ইসলামি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও বিস্ময়কর মোজেজাগুলোর মধ্যে ইসরা ও মিরাজ অন্যতম। এটি কেবল একটি অতিপ্রাকৃত ভ্রমণ নয়, বরং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তি জীবনের এক অনন্য উচ্চতা এবং উম্মতের জন্য এক বিশেষ উপহারের মাধ্যম।
পবিত্র কোরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা এবং অসংখ্য সহিহ হাদিসের মাধ্যমে এই ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত।
আরবি ‘ইসরা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো রাতের বেলা ভ্রমণ করা। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহ কর্তৃক তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাতের সামান্য অংশে ভ্রমণ করানোকে ‘ইসরা’ বলা হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই শব্দের মূল ধাতু ব্যবহার করেই ঘোষণা করেছেন, “পরম পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত পরিভ্রমণ করিয়েছেন।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ১)
ভাষাবিদদের মতে, ‘আসা-রা’ ও ‘সারা’ উভয় শব্দই রাতে পথ চলা অর্থে ব্যবহৃত হয়। (মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাউইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, ২/৪০৩, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৯)
ফেরেশতা জিবরাইলকে মহানবী (সা.) প্রকৃত রূপে দুইবার দেখেছিলেন—একবার হেরা গুহা থেকে অবতরণের পর এবং দ্বিতীয়বার মিরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে।
অন্যদিকে ‘মিরাজ’ শব্দের অর্থ হলো সিঁড়ি বা উপরে ওঠার যন্ত্র। এটি ‘উরুজ’ ধাতু থেকে উদ্গত, যার অর্থ উপরে ওঠা বা আরোহণ করা।
পরিভাষায়, জেরুজালেমের পবিত্র ভূমি থেকে সপ্ত আকাশ এবং তারও উর্ধ্বে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত মহানবীর (সা.)-এর ঊর্ধ্বগমনকে ‘মিরাজ’ বলা হয়। এই মিরাজ চলাকালীন মহান আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/৪৬১, দারুত তাইয়িবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
ইসরা বা নৈশ ভ্রমণের বিষয়টি পবিত্র কোরআনের সুরা ইসরা বা সুরা বানি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই ভ্রমণের সত্যতা অকাট্য এবং এর বর্ণনাকারী সাহাবিদের সংখ্যা এত বেশি যে একে ‘মুতাওয়াতির’ বা সন্দেহাতীত পর্যায়ে ধরা হয়।
অপরদিকে মিরাজের বিষয়টিও পবিত্র কোরআনের সুরা নাজমে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে (জিবরাইলকে) আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।” (সুরা নাজম, আয়াত: ১৩-১৪)
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, ফেরেশতা জিবরাইলকে মহানবী (সা.) প্রকৃত রূপে দুইবার দেখেছিলেন—একবার হেরা গুহা থেকে অবতরণের পর এবং দ্বিতীয়বার মিরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরে ইবনে কাসির, ৭/৪৫০, দারুত তাইয়িবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
ইমাম ইবনে কাসির আরো উল্লেখ করেছেন, মিরাজের ঘটনা বহু সংখ্যক সহিহ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত, যা মুসলিম উম্মাহ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেছে। যদি কেবল ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমের বর্ণিত হাদিসগুলোও গ্রহণ করা হয়, তবে তা মিরাজের সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। (ইবনে কাসির, তাফসিরে ইবনে কাসির, ৫/৩৩, দারুত তাইয়িবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
ইসরা ও মিরাজ কি কেবল আত্মিক ভ্রমণ ছিল নাকি সশরীরে? এই প্রশ্নে অধিকাংশ ওলামা এবং পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি আলেমদের ঐকমত্য হলো, ইসরা ও মিরাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে ও সরাত্মায় সংঘটিত হয়েছিল।
পবিত্র কোরআনের সুরা ইসরা-এর শুরুতে ‘আবদিহি’ (তাঁর বান্দাকে) শব্দটি এর বড় প্রমাণ। আরবি ভাষায় ‘আবদ’ বা ‘বান্দা’ শব্দটি আত্মা ও দেহ উভয়ের সমষ্টিকে বোঝায়।
কোরাইশ কাফেররা যদি একে নিছক স্বপ্ন মনে করত, তবে তারা একে অস্বীকার বা উপহাস করার সুযোগ পেত না। কারণ স্বপ্নে মানুষ যেকোনো অবিশ্বাস্য স্থানে যেতেই পারে।
কিছু বর্ণনায় হজরত আয়েশা এবং মুয়াবিয়া (রা.)–এর বরাতে মিরাজকে ‘আত্মিক ভ্রমণ’ বা ‘রূহানি’ বলা হলেও আলেমগণ সেই বর্ণনাগুলোকে সনদের দিক থেকে দুর্বল অথবা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের বলে চিহ্নিত করেছেন।
ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হওয়ার সময় আয়েশার সঙ্গে মহানবীর বিবাহ হলেও বাসর হয়নি; তিনি তখনও অনেক ছোট ছিলেন। এছাড়া ইবনে আব্বাস (রা.) স্পষ্ট বলেছেন, “এটি ছিল চাক্ষুষ দর্শন যা আল্লাহর রাসুলকে দেখানো হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৮৬)।
