নবীজির পারিবারিক জীবন, বিশেষ করে তাঁর ঘরসংসার ও আয়েশা (রা.)–এর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো ছিল অতুলনীয় সরলতা, সংযম ও আত্মিক প্রাচুর্যে ভরপুর।
বাহ্যিক জৌলুস বা আরাম-আয়েশ সেখানে কোনো গুরুত্ব পায়নি; বরং সেই ঘরগুলো হয়ে উঠেছিল তাওহিদ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য পাঠশালা। এই জীবনের প্রতিটি দৃশ্য আমাদের সামনে নবীজির আদর্শ মানবিকতা ও আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
নবিপত্নীদের জন্য কোনো আলিশান প্রাসাদ নির্মিত হয়নি। বনু নাজ্জার এলাকায়, মসজিদে নববির আশপাশে ছোট ছোট কয়েকটি কামরা ছিল তাঁদের বসবাসের স্থান। এসব কামরার একটি ছিল হজরত আয়েশার।
ঘরটির আয়তন ছিল মাত্র ছয়–সাত হাত। দেয়াল মাটির তৈরি, ছাদ খেজুরগাছের ডাল দিয়ে বানানো, এতটাই নিচু যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যেত।
সেই ঘরটির দরজা খুললেই যেন মসজিদে নববি—মসজিদটাই হয়ে উঠেছিল ঘরের বারান্দার মতো।
নবীজি (সা.) যখন মসজিদে ইতিকাফ করতেন, তখন অনেক সময় মাথা বাড়িয়ে দিলে আয়েশা (রা.) তা আঁচড়ে দিতেন। আবার মসজিদে অবস্থানকালে নবীজির কোনো প্রয়োজন হলে ঘর থেকেই তা পৌঁছে দেওয়া হতো। ঘর ও মসজিদের এই নিবিড় সংযোগ নবীজির জীবনে ইবাদত ও পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত করে। (খুলাসাতুল ওয়াফা, ৪র্থ পরিচ্ছেদ )
ঘরটির আয়তন ছিল মাত্র ছয়–সাত হাত। দেয়াল মাটির তৈরি, ছাদ খেজুরগাছের ডাল দিয়ে বানানো, এতটাই নিচু যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যেত। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ওপর দিক থেকে কম্বলজাতীয় কাপড় দেওয়া থাকত। দরজাটি ছিল কাঠের এক পাল্লার, যা জীবনে কখনোই তালাবদ্ধ করা হয়নি। (আদাবুল মুফরাদ ১/২৭২ )
প্রয়োজন হলে কেবল পর্দা নামানো হতো, কাজ শেষে আবার তা উঠিয়ে দেওয়া হতো। এই খোলা দরজা যেন ছিল নবীজির উন্মুক্ত হৃদয়ের প্রতীক—যেখানে সংকীর্ণতা নেই, অহংকার নেই, আছে কেবল মানবতার আহ্বান।
নবীজির ঘরের আসবাবপত্র ছিল অত্যন্ত সীমিত। একটি খাট, একটি চাটাই, খেজুরের ছালভরা একটি চামড়ার বালিশ, পানি রাখার একটি মশক, খেজুর ও পানির একটি পাত্র এবং পানি পান করার জন্য একটি পেয়ালা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯১৩)
আলো জ্বালানোর জন্য কোনো বাহ্যিক বাতি ছিল না। তবু আয়েশা (রা.) বলতেন, সে ঘরগুলো ছিল আধ্যাত্মিক নূরে পরিপূর্ণ। তার বর্ণনায় জানা যায়, এমন চল্লিশ রাতও কেটে যেত, যখন নবীজির ঘরে কোনো আগুন বা বাতি জ্বলত না। তবু সে অন্ধকারে ছিল না কোনো শূন্যতা; ছিল আল্লাহর স্মরণ, দোয়া ও ইবাদতের আলো।
কখনো কখনো এমন মাস পার হয়ে যেত, যখন ঘরে রুটি বানানো বা ডেগভর্তি কিছু রান্নার সুযোগই হতো না। আবার এমন মাসও যেত, যখন কোনো ঘর থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত না।সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৪২৩
নবীজির পারিবারিক জীবনে সময় বণ্টন ছিল ন্যায় ও ভারসাম্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। প্রথম দিকে যখন তাঁর স্ত্রী ছিলেন কেবল সাওদা ও আয়েশা, তখন এক রাত পর পর আয়েশার কাছে থাকতেন। পরে অন্যান্য স্ত্রীদের সঙ্গে বিবাহ হলে সবার জন্য একদিন করে নির্ধারিত থাকত।
