এক.
ইসলামের ইতিহাসে কঠিনতম একটি যুদ্ধের নাম তাবুক যুদ্ধ। প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ পথ, খাদ্য ও বাহনের সংকট মিলিয়ে এটি ছিল সাহাবিদের ইমান ও ত্যাগের বাস্তব পরীক্ষা। এই অভিযানে অধিকাংশ সাহাবি অংশগ্রহণ করলেও তিনজন সত্যনিষ্ঠ সাহাবি অনুপস্থিত থেকে যান। তাঁরা হলেন কাব ইবনে মালিক, মুরারা ইবনে রাবি ও হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.)।
কাব ইবনে মালিক (রা.) নিজেই এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাবুক অভিযানের সময় তার কোনো অভাব ছিল না। আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে তিনি বেশি সচ্ছল ছিলেন তখন। তবুও আজ যাবো, কাল যাবো করতে করতে দেরি করে ফেলেন। একসময় দেখলেন, রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা যুদ্ধের জন্য রওনা হয়ে গেছেন।
শিক্ষা: সৎকাজে বিলম্ব করা অনুচিত। এতে অনেক সময় পুরো কাজটিই বিনষ্ট হয়ে যায়। কেবল ভালো কাজের ইচ্ছা থাকলেই হয় না, দ্রুত এটাকে কাজে রূপ দিতে হয়।
দুই.
অন্য দুই সাহাবিও একইভাবে পিছিয়ে পড়েন। তারা কেউই মুনাফেক ছিলেন না। ছিলেন প্রকৃত ইমানদার ও সৎ মানুষ। তবু মানুষের জীবনে কখনো কখনো দুর্বলতা এসেই যায়। প্রকৃত ইমানদারও ভুল করতে পারে, তবে তাঁর আসল পরিচয় হলো ভুলের ওপর স্থির না থাকা এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
তারা কোনো অজুহাত দেননি, বরং সত্য স্বীকার করেন। কাব ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি বুঝেছিলাম, মিথ্যা বলে সাময়িক মুক্তি পেতে পারি, কিন্তু আল্লাহর কাছে এর কী জবাব দেব?’
তাবুক থেকে ফিরে নবীজি (সা.) মদিনায় পৌঁছালে মোনাফিকরা এসে একে একে মিথ্যা অজুহাত পেশ করতে থাকে। এতে তারা বাহ্যিকভাবে রেহাই পেয়ে যায়। কিন্তু এই তিন সাহাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন।
তারা কোনো অজুহাত দেননি, বরং সত্য স্বীকার করেন। কাব ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি বুঝেছিলাম, মিথ্যা বলে সাময়িক মুক্তি পেতে পারি, কিন্তু আল্লাহর কাছে এর কী জবাব দেব?’
শিক্ষা: সত্য কখনো কখনো সাময়িক কষ্টের কারণ হলেও শেষ পর্যন্ত এটিই মুক্তির একমাত্র পথ।
তিন.
রাসুল (সা.) সব সত্য শুনেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের ক্ষমা করেননি। বরং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করার আদেশ দেন। সাহাবিদের সবাই তাঁদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন সামাজিক ও মানসিক পরীক্ষা।
শিক্ষা: সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কখনো কঠোর সিদ্ধান্তেরও প্রয়োজন হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত কল্যাণই বয়ে আনে।
অবশেষে ৫০ দিন পর আল্লাহ–তাআলা তাদের তওবা কবুল করেন। কোরআনের সুরা তওবার ১১৮ নম্বর আয়াতে তাদের ক্ষমার ঘোষণা আসে।
চার.
এই বয়কট চলে টানা ৫০ দিন। কাব ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘সেসময় পৃথিবী এত বিশাল হওয়া সত্ত্বেও আমার কাছে তা সংকীর্ণ মনে হচ্ছিল।’ তাদের জীবনে নেমে আসে গভীর অনুশোচনা, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর দিকে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মনোভাব। হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) ছিলেন বৃদ্ধ। তিনি অধিকাংশ সময় কেঁদে কেঁদে কাটাতেন।
শিক্ষা: গুনাহের পর প্রকৃত অনুশোচনা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে করে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী।
পাঁচ.
এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর কাছে শাম দেশের এক খ্রিষ্টান রাজা চিঠি পাঠায়, এতে তাকে মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেই চিঠি পুড়িয়ে ফেলেন।
শিক্ষা: মুমিনরা বিপদের সময়ও নিজের ইমানের ওপর অটল থাকে, এ বিষয়ে কারো সঙ্গে আপস করে না।
ছয়.
অবশেষে ৫০ দিন পর আল্লাহ–তাআলা তাদের তওবা কবুল করেন। কোরআনের সুরা তওবার ১১৮ নম্বর আয়াতে তাদের ক্ষমার ঘোষণা আসে। রাসুল (সা.) সাহাবিদের মাধ্যমে এই সুসংবাদ তাদের নিকট পৌঁছে দেন। কাব ইবনে মালিক (রা.) আনন্দে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। পুরো মদিনা আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে।
শিক্ষা: আল্লাহর রহমত দেরিতে আসতে পারে, তবে তা যে সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতিতে আসবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪১৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৭৩)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা