পাথেয়

ভ্রমণ যখন ইবাদত হয়

সফর বা ভ্রমণকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়—নিষিদ্ধ সফর, প্রশংসনীয় সফর এবং সাধারণ বা বৈধ সফর।

প্রথমত, নিষিদ্ধ সফর: যে ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য থাকে কোনো পাপে লিপ্ত হওয়া, তা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেমন—পিতামাতার অসন্তোষে সফর করা, কোনো অনৈতিক কাজে অংশ নিতে যাওয়া কিংবা মহামারীতে আক্রান্ত এলাকা থেকে পালানো। 

মহামারী ছড়িয়ে পড়া এলাকায় যাতায়াত সম্পর্কে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ার খবর শুনবে, তখন সেখানে প্রবেশ কোরো না; আর যদি তোমরা এমন কোনো এলাকায় অবস্থান করো যেখানে মহামারী দেখা দিয়েছে, তবে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭২৮)

সংক্রমণের দিকে লক্ষ রেখে নবীজি এমন নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়ত, প্রশংসনীয় সফর : যেসব সফর পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনে, তা প্রশংসনীয়। এর মধ্যে কিছু সফর ফরজ, যেমন—সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য হজের উদ্দেশ্যে সফর করা কিংবা ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞান অর্জনের জন্য পথচলা।

অতীত যুগে একটি মাত্র হাদিস যাচাই করার জন্য অনুরাগী শিক্ষার্থীরা হাজার মাইল পথ সফর করতেন। খাতিব আল-বাগদাদি আর-রিহলাহ ফি তলাবিল হাদিস নামে হাদিস সংগ্রহের সফর পৃথক ইতিহাস সংকলন করেছেন। 

এছাড়া বায়তুল মুকাদ্দাস, মসজিদে নববী ও মসজিদে হারামে ইবাদতের উদ্দেশ্যে সফর করা কিংবা আলেমদের থেকে নৈতিক শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করাও প্রশংসনীয় সফরের অন্তর্ভুক্ত।

অতীত যুগে একটি মাত্র হাদিস যাচাই করার জন্য অনুরাগী শিক্ষার্থীরা হাজার মাইল পথ সফর করতেন। খাতিব আল-বাগদাদি আর-রিহলাহ ফি তলাবিল হাদিস নামে হাদিস সংগ্রহের সফর পৃথক ইতিহাস সংকলন করেছেন। 

তৃতীয়ত, বৈধ সফর: জীবিকা নির্বাহ, হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা মানসিক প্রশান্তির উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা মূলত বৈধ কাজ। তবে নিয়তের সততার মাধ্যমে এই বৈধ ভ্রমণও ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে।

কেউ যদি সৎ নিয়তে পরিবারকে হালাল উপায়ে প্রফুল্ল রাখার জন্য কিংবা ইবাদত ও কর্মক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে ফেরার উদ্দেশ্যে অবকাশ যাপনে যায়, তবে সেটির জন্যও সওয়াব রয়েছে।

ইবনে তাইমিয়া উল্লেখ করেছেন, “মানুষ যখন কোনো বৃক্ষ, ঘোড়া বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে পার্থিব প্রতিপত্তি বা অহংকারের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন তা গর্হিত। কিন্তু যদি কেউ ধর্মের ক্ষতি না করে কেবল মানসিক প্রফুল্লতার জন্য ফুল বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে, তবে এটি এমন এক বৈধ বিনোদন যা সত্য ও ভালো কাজের ওপর টিকে থাকতে মানুষকে সাহায্য করে।” (ইবনে তাইমিয়া, মুখতাসারুল ফাতাওয়া আল-মিশরিয়্যা, পৃষ্ঠা: ২১, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১৯৮০)

তবে উদ্দেশ্যহীন ও সময় অপচয়কারী অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনকে ফকিহগণ অপছন্দ করেছেন।

ইমাম আহমাদ ইবনে হানবাল (রহ.) লিখেছেন, উদ্দেশ্যহীন পর্যটন ইসলামের চেতনা নয়; বরং সফর হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা গ্রহণ বা সৎ মানুষের সান্নিধ্য লাভের জন্য। (ইবন মুফলিহ আল-মাকদিসি, আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ, ১/৪৩১, আলমুল কুতুব, রিয়াদ, সৌদি আরব, ১৯৯৯)

এমনকি এক ব্যক্তি যখন নবীজির কাছে পর্যটনের অনুমতি চেয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, “আমার উম্মতের পর্যটন হলো আল্লাহর পথে চেষ্টা ও সংগ্রাম করা।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৮৬)

সফর হলো কষ্টের একটি অংশ। এটি তোমাদের ঘুম, আহার ও পানীয় গ্রহণে বাধা দেয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন সফরের উদ্দেশ্য পূরণ করে ফেলবে, সে যেন দ্রুত নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০৪

