রমজান পরবর্তী শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা মুমিনদের কাছে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৪)
তবে এই আমলটির ভিত্তি বা সংশ্লিষ্ট হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে হাফেজ ইবনুদ দিহিয়া এই হাদিসটিকে দুর্বল প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর সেই সংশয় দূর করতে হাফেজ ইবনে কাইকালদি আল-আলাই রাফউল ইশকাল আন সিয়ামি সিত্তাতিন মিন শাওয়াল নামে একটি তথ্যবহুল বই লিখেছেন। গ্রন্থের আলোকে আলোচনা করা হলো।
ইবনুদ দিহিয়ার দাবি
ইবনুদ দিহিয়া দাবি করেছিলেন, শাওয়ালের ছয় রোজার হাদিসটি বিশুদ্ধ নয়। তাঁর প্রধান যুক্তি ছিল, এই হাদিসটি ‘সাআদ বিন সাঈদ’ নামক একজন বর্ণনাকারীর ওপর নির্ভরশীল, যিনি অত্যন্ত দুর্বল।
এছাড়া তিনি দাবি করেন যে, ইমাম মালিক (রহ.) এই হাদিসকে অস্বীকার করেছেন এবং এটি বর্ণনা করেননি।
ইবনে কাইকালদি তাঁর বইয়ে ইবনুদ দিহিয়ার প্রতিটি যুক্তির যথার্থ জবাব দিয়েছেন:
১. সহিহ মুসলিমের দলিল: ইবনে কাইকালদি বলেন, এই হাদিসটি ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। উম্মতের আলেমদের ঐকমত্য হলো, বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসগুলো সহিহ। সুতরাং একে দুর্বল বলার সুযোগ নেই।
২. একক বর্ণনাকারী নন: ইবনুদ দিহিয়ার দাবি ছিল হাদিসটি কেবল সাআদ বিন সাঈদ বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু ইবনে কাইকালদি দেখিয়েছেন যে, সাআদ ছাড়াও তাঁর ভাই ইয়াহইয়া বিন সাঈদ এবং সাফওয়ান বিন সুলাইমানও এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ ও নাসায়ি তাঁদের সূত্র থেকে হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন।
৩. ইমাম মালিকের অবস্থান: ইমাম মালিক (র.) তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে এই হাদিসের ওপর আমল করার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করলেও হাদিসটির সূত্রকে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন নি বা মিথ্যা বলেননি।
মূলত মদিনার মানুষের নিরবচ্ছিন্ন আমল না থাকায় তিনি এটি বাধ্যতামূলক মনে করতেন না। কিন্তু অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে হাদিসটি প্রমাণিত।
৪. বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা: ইবনুদ দিহিয়া জনৈক বর্ণনাকারীকে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ বা ‘পরিত্যক্ত’ বলেছিলেন। ইবনে কাইকালদি প্রমাণ করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারী মোটেও পরিত্যক্ত নন, বরং ইমাম মুসলিম তাঁর ওপর নির্ভর করেছেন।
শাওয়াল মাসের ছয় রোজা কখন এবং কীভাবে রাখতে হবে, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও বিষয়টি বেশ নমনীয়:
• ধারাবাহিকতা: রোজাগুলো কি পরপর রাখতে হবে নাকি বিরতি দিয়ে? অধিকাংশ আলেমের মতে, শাওয়াল মাসের যেকোনো ছয় দিন রোজা রাখলেই সওয়াব পাওয়া যাবে। এগুলো একনাগাড়ে রাখাও যায়, আবার ভেঙ্গে ভেঙ্গেও রাখা যায়।
• সময়: অনেকে শাওয়ালের শুরুর দিকে রোজা রাখা পছন্দ করেন, আবার কেউ পুরো মাসজুড়ে সুবিধামতো রাখার পক্ষে।
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক বলেন, মাসের শুরুতে রাখা উত্তম। তবে ইউসুফ ইবনে হাসান ইবনে আবদুল হাদি মনে করেন, পুরো মাসজুড়ে চেষ্টা করে এই রোজাগুলো সম্পন্ন করাই আসল উদ্দেশ্য।
শেষ কথা
শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা সুন্নত এবং এর ফজিলত অপরিসীম। আধুনিক বা প্রাচীন কোনো ব্যক্তিগত মতের কারণে এই সহিহ হাদিসটি বর্জন করার প্রয়োজন নেই।
রমজানের ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়ার জন্য শাওয়ালের এই আমলটি অত্যন্ত কার্যকর।
সময়ের স্বল্পতা বা ব্যক্তিগত ব্যস্ততা থাকলেও পুরো শাওয়াল মাসের যেকোনো সময় এই রোজাগুলো পূর্ণ করা যায়।