৃতিতে এই দুটি ধাপই আছে, শুধু মাধ্যম বদলেছে—চোখ-কান দিয়ে গোয়েন্দাগিরির জায়গায় এসেছে স্ক্রল করে পুরোনো মেসেজ খোঁজা।

২. বিশ্বাসের খেয়ানত

দুজন মানুষ যখন পারস্পরিক আস্থায় কোনো কথা বলে, সেই কথোপকথন একটি আমানত।

রাসুল (সা.) এই নীতি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলে অতঃপর এদিক-ওদিক তাকায় (অর্থাৎ গোপন রাখার ইঙ্গিত দেয়), তবে সেই কথা একটি আমানত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৬৮)

লক্ষণীয়, এই হাদিসে শর্ত হিসেবে সুস্পষ্ট মৌখিক প্রতিশ্রুতিও চাওয়া হয়নি, বরং বলা হয়ছে যে শুধু ইঙ্গিতই যথেষ্ট। কারণ, ব্যক্তিগত পরিসরে কথা বলার মধ্যেই আস্থার ইঙ্গিত নিহিত থাকে।

কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে (বা দেখে), তা-ই যাচাই না করে বর্ণনা করে বেড়ায়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫

আর আমানতের খেয়ানত মোনাফেকির অন্যতম প্রধান চিহ্ন। মহানবী (সা.) বলেছেন, মোনাফেকের বৈশিষ্ট্য হলো, কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, আমানতের খেয়ানত করে, আর বিবাদে অশালীন আচরণ করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪)

কারও সঙ্গে সামান্য দ্বিমত হলেই তার পুরোনো গোপন মেসেজ ফাঁস করে দেওয়ার প্রবণতা—এই মোনাফেকি বৈশিষ্ট্যেরই হুবহু ডিজিটাল রূপ।

৩. দোষ প্রচার: পুরস্কারের বদলে শাস্তি

মানুষমাত্রই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলাম এখানে দুটো বিপরীতমুখী পথ দেখিয়ে দিয়েছে—একদিকে বিশাল পুরস্কার, অন্যদিকে ভয়াবহ শাস্তি।

পুরস্কারের ঘোষণা হলো, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ–তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

আর শাস্তির সতর্কবার্তা হলো, ‘হে সেই সকল লোক, যারা মুখে ইমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ইমান প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের গিবত করো না এবং তাদের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করো না। কেননা যে ব্যক্তি তাদের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করবেন। আর আল্লাহ যার গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করবেন, তাকে তার ঘরের অভ্যন্তরে হলেও লাঞ্ছিত করবেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৮০)

অর্থাৎ একই কাজের দুটি সম্ভাব্য ফলাফল—গোপন রাখলে আল্লাহর সুরক্ষা, প্রচার করলে আল্লাহর কাছ থেকে একই আচরণ ফিরে আসা। স্ক্রিনশট শেয়ার করা মানে সরাসরি দ্বিতীয় পথটা বেছে নেওয়া।

৪. যাচাই ছাড়া শেয়ার: অপবাদের অংশীদারত্ব

আজকাল একটি স্ক্রিনশট আসামাত্র মানুষ সত্যতা যাচাই না করেই লাইক-কমেন্ট-শেয়ারে ভাসিয়ে দেয়। এডিটিং বা ফেক চ্যাট জেনারেটরের যুগে এই স্ক্রিনশট আসল নাকি বানানো, তা যাচাই না করেই ছড়িয়ে দেওয়া সরাসরি অপবাদ বা ‘ইফক’-এর শামিল।

কোরআন বলে, ‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ও কুৎসা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।’ (সুরা নুর, আয়াত: ১৯)

একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার সিদ্ধান্তে আসলে চারটে পৃথক নৈতিক ব্যর্থতা ঘটে যায়—গোপনীয়তা ভাঙা, আস্থার আমানত নষ্ট করা, দোষ গোপন করার বদলে প্রচার করা, আর যাচাই ছাড়া তা ছড়িয়ে দেওয়া।

এখানে একটা সাধারণ ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। অনেকে ভাবেন, ‘আমি তো শুধু শেয়ার করেছি, মূল অপরাধ তো অন্য কেউ করেছে।’ কিন্তু নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে (বা দেখে), তা-ই যাচাই না করে বর্ণনা করে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)

অর্থাৎ যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তেই আপনি মিথ্যাবাদীর কাতারে চলে যান, স্রষ্টার বানানো হোক বা না হোক।

চারটি কাজ একসঙ্গে রাখলে দেখা যায়, একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার সিদ্ধান্তে আসলে চারটে পৃথক নৈতিক ব্যর্থতা ঘটে যায়—গোপনীয়তা ভাঙা, আস্থার আমানত নষ্ট করা, দোষ গোপন করার বদলে প্রচার করা, আর যাচাই ছাড়া তা ছড়িয়ে দেওয়া।

এর প্রতিটির জন্য পরকালীন হিসাব আলাদা, কিন্তু ঘটনা ঘটে একই মুহূর্তে, একটাই ক্লিকে। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী হাততালি বা ট্রলিংয়ের আনন্দের বিনিময়ে আমরা যেন নিজের আমলনামা এভাবে নষ্ট করে না ফেলি।