ইতিহাসের পাতায় ১৯ রমজান। একদিকে এই দিনে আন্দালুসের (স্পেন) বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়, তেমনি কয়েক শতাব্দী পর একই দিনে পতনের ঘণ্টা বাজে।
এটি কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়, বরং এটি বড় বড় সাম্রাজ্যের পরিবর্তন এবং আধুনিক মুসলিম বিশ্বের কয়েকজন মহান সংস্কারকের বিদায়েরও দিন।
৯২ হিজরির ১৯ রমজান (৭১১ খ্রিষ্টাব্দ) এই দিনে মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ তাঁর বার্বার ও আরব যোদ্ধাদের নিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে (স্পেন) প্রবেশ করেন। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৪/১৮০, ১৯৮৭)
এই প্রাথমিক বিজয়ই পরবর্তী ‘ওয়াদিল লাক্কা’র চূড়ান্ত যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে দেয়, যা ভিসিগথদের হারিয়ে স্পেনে ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে।
আন্দালুস ছিল ইউরোপের অন্ধকার যুগে মুসলিমদের পক্ষ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক উপহার। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/১৩০, ১৯৮৮)
২০২ হিজরির ১৯ রমজান (৮১৮ খ্রিষ্টাব্দ) কর্ডোভায় (কুরতুবা) আমির হাকাম ইবনে হিশামের শাসনের বিরুদ্ধে জনবিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা ‘ওয়াকয়াতুর রাবাদ’ বা রাবাদ বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
কর্ডোভার দক্ষিণ প্রান্তের সাধারণ কারিগর ও ফকিহরা অতিরিক্ত কর ও শাসনের কঠোরতার বিরুদ্ধে এই দিনে বিদ্রোহ করেন। আমির হাকাম নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং ১৫ হাজার পরিবারকে দেশছাড়া করেন।
এই নির্বাসিত পরিবারগুলোর একটি দল মরক্কোর ফেজ শহরে গিয়ে ‘আন্দালুসীয় মহল্লা’ তৈরি করে এবং অন্য একটি দল মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে।
পরে তারাই ক্রিট দ্বীপ জয় করে সেখানে ১৩৫ বছরের এক স্বাধীন ইমারত প্রতিষ্ঠা করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/২১০, ১৯৮৭)
স্পেন জয়ের প্রায় ৮০০ বছর পর, ৮৯৭ হিজরির ১৯ রমজান (১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দ) আন্দালুসের শেষ দুর্গ গ্রানাডার পতনের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। টানা আট মাসের অবরোধ ও দুর্ভিক্ষের পর সুলতান আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ (বোয়াবদিল) রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানি ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
গ্রানাডা ত্যাগের সময় পাহাড়ের চূড়া থেকে সুলতান যখন শেষবারের মতো আল-হাম্বরা প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন, তখন তাঁর মা আয়েশা আল-হুররা বলেন, “আজ নারীর মতো কাঁদো সেই রাজ্যের জন্য, যাকে পুরুষের মতো রক্ষা করতে পারোনি।”
৭৮৪ হিজরির ১৯ রমজান (১৩৮২ খ্রিষ্টাব্দ) মিসরের ক্ষমতায় বড় পরিবর্তন ঘটে। তুর্কি বংশোদ্ভূত মামলুকদের (বাহরি মামলুক) হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় সার্কাসীয় বংশোদ্ভূত বা ‘বুরজি’ মামলুকদের হাতে।
এই দিনে সুলতান জহির বারকুক মিশরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/৩২০, ১৯৮৮)
তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজনীতিক, যিনি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন করে মিসরে ‘দ্বিতীয় মামলুক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৩৮৩ হিজরির ১৯ রমজান (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) বিদায় নেন আজহারের বিখ্যাত শেখ ইমাম মাহমুদ শালতুত। তিনি ছিলেন আধুনিক আজহারের স্বপ্নদ্রষ্টা।
তাঁর প্রচেষ্টাতেই আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা ও প্রকৌশলের মতো বিজ্ঞান অনুষদগুলো যুক্ত হয়, যা ইসলামি শিক্ষার সামগ্রিকতা ফিরিয়ে আনে।
আবার ১৪১০ হিজরির এই দিনে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ) ইন্তেকাল করেন মিসরের মুফতি শেখ হাসানাইন মাখলুফ। তিনি ছিলেন ‘স্বাধীন ফতোয়া’র প্রতীক। রাজা ফারুকের অন্যায্য হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তিনি মুফতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।
তাঁর লেখা কালিমাতুল কুরআন গ্রন্থটি আজও প্রতিটি মুসলিম ঘরে কোরআনের সহজ অনুবাদের জন্য সমাদৃত।