কোরাইশ কাফেররা যদি একে নিছক স্বপ্ন মনে করত, তবে তারা একে অস্বীকার বা উপহাস করার সুযোগ পেত না। কারণ স্বপ্নে মানুষ যেকোনো অবিশ্বাস্য স্থানে যেতেই পারে। (মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাউইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, ২/৪০৭, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৯)
ইসরা ও মিরাজের সময়কাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একমত, এটি হিজরতের কিছুকাল আগে সংঘটিত হয়েছিল। কেউ বলেছেন হিজরতের এক বছর আগে, কেউ বলেছেন দুই বা তিন বছর আগে।
ইবনে হাজাম এবং ইমাম জুহরি মনে করেন এটি হিজরতের এক বছর আগে রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১০৮, দারু হাজার, কায়রো, ১৯৯৭)
যদিও বর্তমান জনসমাজে রজব মাসের সাতাশ তারিখটি অধিক পরিচিত, কিন্তু গবেষণালব্ধ মত অনুযায়ী রবিউল আউয়াল মাসের ১২ বা ১৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। (মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি দাউইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, ২/৪১২, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৯)
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, সফরের শুরুতে মহানবী (সা.) হাতিমে কাবা বা হিজর-এ শায়িত ছিলেন। এমতাবস্থায় জিবরাইল (আ.) আগমন করেন এবং তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ডটি বের করে জমজমের পানিতে ধৌত করেন। এরপর ইমান ও হেকমতে পূর্ণ একটি স্বর্ণের তশতরির মাধ্যমে তাঁর হৃদয় পূর্ণ করে পুনরায় স্থাপন করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৭)
এরপর তাঁর সামনে গাধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট সাদা রঙের একটি পশু আনা হয়, যার নাম ‘বোরাক’। বোরাকের গতি ছিল বিস্ময়কর; তার প্রতিটি কদম পড়ত দৃষ্টির শেষ সীমানায়। বোরাকে চড়ে তিনি বাইতুল মাকদিসে পৌঁছান এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বগমন বা মিরাজ।
জিবরাইলের সঙ্গে মহানবী (সা.) প্রথম আকাশে পৌঁছলে পাহারাদার ফেরেশতা জিজ্ঞেস করেন, “আপনার সঙ্গে কে?” তিনি উত্তর দেন, “মুহাম্মদ”। ফেরেশতা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “তাঁকে কি ডাকা হয়েছে?” উত্তর ইতিবাচক হলে প্রথম আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)–এর সাক্ষাৎ পান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৮৭)
পর্যায়ক্রমে তিনি দ্বিতীয় আকাশে নবী ইয়াহইয়া ও ইসা, তৃতীয় আকাশে নবী ইউসুফ, চতুর্থ আকাশে নবী ইদরিস, পঞ্চম আকাশে নবী হারুন এবং ষষ্ঠ আকাশে নবী মুসা আলাইহিমুস সালামের দেখা পান। হজরত মুসাকে অতিক্রম করার সময় তিনি কাঁদছিলেন।
যদিও বর্তমান জনসমাজে রজব মাসের সাতাশ তারিখটি অধিক পরিচিত, কিন্তু গবেষণালব্ধ মত অনুযায়ী রবিউল আউয়াল মাসের ১২ বা ১৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।
কান্নার কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তাঁর পরে প্রেরিত একজন নবী (মুহাম্মদ) তাঁর চেয়েও বেশি সংখ্যক অনুসারী নিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবেন। সবশেষে সপ্তম আকাশে মহানবী দেখা পান নবী ইবরাহিম (আ.)–এর, যিনি বাইতুল মামুরে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৮৭)
সপ্ত আকাশ অতিক্রম করার পর নবীজিকে সিদরাতুল মুনতাহা বা আল্লাহর আরশ সীমান্তের কুলবৃক্ষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি বেহেশতের নদীগুলো প্রত্যক্ষ করেন এবং বাইতুল মামুর পরিদর্শন করেন। জিবরাইল (আ.) তাঁর সামনে শরাব ও দুধের দুটি পাত্র পেশ করলে তিনি দুধ বেছে নেন। জিবরাইল বলেন, “আপনি স্বভাবজাত ধর্মকে (ফিতরাত) বেছে নিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯৪)
এই মাহেন্দ্রক্ষণেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। ফেরার পথে হজরত মুসা (আ.)–এর পরামর্শে নবীজি কয়েকবার আল্লাহর কাছে নামাজের সংখ্যা কমানোর আবেদন করেন।
মহান আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে সংখ্যাটি কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন। তবে তিনি ঘোষণা করেন, “আমার এই বিধান অপরিবর্তিত থাকবে; সংখ্যায় পাঁচ ওয়াক্ত হলেও সওয়াবে তা পঞ্চাশ ওয়াক্তেরই সমান হবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৩ এর ব্যাখ্যায়; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৮৭)
ইসরা ও মিরাজ কেবল একটি ভ্রমণের গল্প নয়, বরং এটি তাওহিদ, রেসালাত এবং আখেরাতের এক জীবন্ত নিদর্শন। এই সফরের মাধ্যমে মহানবী (সা.) সৃষ্টি জগতের রহস্য যেমন অবলোকন করেছেন, তেমনি মহান প্রতিপালকের অতি সন্নিকটে যাওয়ার সম্মান লাভ করেছেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে আজও মুমিনরা সেই মিরাজের আধ্যাত্মিক স্বাদ অনুভব করতে পারে। এই অলৌকিক ঘটনা যুগে যুগে ইমানদারদের বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত করে এবং বিজ্ঞান ও যুক্তির ঊর্ধ্বে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।