মক্কার একটি পাহাড়ে হাজিরা
মক্কার একটি পাহাড়ে হাজিরা

সিরাত

মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসতি ও ভাষার প্রশ্ন

ইতিহাসে মক্কায় মানব বসতি স্থাপনের গল্পটি কী জানেন? কোন সে ঐশ্বরিক ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে তা জড়িয়ে আছে? একটি ফল-ফসলাদিহীন জনমানবশূন্য পাহাড়ি উপত্যকায় জননী হাজেরা আর ইসমাইলের মাধ্যমে মানব জীবনযাত্রা শুরু কোন সে উদ্দেশ্যে?

প্রথমে শিশু ইসমাইল ও তাঁর জননীকে শুষ্ক প্রান্তরে রেখে যাওয়ার সময় আল্লাহর নিকট ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়াটি খেয়াল করুন, ‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দিয়ে তাদের আহারের ব্যবস্থা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭)

এখন ইব্রাহিম (আ.) কীভাবে তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে এই মরুপ্রান্তরে রেখে গেলেন, সেই ঘটনা সহিহ বুখারি থেকে শোনা যাক।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নারী জাতি প্রথম ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হাজরা থেকেই কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে। হাজেরা সারা থেকে আপন গর্ভের নিদর্শনাবলি গোপন করার উদ্দেশ্যেই কোমরবন্ধ লাগাতেন। অতঃপর উভয়ের মনোমালিন্য চরমে পৌঁছালে আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আ.) হাজেরা ও তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাসনের জন্য বের হলেন।

তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দুই হাত তুলে এ দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছুসংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে।

পথে হাজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। শেষ পর্যন্ত ইব্রাহিম তাঁদের উভয়কে নিয়ে যেখানে কাবাঘর অবস্থিত, সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং মসজিদের উঁচু অংশে জমজমের উপরিস্থিত এক বিরাট বৃক্ষতলে তাঁদের রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোনো জনমানব, না ছিল পানির কোনোরূপ ব্যবস্থা।

অতঃপর সেখানেই তাঁদের রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে স্বল্প পরিমাণ পানি দিয়ে গেলেন। তারপর ইব্রাহিম (আ.) নিজ গৃহ অভিমুখে ফিরে চললেন।

ইসমাইলের মাতা তাঁর পিছু পিছু ছুটে এলেন এবং চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘হে ইব্রাহিম, কোথায় চলে যাচ্ছেন? আর আমাদের রেখে যাচ্ছেন এমন এক ময়দানে, যেখানে না আছে কোনো সাহায্যকারী, না আছে পানাহারের কোনো বস্তু।’ তিনি বারবার এ কথা বলতে লাগলেন।

কিন্তু ইব্রাহিম (আ.) সেদিকে ফিরেও তাকালেন না। তখন হাজেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ হাজেরা বললেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’

তারপর ইব্রাহিম (আ.) ফিরে এলেন। ইব্রাহিমও সামনে চললেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে এসে পৌঁছালেন, যেখানে স্ত্রী-পুত্র আর তাঁকে দেখতে পাচ্ছিল না, তখন তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দুই হাত তুলে এ দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছুসংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে তারা যেন নামাজ কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দিয়ে তাদের আহারের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭)

আরবের পাহাড়ি উপত্যকায় উট ও তার আরোহী

তখন ইসমাইলের মা ইসমাইলকে দুধ খাওয়াতেন আর নিজে সেই মশক থেকে পানি পান করতেন। পরিশেষে মশকে যা পানি ছিল, তা ফুরিয়ে গেল। তখন তিনি নিজেও তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তাঁর শিশুপুত্রটিও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুর প্রতি দেখতে লাগলেন, শিশুর বুক ধড়ফড় করছে কিংবা বলেছেন, সে জমিনে ছটফট করছে।

শিশুপুত্রের দিকে তাকানো তাঁর পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠল। তিনি সরে পড়লেন এবং তাঁর অবস্থান–সংলগ্ন পর্বত সাফাকেই একমাত্র নিকটতম পর্বত হিসেবে পেলেন। তারপর তিনি এর ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ময়দানের দিকে মুখ করলেন, এদিক–সেদিক তাকিয়ে দেখলেন কাউকে দেখা যায় কি না। কিন্তু না, কাউকে তিনি দেখলেন না। তখন দ্রুত সাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন।

যখন তিনি নিচু ময়দানে পৌঁছালেন, তখন আপন কামিজের এক দিক তুলে একজন শ্রান্ত-ক্লান্ত ব্যক্তির ন্যায় দৌড়ে চললেন। শেষে ময়দান অতিক্রম করলেন, মারওয়া পাহাড়ের নিকট এসে গেলেন এবং তার ওপর উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চারদিকে দৃষ্টি দিলেন, কাউকে দেখতে পান কি না। কিন্তু তিনি কাউকে দেখলেন না। অনুরূপভাবে সাতবার করলেন।...