তবে আয়েশার ক্ষেত্রে থাকতেন দুইদিন—একদিন তার নিজের অধিকার, আরেক দিন হজরত সাওদা রা.–এর দান করা দিন। এতে আয়েশার প্রতি নবীজির বিশেষ স্নেহ যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি অন্য স্ত্রীর উদারতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার চিত্রও স্পষ্ট হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস :২৫৯৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৬৩)
এই ঘরে সাংসারিক প্রাচুর্য বা ভোগবিলাসের কোনো স্থান ছিল না। নবীজির প্রয়োজন ছিল অল্প, আর সেই অল্পেই ছিল পরিতৃপ্তি। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজির জীবদ্দশায় এমন কোনো সময় আসেনি, যখন একাধারে তিন দিন তাদের পরিবার রুটি ও তরকারি খেয়ে তৃপ্ত হতে পেরেছে।
কখনো কখনো এমন মাস পার হয়ে যেত, যখন ঘরে রুটি বানানো বা ডেগভর্তি কিছু রান্নার সুযোগই হতো না। আবার এমন মাসও যেত, যখন কোনো ঘর থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যেত না—শুধু খেজুর ও পানি খেয়েই দিন কাটত তাদের। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৪২৩, সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৪৩২ )
এই দারিদ্র্য ছিল অনিচ্ছাকৃত নয়; বরং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা ও আখিরাতমুখী জীবনের স্বেচ্ছা গ্রহণ। অনেক সময় নবীজি (সা.) বাইরে থেকে ফিরে এসে আয়েশা রা.–কে জিজ্ঞেস করতেন, ‘খাওয়ার মতো কিছু আছে?’ তিনি বলতেন, ‘না, কিছুই নেই।’
তখন নবীজি (সা.) বলতেন, ‘তাহলে আমি আজ রোজার নিয়ত করলাম।’ এই দৃশ্য আমাদের শেখায়, অভাবকে অভিযোগ নয়, বরং ইবাদতের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষা।
তবে কখনো কখনো আল্লাহ তাদের জন্য রিজিকের দ্বারও খুলে দিতেন। প্রতিবেশী আনসার সাহাবিরা মাঝে মাঝে দুধ পাঠাতেন। সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন সময় হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন, বিশেষত যেদিন নবীজি (সা.) আয়েশার ঘরে থাকতেন।
একবার জব পিষে রুটির জন্য টুকরো করে রেখে দিয়েছিলেন; কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশীর একটি ছাগল এসে কয়েকটি টুকরো নিয়ে চলে যায়।
তারা জানতেন, নবীজি (সা.) আয়েশাকে কতটা ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা ছিল পবিত্র, মানবিক ও দায়িত্বশীল—যেখানে আবেগের সঙ্গে ন্যায় ও আদর্শের পূর্ণ সামঞ্জস্য ছিল।
হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইলম ও ফিকহে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি তাকে পরিণত করেছিল উম্মাহর অন্যতম বড় আলিমায়। তবু তিনি ছিলেন মানুষ—শিশুসুলভ কিছু উদাসীনতা ও সাধারণ ভুল থেকে মুক্ত ছিলেন না।
অল্প বয়সী বালিকা হওয়ায় অনেক সময় আটার খামির বানিয়ে ঘুমিয়ে যেতেন, আর ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলত। একবার জব পিষে রুটির জন্য টুকরো করে রেখে দিয়েছিলেন; কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশীর একটি ছাগল এসে কয়েকটি টুকরো নিয়ে চলে যায়। এসব ঘটনা তাঁর মানবিক সরলতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরে।
অন্যান্য স্ত্রীদের মতো রান্নার কাজে তার হাত খুব পাকা ছিল না। কিন্তু এই অপূর্ণতাই তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির করে। তিনি কোনো আদর্শিক কল্পচরিত্র নন; বরং বাস্তব জীবনের আনন্দ-বেদনা, ভুল-ত্রুটি ও শেখার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন উম্মুল মুমিনিন—মুমিনদের মা।
আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক