পাথেয়

জিজ্ঞাসা: দর্শন বনাম কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব কারণ তার মধ্যে রয়েছে চিন্তা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা। শৈশব থেকেই মানুষ ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এই দুই শব্দের মাধ্যমে জগতকে চিনতে শুরু করে। জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ‘জিজ্ঞাসা’ বা ‘প্রশ্ন’ করার গুরুত্ব অপরিসীম।

তবে গতানুগতিক দার্শনিক প্রশ্ন এবং পবিত্র কোরআনের উপস্থাপিত প্রশ্নের মধ্যে এক মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। দার্শনিক প্রশ্ন অনেক সময় কেবল প্রশ্নের খাতিরেই করা হয়, কিন্তু কোরআনের প্রশ্ন মানুষকে এক গভীর জীবনবোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার দিকে নিয়ে যায়।

দর্শনে প্রশ্নের সীমাবদ্ধতা

পাশ্চাত্য বা প্রথাগত দর্শনের মূল ভিত্তি হলো প্রশ্ন করা। দার্শনিকরা মনে করেন, দর্শনে উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন মূলত অস্তিত্ব, জ্ঞান ও মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের ‘বিমূর্ত বুদ্ধি’ বা কেবল যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করে। এতে দুটি বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়:

১. ফলহীন জিজ্ঞাসা: অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিকরা প্রশ্ন তুলেই ক্ষান্ত হন, উত্তরের সন্ধানে বা তা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরের ব্যাপারে তারা উদাসীন থাকেন।

২. অভিজাত্য: প্রথাগত দার্শনিক প্রশ্নগুলো কেবল উচ্চশিক্ষিত বা বিশেষ শ্রেণির মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক খোরাক যোগায়। সাধারণ মানুষের জীবন ও চেতনার সঙ্গে এর সংযোগ থাকে খুব সামান্য। (ত্বহা আবদুর রহমান, আল-আমালুদ দীনি ওয়া তাজদিদুল আকল, পৃষ্ঠা: ১৫৩, আল-মারকাজু সাকাফি আল-আরাবি, ক্যাসাব্লাঙ্কা, ২০০৫)

আপনি যা জিজ্ঞাসা করছেন, সেই জিজ্ঞাসার ফলাফল ও উত্তরের প্রতি আপনাকে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
ত্বহা আবদুর রহমান

কোরআনি প্রশ্নের গভীরতা ও ব্যাপকতা

কোরআনের প্রশ্ন করার পদ্ধতি প্রচলিত দর্শনের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও অর্থবহ। কোরআন কেবল যুক্তি বা বুদ্ধিকে স্পর্শ করে না, বরং মানুষের রুহ, আবেগ, অনুভূতি এবং বিবেককে জাগ্রত করে।

কোরআনের প্রশ্ন কেবল ‘তত্ত্ব’ প্রদানের জন্য নয়, বরং ‘সত্য’ উপলব্ধি ও ‘কর্মে’র সঙ্গে যুক্ত। একে মরক্কোর বিখ্যাত দার্শনিক ড. ত্বহা আবদুর রহমান ‘সওয়াল মাসউল’ বা ‘দায়বদ্ধ প্রশ্ন’ বলে অভিহিত করেছেন।

অর্থাৎ, আপনি যা জিজ্ঞাসা করছেন, সেই জিজ্ঞাসার ফলাফল ও উত্তরের প্রতি আপনাকে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। (ত্বহা আবদুর রহমান, আল-হাক্কুল আরাবি ফিল ইখতিলাফিল ফালসাফি, পৃষ্ঠা: ১৫, আল-মারকাজু সাকাফি আল-আরাবি, ক্যাসাব্লাঙ্কা, ২০০৬)

কোরআন আমাদের শেখায় সত্যে পৌঁছানোর জন্য প্রশ্ন করতে, অন্ধ অনুকরণ পরিহার করতে এবং নিজের বিবেককে খাটাতে। এমনকি তৎকালীন কাফেরদের মিথ্যা অপবাদের জবাব দিতেও কোরআন তাদের যুক্তি প্রয়োগ ও চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছে।

যেমন, ‘বলুন, আমি তোমাদের একটি বিষয়ে নসিহত করছি: তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দুই-দুই জন বা এক-এক জন করে দাঁড়িয়ে যাও, তারপর চিন্তা করো—তোমাদের এই সঙ্গীর (মুহাম্মদ) মধ্যে কোনো উম্মাদনা নেই।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ৪৬)

অস্তিত্বের মূলে আঘাতকারী প্রশ্নসমূহ

সুরা তুর-এর একটি অংশে আল্লাহ–তাআলা একের পর এক কতগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, যা মানুষের অহংবোধ ও জড়বাদী চিন্তার মূলে আঘাত করে। যেমন, ‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই (শূন্য থেকে) সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? নাকি তারা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে না।’ (সুরা তূর, আয়াত: ৩৫-৩৬)

এই প্রশ্নগুলো কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যায়াম নয়; এগুলো মানুষকে তার অস্তিত্বের উৎস এবং জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এই প্রশ্নের ধারাগুলো কখনো বিস্ময়সূচক, কখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে, আবার কখনো মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ইসলাম প্রশ্নকে ‘উদ্ভট কল্পনা’ বা ‘তামাশা’ থেকে বের করে এনে এক সুনির্দিষ্ট গন্তব্যমুখী ও বাস্তববাদী করতে চেয়েছে।

প্রশ্ন বনাম দায়িত্বশীলতা

ইসলামে সব ধরনের প্রশ্নকে উৎসাহিত করা হয়নি। এমন অনেক প্রশ্ন আছে যা কেবল সময় নষ্ট করে এবং মানুষকে সংশয়ে ফেলে দেয়। একে বলা হয় ‘ব্যর্থ প্রশ্ন’ বা অবান্তর জিজ্ঞাসা। কোরআন সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক করেছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা এমন সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের কাছে প্রকাশিত হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০১)

এর অর্থ এই নয় যে ইসলাম চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। বরং ইসলাম প্রশ্নকে ‘উদ্ভট কল্পনা’ বা ‘তামাশা’ থেকে বের করে এনে এক সুনির্দিষ্ট গন্তব্যমুখী ও বাস্তববাদী করতে চেয়েছে। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে প্রশ্নের লক্ষ্য হলো:

  • বিভ্রান্তি দূর করে সত্যের আলোকপাত করা।

  • অদৃশ্য জগতের (গায়েব) প্রতি ইমানকে যুক্তিনির্ভর করা।

  • মানুষের আদি স্বভাব বা ফিতরতকে জাগিয়ে তোলা।

  • প্রশ্নের উত্তর অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

শেষ কথা

কোরআনি প্রশ্নের ভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, আমরা কেবল প্রশ্ন তোলার জন্যই প্রশ্ন করব না, বরং সত্যকে চেনা এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার জন্য প্রশ্ন করব। দার্শনিক প্রশ্নের পরিধি যেখানে কেবল মানুষের মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ, কোরআনের প্রশ্ন সেখানে মানুষের হৃদয় ও আত্মা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এটি মানুষকে জনতার চাপ, ক্ষমতার দাপট কিংবা ভ্রান্ত প্রথা থেকে মুক্ত করে একক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সামনে দাঁড় করায়।

সুতরাং, বর্তমানের এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ও যুক্তির যুগে আমাদের উচিত কোরআন নির্দেশিত এই ‘দায়বদ্ধ জিজ্ঞাসা’র পথ অনুসরণ করা, যা কেবল আমাদের চিন্তাকেই তীক্ষ্ণ করবে না, বরং আমাদের চরিত্রকেও উন্নত করবে।