তারপর যখন তিনি শেষবার মারওয়া পাহাড়ের ওপর উঠলেন, একটি আওয়াজ শুনলেন। তখন নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা করো। তিনি কান দিলেন। আবারও শব্দ শুনলেন। তখন বললেন, ‘তোমার আওয়াজ তো শুনছি। যদি তোমার কাছে উদ্ধার করার মতো কিছু থাকে আমাকে উদ্ধার করো।’

অকস্মাৎ হাজেরা জমজম যেখানে অবস্থিত, সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন। কিংবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত হানলেন। ফলে (আঘাতের স্থান থেকে) পানি উপচে উঠতে থাকল। হাজেরা চারপাশে বাঁধ দিয়ে তাকে হাউসের আকার দান করলেন এবং অঞ্জলি ভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। হাজেরার অঞ্জলি ভরার পর পানি উছলে উঠতে লাগল...

তারপর হাজেরা পানি পান করলেন এবং শিশুপুত্রকেও দুধ পান করালেন। তখন ফেরেশতা তাঁকে বললেন, ‘ধ্বংসের কোনো আশঙ্কা আপনি করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু তার পিতার সঙ্গে মিলে এটি পুনর্নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার পরিজনকে কখনো ধ্বংস করবেন না।’ ওই সময় বায়তুল্লাহ জমিন থেকে টিলার ন্যায় উঁচু ছিল। বন্যার পানি আসত এবং ডান–বাম থেকে ভেঙে নিয়ে যেত।

তাঁরা উভয়ে কাবাঘরের দেয়াল ওঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাইল (আ.) পাথর জোগান দিতেন এবং ইব্রাহিম (আ.) গাঁথুনি করতেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাইল মাকামে ইব্রাহিম নামের প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন

হাজেরা এভাবেই দিনযাপন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘জুরহুম’ গোত্রের একদল লোক তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গেল। কিংবা তিনি বলেছেন, ‘জুরহুম’ গোত্রের কিছু লোক ‘কাদা’র পথে এদিক দিয়ে আসছিল। তারা মক্কার নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং দেখতে পেল, কতগুলো পাখি চক্রাকারে উড়ছে।

তখন তারা বলল, নিশ্চয়ই এই পাখিগুলো পানির ওপরই ঘুরছে। অথচ আমরা এ ময়দানে বহুকাল কাটিয়েছি। কিন্তু কোনো পানি এখানে ছিল না। তারপর তারা একজন বা দুজন লোক সেখানে পাঠাল। তারা গিয়েই পানি দেখতে পেল। ফিরে এসে সবাইকে পানির খবর দিল। সবাই সেদিকে অগ্রসর হলো।

বর্ণনাকারী বলেন, ইসমাইলের মাতা পানির কাছে বসা ছিলেন। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই; আপনি আমাদের অনুমতি দেবেন কি?’

হাজেরা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তবে এ পানির ওপর তোমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।’ তাঁরা ‘হ্যাঁ’ বলে সম্মতি জানাল।

ইবনে আব্বাস বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাইলের মাতার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল, তিনিও মানুষের সাহচর্য কামনা করছিলেন। ফলে আগন্তুক দলটি সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং পরিবার-পরিজনের কাছে খবর পাঠাল। তারাও এসে সেখানে বসবাস শুরু করল।

শেষ পর্যন্ত সেখানে তাদের কয়েকটি খান্দান জন্ম নিল। ইসমাইলও বড় হলেন, তাঁদের থেকে আরবি শিখলেন। জওয়ান হলে তিনি তাদের অধিক আগ্রহের বস্তু ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। যখন তিনি যৌবনপ্রাপ্ত হলেন, তখন তারা তাদেরই এক মেয়েকে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দিল। বিয়ের পর ইসমাইলের মাতা মারা গেলেন।...(ইতিমধ্যে নবি ইব্রাহিম দু’বার এসে ইসমাইল ও স্ত্রীর খোঁজ নিলেন এবং এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিলেন।)

