দীর্ঘদিন রোজা রাখার পর ইফতারের টেবিলে বসে আমাদের অনেকেরই সাধারণ এক অভিজ্ঞতা হলো—পেট ভারী হয়ে যাওয়া বা পেট ফাঁপা। অনেক সময় অস্বস্তি এতটাই বেড়ে যায় যে, ইবাদতে মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সুন্নাহ সম্মত কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন করলেই এই অস্বস্তি এড়ানো সম্ভব।
সারাদিন রোজা রাখার ফলে আমাদের পাকস্থলী খালি থাকে এবং পরিপাকতন্ত্র বিশ্রামে থাকে। হঠাৎ করে সেখানে বিপুল পরিমাণ খাবার জমা হলে তা প্রক্রিয়াজাত করতে শরীর হিমশিম খায়। অস্বস্তির প্রধান কারণগুলো হলো:
দ্রুত খাবার খাওয়া: তাড়াহুড়ো করে খেলে খাবারের সাথে প্রচুর বাতাস পাকস্থলীতে প্রবেশ করে, যা পেট ফাঁপার উদ্রেক করে।
চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার: অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার হজম হতে অনেক সময় নেয়, ফলে পাকস্থলী দীর্ঘক্ষণ ভারী বোধ হয়।
মিষ্টি ও কোমল পানীয়: চিনিযুক্ত শরবত বা কার্বোনেটেড পানীয় পেটে গ্যাস তৈরি করে।
একবারে অতিরিক্ত পানি পান: ইফতারের শুরুতেই গাদা গাদা পানি পান করলে পাকস্থলী হঠাৎ প্রসারিত হয়, যা হজমক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
অপ্রস্তুত ডালজাতীয় খাবার: ছোলা বা ডাল জাতীয় খাবার যদি ভালোভাবে সেদ্ধ না হয় বা অনেকক্ষণ ভিজিয়ে রাখা না হয়, তবে তা গ্যাস তৈরি করতে পারে।
ইফতারের পর ক্লান্তি ও পেট ফাঁপা কমাতে যা করতে পারেন:
১. ইফতার শুরু করুন খেজুর দিয়ে
ইফতারের শুরুতে এক গ্লাস পানি ও একটি খেজুর খান। খেজুর রক্তে শর্করার মাত্রা আলতোভাবে বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘক্ষণ বিশ্রামে থাকা পাকস্থলীকে খাবার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন ইফতার করে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫৫)
২. ইফতারকে কয়েক ধাপে ভাগ করুন
পানি ও খেজুর খাওয়ার পর অন্তত ১০-১৫ মিনিটের একটি বিরতি দিন। এই সময়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিতে পারেন।
এটি পাকস্থলীকে মূল খাবারের (মেইন ডিশ) জন্য ধীরে ধীরে তৈরি করবে। ধীর সুস্থে খাবার খাওয়া সুন্নত।
৩. ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া
খাবার যত বেশি চিবিয়ে খাবেন, হজম তত সহজ হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) খাবার ভালোভাবে চেটে চিবিয়ে খেতে বলেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫০১২)
ভালো করে চিবালে বাতাস কম প্রবেশ করে এবং মস্তিষ্ক তৃপ্তির সংকেত পাঠানোর পর্যাপ্ত সময় পায়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি কমে।
৪. পানির সুষম বণ্টন
ইফতার থেকে সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে অল্প অল্প করে পানি পান করুন। একবারে অনেক পানি পান করা পাকস্থলীর জন্য পীড়াদায়ক। রাসুল (সা.) পানি পান করতে গিয়ে তিনবার শ্বাস নিতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫০৩০)
৫. ভরপেট না–খাওয়া
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “মানুষের ভরা পেটের চেয়ে খারাপ পাত্র আর নেই। আদম সন্তানের কোমর সোজা রাখার জন্য কয়েকটি লোকমাই তো যথেষ্ট; সুতরাং সে যদি তাতে তুষ্ট না হতে পারে, তাহলে (পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে নেবে) এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং অপর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ঠিক করে নেবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
পুষ্টিবিদদের মতে, ইফতার পরবর্তী অস্বস্তি কোনো অনিবার্য বিষয় নয়। সচেতনতা এবং পরিমিতবোধই হলো এর আসল সমাধান। সারাদিন রোজা রাখার অর্থ এই নয় যে, ইফতারের একবেলাতেই সব ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
পাকস্থলীর ধারণক্ষমতা এবং হজমপ্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে পরিমিত খাবার গ্রহণ করলেই রমজানে সুস্থ থাকা সম্ভব।
আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
এই একটি আয়াতের ওপর আমল করলেই আমাদের অধিকাংশ শারীরিক সমস্যা দূর হয়ে যায়।