অর্থনীতি একটি জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি। রাসুল (সা.) এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করত।
বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক সংকটের পটভূমিতে তাঁর প্রদর্শিত নীতিমালা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবীজির গ্রহণ করা ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো—
১. পরনির্ভরশীলতা পরিহার
অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবীজি (সা.) কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির সাহাবিদের একটি বড় অংশ নিঃস্ব অবস্থায় নতুন জীবনের মুখোমুখি হন। তাঁদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ছিল নবীজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে বাসস্থান, সম্পদ ও কর্মসংস্থানের বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৩৭)
নবীজি ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে মানুষকে নিজ প্রচেষ্টায় জীবিকা অর্জনের শিক্ষা দিয়েছেন। অভাবগ্রস্ত এক সাহাবিকে তিনি কুঠার কিনে দিয়ে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে উপার্জনের পথ দেখিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৪১)
অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘কেউ নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭২)
২. হারাম বর্জন ও হালাল উপার্জন
ইসলাম মানুষের উপার্জন, উৎপাদন ও সম্পদ বণ্টনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে।
একজন মুসলমান ব্যবসা–বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প কিংবা অন্য যেকোনো পেশায় নিয়োজিত হতে পারবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, জালিয়াতি বা অন্য কোনো হারাম পন্থায় সম্পদ অর্জন করতে পারবে না।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল, তা গ্রহণ করো এবং যা হারাম, তা বর্জন করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৪৪)
৩. সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারব্যবস্থা
মদিনায় আগমনের পর নবীজি (সা.) দেখলেন, স্থানীয় বাজারের ওপর কিছু গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা সমান সুযোগ–সুবিধা পাচ্ছেন না। তখন তিনি সবার জন্য উন্মুক্ত এমন একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে অন্যায্য কর কিংবা নির্দিষ্ট শ্রেণি কর্তৃক বাজার কুক্ষিগত করার সুযোগ ছিল না।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘এটি তোমাদের বাজার, এতে কোনো কর আরোপ করা হবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৩৩)
এই বাজার প্রতিষ্ঠার ফলে ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং মদিনার অর্থনীতি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
৪. সুদমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
সুদ অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি ও শোষণের হাতিয়ার। ইসলাম সুদকে চিরন্তনভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
রাসুল (সা.) সুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং অর্থনৈতিক লেনদেনকে সুদমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল ঘোষণা করেন এবং প্রথম তাঁর চাচা আব্বাস (রা.)–এর সুদ মওকুফ করেন। (সুনানে তিরমিজ, হাদিস: ৩০৭৮)
৫. ন্যায়সংগত উত্তরাধিকার আইন
নবীজির আগমন–পূর্ব জাহেলি আরব সমাজে উত্তরাধিকার বণ্টনে চরম বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। নারী ও শিশুরা সাধারণত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পেত।
এ পটভূমিতে ইসলাম উত্তরাধিকার বণ্টনের একটি সুনির্দিষ্ট বিধান প্রবর্তন করে। প্রথম নারীকে সম্পত্তির স্বতন্ত্র অধিকার প্রদান করে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মা–বাবা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং মা–বাবা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে, অল্প হোক কিংবা বেশি। এটি নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭)
৬. অর্থনৈতিক ভারসাম্যে জাকাত ব্যবস্থা
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হলো জাকাত। এটি ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ফলে ধনী ও দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসে। জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
সম্পদের মালিকের প্রতি জুলুম করা যেমন নিষিদ্ধ, অন্যদিকে দরিদ্রের অধিকারও যথাযথভাবে নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে ইয়েমেনে প্রেরিত সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)–কে নবীজি (সা.) নির্দেশ দেন, ‘জাকাত হিসেবে মানুষের উৎকৃষ্ট সম্পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৯৮৬)
৭. দানশীলতার মনোভাব
জাকাতের পাশাপাশি নবীজি (সা.) স্বেচ্ছাদান ও সদকার প্রতি ব্যাপক উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্যের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করত।
যেমন হিজরতের পর ওসমান (রা.) ‘রুমা’ নামক কূপটি ৪০০ দিনারের বিনিময়ে কিনে মুসলমানদের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। (ইবনে আসাকির, তারিখেুদিমাশক, ৩৯/৭২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৬)
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, নবী যুগের সমাজব্যবস্থা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৮. ব্যবসায় সততা
রাসুল (সা.) ব্যবসাকে অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখতেন। ব্যবসার ভিত্তি হতে হবে সততা ও নৈতিকতা। হাদিসে এসেছে, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)
ব্যবসায় প্রতারণা, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি ও অসৎ উপায় অবলম্বনকে নবীজি (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। একবার খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ পেয়ে তিনি বলেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)
৯. মজুতদারি ও কালোবাজারি দমন
অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ হলো বাজার কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। রাসুল (সা.) এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘পাপী ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি (কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি) করে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)
একইভাবে নকল পণ্য বিক্রি, ওজনে কম দেওয়া ও মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন। এর ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পায়। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ পদক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম।
১০. ওয়াক্ফ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন
নবীজি (সা.) সমাজকল্যাণমূলক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণাকে উৎসাহিত করেন, যা পরবর্তী সময়ে ওয়াক্ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ওমর (রা.) খাইবারের জমি ওয়াক্ফ করার সময় নবীজি তাঁকে মূল সম্পদ অক্ষত রেখে এর উপকার জনসাধারণের জন্য ব্যয় করার পরামর্শ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩৭)
এই ওয়াক্ফ ব্যবস্থা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ ও দরিদ্রদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য মাদ্রাসা, এতিমখানা, হাসপাতাল ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ওয়াক্ফের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