পুনরায় ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর ইচ্ছায় কিছুদিন তাঁদের থেকে দূরে রইলেন। এরপর আবার তাঁদের কাছে এলেন। ইসমাইল তখন জমজমের কাছে একটি গাছের নিচে বসে নিজের তীর মেরামত করছিলেন। পিতাকে যখন আসতে দেখলেন, দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর পিতা-পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে লোকেরা যা করে, তাঁরা তা-ই করলেন।

তারপর ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘হে ইসমাইল, আল্লাহ আমাকে একটি কাজের হুকুম দিয়েছেন।’ ইসমাইল (আ.) জবাব দিলেন, ‘আপনার প্রভু আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করে ফেলুন।’ ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘তুমি আমাকে সাহায্য করবে কি?’ ইসমাইল বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি অবশ্যই আপনার সাহায্য করব।’

ইব্রাহিম বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে এখানে এর চারপাশ ঘেরাও করে একটি ঘর বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’ এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন এবং স্থানটি দেখালেন।

তখনই তাঁরা উভয়ে কাবাঘরের দেয়াল ওঠাতে লেগে গেলেন। ইসমাইল (আ.) পাথর জোগান দিতেন এবং ইব্রাহিম (আ.) গাঁথুনি করতেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাইল মাকামে ইব্রাহিম নামের প্রসিদ্ধ পাথরটি আনলেন এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন।

মাকামে ইব্রাহিমের ওপর দাঁড়িয়ে ইমারত নির্মাণ করতে লাগলেন এবং ইসমাইল তাঁকে পাথর জোগান দিতে লাগলেন। আর উভয়ে এ দোয়া করতে থাকলেন, ‘হে আমাদের রব, আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৭)

আবার তাঁরা উভয়ে ইমারত নির্মাণ করতে লাগলেন। তাঁরা কাবাঘরের চারদিকে ঘুরছিলেন এবং উভয়ে এ দোয়া করছিলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের এ শ্রমটুকু কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৬৪)

১৮৪৫ সালের মক্কার একটি চিত্র

তো পাঠক, দীর্ঘ এই ঘটনা হাদিস থেকে শোনালাম। ইতিমধ্যে আমরা উপলব্ধি করেছি, ঘটনাটি মক্কা নগরীর মানববসতির দলিল। কিন্তু নবীজির জীবনের সঙ্গে এ ঘটনার কী সম্পর্ক?

পবিত্র কোরআনে উদ্ধৃত ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া আর হাদিসে উদ্ধৃত ঘটনা পর্যালোচনা করলে আল্লাহ-তাআলার দুটি উদ্দেশ্য দৃষ্টিগোচর হয়।

প্রথমত, কাবাঘর নির্মাণ। এ বিষয়ে হাদিস ও হাদিসের শেষে উদ্ধৃত পবিত্র কোরআনের আয়াতটি আপাতত যথেষ্ট। পরে আমরা কোরআনের অন্যান্য আয়াতে কাবার স্থান নির্বাচন ও নির্মাণ–সম্পর্কিত জরুরি আরও কিছু আলাপ তুলব।

দ্বিতীয়ত, ঘটনাটার আরেকটি উদ্দেশ্য, যার সঙ্গে নবীজির জীবনের সম্পর্ক গভীরতর। খেয়াল করেছেন নিশ্চয়, ইসমাইল জুরহুম বংশের সান্নিধ্যে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখেছেন। আল্লাহ-তাআলা নুহ (আ.)-এর নৌযানে যাঁদের আরোহন করিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন জুরহুম, যিনি বিশুদ্ধ আরবি ভাষা জানতেন।

তাঁর মাধ্যমে বনি জুরহুমের মধ্যে ঐশ্বরিক পরিকল্পনায় বিশুদ্ধ আরবি টিকে থাকে আর ভাগ্য তাঁদের একটি অংশকে টেনে আনে মক্কা মুকাররমায়।

সময়ের আবর্তে তাঁদের মধ্যে ভাষা যতটুকু পরিবর্তনের শিকার হয়েছে, তা ইসমাইলকে ইলহামের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে দেওয়া হয়। ইসমাইলের বংশধরেরা এভাবে বিশুদ্ধ আরবির সংরক্ষক হয়ে ওঠেন। বনু ইসমাইল থেকে বনু কাহতান ও ইয়ারুব পর্যন্ত আদি ও খাঁটি আরবি ভাষা বংশানুক্রমিকভাবে কালান্তরিত ও স্থানান্তরিত হয়।

এ যেন মক্কায় নবীজির ওপর পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হবে তার প্রস্তুতি কত কাল, পাঠক তা কি লক্ষ করেছেন!

