পবিত্র কোরআনের অবতরণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছরে। এই সময়কালকে ইসলামের ইতিহাসের দুই প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: হিজরতের আগের সময় (মক্কি পর্যায়) এবং হিজরতের পরের সময় (মাদানি পর্যায়)।
মুসলিম উম্মাহর আত্মিক গঠন ও সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আল্লাহ–তাআলা এই দুই পর্যায়ে কোরআন নাজিল করেছেন।
কোরআন মাজিদের সুরাগুলোর এই শ্রেণিবিন্যাস কেবল ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে না; বরং আয়াতের সঠিক মর্মার্থ ও বিধান (শরিয়ত) বোঝার জন্য এটি অপরিহার্য।
মক্কি জীবনের (হিজরতের পূর্ববর্তী ১৩ বছর) মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস সংশোধন করা। মক্কার মুশরিকদের মূর্তিপূজা থেকে সরিয়ে একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানানোই ছিল এ সময়ের প্রধান সুর।
প্রধান বিষয়বস্তু: তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ), রিসালাত (নবুয়ত), পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম এবং নৈতিক চরিত্র গঠন।
রাসুলের ভূমিকা: এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী।
সুরার সংখ্যা: ইমাম জারাকাশির মতে ৮৫টি সুরা মক্কি। অন্যদের মতে ৮৬টি।
বৈশিষ্ট্য: আয়াতগুলো সাধারণত ছোট, ছন্দময় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। এতে পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনি ও অবাধ্য জাতিদের ধ্বংসের ইতিহাস বেশি বর্ণিত হয়েছে।
মদিনায় (হিজরতের পরবর্তী ১০ বছর) হিজরতের পর মুসলিমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও সুসংগঠিত সমাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে এ সময়ের নাজিলকৃত আয়াতগুলোতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান প্রাধান্য পায়।
চারটি প্রধান শ্রেণি: মদিনার আয়াতগুলোতে ৪টি দলকে সম্বোধন করা হয়েছে—মুহাজিরিন, আনসার, মোনাফেক (যারা মুখে ইসলাম স্বীকার করলেও অন্তরে কুফরি পুষে রাখত) এবং আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিষ্টান)।
প্রধান বিষয়বস্তু: ইবাদত, মুয়ামালাত (লেনদেন), বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার আইন, দণ্ডবিধি (হুদুদ) এবং জিহাদ।
সুরার সংখ্যা: ইমাম জারাকাশির মতে ২৯টি, অন্যদের মতে ২৮টি সুরা মাদানি।
বৈশিষ্ট্য: আয়াত ও সুরাগুলো সাধারণত দীর্ঘ। এতে আইনি পরিভাষা ও বিস্তারিত সামাজিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
পণ্ডিতগণ অভ্যন্তরীণ প্রমাণের ভিত্তিতে মক্কি ও মাদানি সুরার মধ্যে পার্থক্য করার কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন:
কোরআনের কোন আয়াত আগে এবং কোনটি পরে নাজিল হয়েছে তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কিছু বিশেষ কারণ হলো:
বিধানের বিবর্তন: যেমন মদ বা শরাব নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কয়েক ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমিক নাজিলের ইতিহাস না জানলে চূড়ান্ত বিধান কোনটি তা বোঝা কঠিন হতো।
নাসেখ-মানসুখ: যদি দুটি আয়াতের আইনি বিধানে ভিন্নতা দেখা দেয়, তবে কালানুক্রমিক জ্ঞানের মাধ্যমে জানা যায় যে পরবর্তী আয়াতটি আগের বিধানকে রহিত (মানসুখ) করেছে।
দাওয়াতের পদ্ধতি: অমুসলিম পরিবেশে কীভাবে ইসলাম প্রচার করতে হয়, তা মক্কি আয়াত থেকে এবং মুসলিম সমাজ পরিচালনায় মাদানি আয়াত থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।
মক্কি ও মাদানি সুরার জ্ঞান কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, এটি ‘উলুমুল কোরআন’ বা কোরআন বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।