মানুষ প্রায়ই বড় পাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করলেও ছোট পাপকে তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করে। মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা, অন্যায় দৃষ্টি, কিংবা মনে মনে চর্চা করা সামান্য গিবত।
মনে হয়, এসব তো কবিরা গুনাহ নয়, তাহলে ক্ষতি কী? অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে ছোট পাপকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যে অণু পরিমাণও মন্দ কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত: ৮)
মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা, অন্যায় দৃষ্টি, কিংবা মনে মনে চর্চা করা সামান্য গিবত। মনে হয়, এসব তো কবিরা গুনাহ নয়, তাহলে ক্ষতি কী?
আমরা প্রায়ই বড় পাপ নিয়ে সতর্ক থাকি, কিন্তু ছোট পাপকে তুচ্ছ মনে করে উপেক্ষা করি। অথচ রাসুল (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে গেছেন যে ছোট পাপ জমতে জমতে মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, ‘তোমরা ছোট ছোট পাপ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, এগুলো মানুষের মধ্যে একত্র হতে থাকে, শেষ পর্যন্ত তাকে ধ্বংস করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৮১৮)
পাপের প্রভাব শুধু আখিরাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তা দুনিয়ার জীবনেও বান্দার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমনকি তার রিজিকের ওপরও। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানুষ স্বীয় পাপ কাজের কারণে তার প্রাপ্য রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০২২)
নিশ্চয় মুমিন তার পাপকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং আশঙ্কা করছে যে তা তার ওপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী তার পাপকে এমন একটি মাছির মতো দেখে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে উড়ে গেল।আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮
পাপের প্রভাব সরাসরি অন্তরের ওপর পড়ে। প্রতিটি পাপ অন্তরে একধরনের ছাপ ফেলে যায়, যা তওবা না করলে ধীরে ধীরে অন্তরকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘বান্দা যখন একটি পাপ করে, তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে। অতঃপর যখন সে পাপের কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তওবা করে, তার অন্তর তখন দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)
দুনিয়ায় যাকে আমরা ‘সামান্য’ বলে এড়িয়ে যাই, আখেরাতে সেটিও হিসাবের বাইরে থাকবে না। পাপী ব্যক্তিরা সেদিন নিজেদের আমলনামা হাতে নিয়ে বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! এ কেমন কিতাব, তা তো ছোট–বড় কোনো কিছুই বাদ দেয় না; বরং তা সবকিছুর হিসাব রেখেছে।’ (সুরা আল–কাহফ, ১৮:৪৯)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, কেয়ামতের দিন কোনো আমলই, তা যত ছোটই হোক না কেন আল্লাহর হিসাব থেকে বাদ পড়বে না।
পাপের ‘ছোট’ বা ‘বড়’ হওয়া কেবল কাজের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে না; বরং তার সঙ্গে বান্দার মনোভাব ও অভ্যাসও জড়িত। ইবনে আব্বাস (রা.) এই সূক্ষ্ম বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘ক্ষমাপ্রার্থনার সঙ্গে কোনো পাপই “বড়” থাকে না, আর বারংবার করার সঙ্গে কোনো পাপই “ছোট” থাকে না।’ (তাবারি, তাফসিরে তাবারি, ৬/৬৫১, দারে হাজার, কায়রো, ২০০১)
তাই ছোট থেকে ছোট পাপকেও অবহেলা ও তুচ্ছজ্ঞান না করা। মুমিন ও পাপাচারীর মধ্যে পার্থক্য এখানেই ফুটে ওঠে; পাপকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘নিশ্চয় মুমিন তার পাপকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং আশঙ্কা করছে যে তা তার ওপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী ব্যক্তি তার পাপকে এমন একটি মাছির মতো দেখে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে উড়ে গেল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮)
ছোট পাপকে অবহেলা করার প্রবণতা মানুষকে ধীরে ধীরে বড় পাপের দিকে ঠেলে দেয় এবং অন্তরের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেয়।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এই তত্ত্বকে আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘পাপকে ছোট মনে করাটাই আসলে বিপজ্জনক। বান্দা নিজের কাছে যে পাপকে যত বড় মনে করে, আল্লাহর কাছে তা তত ছোট হয়ে যায়; আর যে পাপকে সে তুচ্ছ মনে করে, তা আল্লাহর কাছে তত বড় হয়ে ওঠে। কারণ, পাপকে বড় মনে করলে তার প্রতি ঘৃণা জন্মে, ফলে তার প্রভাব অন্তরে প্রবলভাবে পড়ে না; আর পাপকে তুচ্ছ মনে করা তার সঙ্গে অভ্যস্ততা থেকে তৈরি হয়, আর এটিই অন্তরে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে।’ (ইমাম গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৭/১১০, দারুল মিনহাজ, জেদ্দা, ২০১১)
এভাবেই ছোট পাপকে অবহেলা করার প্রবণতা মানুষকে ধীরে ধীরে বড় পাপের দিকে ঠেলে দেয় এবং অন্তরের সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেয়।
সুতরাং একজন মুমিনের করণীয় হলো, সব ধরনের পাপ থেকেই বেঁচে থাকা। পাপ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক তওবা করে নেওয়া।
সৈয়দ আবিদুল হক : মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম, নরসিংদী