সফরের সুন্নাহ পদ্ধতি

ভ্রমণ শুরুর আগে একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের নিয়ত ও আমলকে পরিচ্ছন্ন করা।

  • আল্লাহর ওপর ভরসা: যেকোনো সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারার নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা সুন্নাত। মহানবী (সা.) গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬৬)

  • ঋণ পরিশোধ: দূরে সফরে বের হওয়ার আগে অতীতের ভুলত্রুটির জন্য তওবা করা, অন্যের পাওনা বা ঋণ পরিশোধ করা, আমানত ফিরিয়ে দেওয়া এবং সফরের জন্য অর্জিত অর্থ যেন সম্পূর্ণ হালাল হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি।

  • পরিবারের সম্মতি: পিতামাতা ও স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করে তাদের অনুমতি নিয়ে সফরে বের হওয়া উচিত। নারী যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার স্বার্থে মাহরামের উপস্থিতি জরুরি।

এছাড়া সফরে সৎসঙ্গী নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অলস ও পাপাচারী সঙ্গীর বদলে এমন সঙ্গী বেছে নেওয়া উচিত, যারা বিপদে সাহায্য করবে এবং ইবাদতের কথা মনে করিয়ে দেবে।

সফরসঙ্গীর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মহানবী (সা.) একাকী সফর করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “একজন একাকী আরোহী একটি শয়তান, দুজন আরোহী দুটি শয়তান, আর তিনজন হলে তারা একটি কাফেলা বা সঠিক যাত্রীদল।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৭)

যাত্রাপথের আদব ও দোয়া

ভ্রমণকালে যাত্রাপথের প্রতিটি পদক্ষেপে জিকির ও দোয়া উচ্চারণ করার মাধ্যমে সফরের কষ্ট কমে আসে এবং আসমানি নিরাপত্তা লাভ করা যায়।

  • গৃহ ত্যাগের দোয়া: বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” পাঠ করলে শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত থাকা যায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪২৬)

  • যানবাহনে আরোহণের দোয়া: যানবাহনে উঠে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সুরা জুখরুফের ১৩-১৪ নম্বর আয়াত পড়া সুন্নাত। যার অর্থ, “পবিত্র সেই সত্তা যিনি এগুলো (যানবাহন) আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা এদের বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না; আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪২)

  • উঁচু-নিচু পথে জিকির: পথচলায় যখন যানবাহন কোনো পাহাড় বা উঁচু স্থানে উঠবে তখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলা এবং নিচে নামার সময় ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সুন্নাত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৯৩)

  • দিন ও সময় নির্বাচন: মহানবী (সা.) সাধারণত বৃহস্পতিবার সকালে সফর শুরু করতে পছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৪৯)

    তিনি উম্মতের ভোরের কাজে বরকতের দোয়া করে বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য ভোরের সময়ে বরকত দান করুন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)

  • নেতা নির্ধারণ: তিনজন বা তার বেশি মানুষ একসাথে সফরে বের হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একজনকে কাফেলা প্রধান বানিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন নবীজি। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৮)

  • অবস্থান নেওয়ার আদব: সফরে কোথাও যাত্রাবিরতি বা রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় রাস্তার ঠিক মাঝখানে তাবু খাটাতে বা ঘুমাতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ রাস্তা হলো বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও পশুর চলাচলের পথ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯২৮)

    আর যেকোনো নতুন স্থানে নামার সময় “আউজু বি কালিমাতিল্লাহিত তামমাতি মিন শাররি মা খালাক” পাঠ করলে স্থান ত্যাগ করা পর্যন্ত কোনো কিছু ক্ষতি করতে পারে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৮)

দীর্ঘ সফর শেষে রাতের আঁধারে না জানিয়ে হঠাৎ করে ঘরে প্রবেশ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, যাতে পরিবারের সদস্যরা পরিচ্ছন্ন হওয়া ও অভ্যর্থনা জানানোর সুযোগ পায়।

ঘরে ফেরা ও পরিবারের অধিকার

সফরের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেলে অনর্থক বিলম্ব না করে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরে আসা সুন্নত। সফর মানুষের জীবনের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটায়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “সফর হলো কষ্টের একটি অংশ। এটি তোমাদের ঘুম, আহার ও পানীয় গ্রহণে বাধা দেয়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন সফরের উদ্দেশ্য পূরণ করে ফেলবে, সে যেন দ্রুত নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০৪)

দীর্ঘ সফর শেষে রাতের আঁধারে না জানিয়ে হঠাৎ করে ঘরে প্রবেশ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, যাতে পরিবারের সদস্যরা পরিচ্ছন্ন হওয়া ও অভ্যর্থনা জানানোর সুযোগ পায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০১)

এছাড়া সফর শেষে সাধ্য অনুযায়ী পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য কিছু উপহার বা খাবার বয়ে আনা একটি সুন্দর সুন্নাত, যা পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।