সময়ের আবর্তে তাঁদের মধ্যে ভাষা যতটুকু পরিবর্তনের শিকার হয়েছে, তা ইসমাইলকে ইলহামের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে দেওয়া হয়। ইসমাইলের বংশধরেরা এভাবে বিশুদ্ধ আরবির সংরক্ষক হয়ে ওঠেন।

আসুন, আরেকটু পরিষ্কার হই। মুহাম্মদ ইবনে সল্লাম আল-জুমাহি (মৃ. ২৩২ হি.) তাঁর ‘তাবাকাতুশ শুআরা’ গ্রন্থে ইউনুস ইবনে হাবিবকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম (আ.) প্রথম আরবি ভাষায় কথা বলেন।’ এখানে প্রশ্ন করা যায়, যে ভাষায় প্রথম মানব আদম প্রথমে জান্নাতের কথা বলেছেন এবং অতঃপর নূহ (আ.)-এর বংশধর জুরহুম কথা বলেছেন, সে ভাষায় কী করে ইসমাইল (আ.) প্রথম কথা বলেন? এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, ইসমাইল প্রকৃতপক্ষে পুনর্জন্মপ্রাপ্ত আরবি ভাষায় কথা বলেছেন।

নবীজি (সা.) বলেন, ‘ইসমাইলের প্রতি এই আরবি ভাষা আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হয়েছে।’ (বাইহাকি)

মানবেতিহাসের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে আদমের সন্তান ও নুহের নৌযানের আরোহীদের বংশধরেরা পৃথিবীর নানা অংশে ছড়িয়ে পড়লে প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, পরিবেশগত ও সময়ের বিবর্তনের কারণে তাদের মধ্যে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে এসব ভাষায় কালক্রমে নানা বিকৃতি ও পরিবর্তন দেখা দেয় এবং এগুলো থেকে বিভিন্ন উপভাষার জন্ম হয়।

অন্যান্য ভাষার মতো আরবিও বিভিন্ন সময় অনুরূপ বিকৃতির শিকার হয়; কিন্তু প্রতিবারই বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে অলৌকিকভাবে তাকে পুনর্জীবন দান করা হয়।

সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে আরবিকে সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনের ভাষা হওয়ার গৌরব দান। ভাষাটিকে বিশ্বসংস্কৃতির ইতিহাসে বিশেষ এমন মর্যাদা ও সৃষ্টির চিরন্তনতা প্রদান করা যে স্তরে কোনো জাতি কিংবা কোনো ব্যক্তির পৌঁছানো অসম্ভব হয়।

আরবির এ বৈশিষ্ট্যের কথা আল-কোরআনের একাধিক আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে, ‘আর আমি অবশ্যই জানি তারা বলে, তাকে তো কেবল একজন মানুষ শিক্ষা দেয়। তারা যার প্রতি এটাকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য ঝুঁকছে, তার ভাষা তো আরবি নয়; অথচ এটা হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষা।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০৩)

অপর দিকে ইসমাইল কর্তৃক ব্যবহৃত বিশুদ্ধ আরবি ভাষাও কালের আবর্তনে কিছুটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আবু আহমদ আল-গিতরিফি (মৃ. ৩৭৭ হি.) তাঁর ‘কাশফুজ জুনুন’ গ্রন্থে ওমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন, তিনি একদিন নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘বিষয়টি কি এমন যে আপনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী অথচ আপনি আমাদের সম্প্রদায়ের বাইরে যাননি?’

নবীজি (সা.) বলেন, ‘ইসমাইলের ভাষা বিলীন হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর জিবরাইল (আ.) এসে আমাকে তা মুখস্থ করিয়ে দেন এবং আমিও তা মুখস্থ করে রাখি।’

ইমাম বাইহাকি তাঁর ‘শুআবুল ইমান’ গ্রন্থে একটি দীর্ঘ হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। একজন সাহাবি নবীজির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডারের বিপুলতায় বিমুগ্ধ হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কতই না বিশুদ্ধভাষী। আপনার চেয়ে বিশুদ্ধ আরবিভাষী কোনো ব্যক্তিকে আমরা কখনো দেখিনি!’ নবীজি (সা.) বলেন, ‘এ কথা ঠিক। কারণ, আমার ওপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।’ (বাইহাকি, শুআবুল ঈমান)

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়