
সাহারা মরুভূমির দেশ মৌরিতানিয়া। আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউ আর বালিয়াড়ির এই দেশে রমজান আসে একেবারেই অন্যরকম এক রূপ নিয়ে। এখানকার মানুষেরা বিশ্বাস করেন, রমজান কেবল আত্মশুদ্ধি নয়, বরং প্রকৃতির মাঝে আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম।
তাই তাদের রীতিনীতিতে এমন কিছু বৈচিত্র্য পাওয়া যায়, যা বিশ্বের আর কোথাও মেলা ভার।
মৌরিতানিয়ার রমজান সংস্কৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত ও প্রচলিত দিক হলো—রমজানের শুরুতে চুল কাটা। দেশটির পুরুষ ও শিশুরা রমজান আসার ঠিক আগে বা প্রথম দিনেই মাথা কামিয়ে ফেলেন। তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, পবিত্র রমজান মাসে মাথায় যে নতুন চুল গজাবে, তা সারা বছরের জন্য বিশেষ বরকত বা কল্যাণ বয়ে আনবে।
এই বিশ্বাসের কারণে রমজানের প্রথম দিনে মৌরিতানিয়ার সেলুনগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মায়েরা বাড়ির বাচ্চাদের এই ‘রমজান হেয়ারকাট‘ দিতে ব্যস্ত থাকেন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এক দৃঢ় সামাজিক ঐতিহ্য।
মৌরিতানিয়ার রাজধানী নুয়াকশটের অলিগলিতে রমজানে সারি সারি তাবু বা খিমা দেখা যায়। এগুলোকে বলা হয় ‘মুয়াইদুর রহমান’ বা আল্লাহর মেহমানদের দস্তরখান। শহরের প্রধান প্রধান চত্বর, হাসপাতালের সামনে এবং মসজিদের পাশে কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবী তরুণ এই ক্যাম্পগুলো পরিচালনা করেন।
এখানে কেবল দরিদ্ররাই আসেন, তা নয়, বরং রাস্তার পাশে ফল বিক্রেতা থেকে শুরু করে দূরের মুসাফির—সবাই মিলে এক কাতারে বসে ইফতার করেন। নুয়াকশটের মাদ্রিদ স্কয়ারে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই খিমাগুলো পরম আশ্রয়ের মতো।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এসব ফ্রি ইফতার ক্যাম্প সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তি।
মৌরিতানিয়ার রমজানে এক অবিশ্বাস্য মানবিক ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। গুয়ান্তানামো বে-র সাবেক বন্দি মৌরিতানিয়ান নাগরিক মোহাম্মদৌ ওলাদ সালাহি এবং তাকে পাহারাদানকারী আমেরিকান রক্ষী স্টিভ উড। সালাহি যখন দীর্ঘ ১৫ বছর পর মুক্তি পেয়ে মৌরিতানিয়ায় ফেরেন, তিনি তার সাবেক কারারক্ষীকে নিজ দেশে আমন্ত্রণ জানান।
তারা দুজন মিলে মরুভূমির বালিয়াড়ির ওপর বসে একত্রে ইফতার করেন এবং সাহারার বিখ্যাত গ্রিন টি পান করেন। সালাহির এই ক্ষমাশীলতা এবং ইফতারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই মৈত্রী মৌরিতানিয়ার উদার সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মৌরিতানিয়ার ইফতার আয়োজনে আড়ম্বর কম থাকলেও পুষ্টিগুণে তা অনন্য। তাদের দস্তরখানে যা থাকে:
জারেহ: এটি বার্লি বা যব দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিশেষ পোরিজ বা জাউ। দিনভর তৃষ্ণার পর শরীরকে শক্তি দিতে এটি তাদের প্রধান পছন্দ।
মৌরিতানিয়ান তাজিন: মাংস এবং বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি এই তরকারিটি ইফতারের মূল খাবারের অংশ।
দুধ ও খেজুর: মরুভূমির দেশ হওয়ায় খেজুর ও টাটকা উটের দুধ দিয়ে ইফতার শুরু করা তাদের সুন্নাহ ও ঐতিহ্য।
মিষ্টি ও ফল: ইফতারে মৌসুমি ফল এবং তিল দিয়ে তৈরি বিশেষ মিষ্টি বেশ জনপ্রিয়।
বর্তমানে মৌরিতানিয়ায় দ্রব্যমূল্যের বাজারে বেশ অস্থিরতা বিরাজ করছে। মরক্কো থেকে আমদানিকৃত টমেটো ও সবজির ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের কারণে বাজারে শাকসবজির দাম আকাশচুম্বী। এমন কঠিন সময়েও সাধারণ মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ কমেনি।
বিত্তশালী পরিবারগুলো তাদের নিজেদের খাবার থেকে দুই-তিনজনের অতিরিক্ত অংশ আলাদা করে মসজিদে পাঠিয়ে দেয়, যেন কোনো রোজাদার অভুক্ত না থাকে। এমনকি ছোট শিশুদের হাত দিয়ে এই খাবার পাঠানো হয়, যাতে শৈশব থেকেই তারা পরোপকারের শিক্ষা পায়।
সূত্র: আল–জাজিরা ডটনেট