
‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সুস্থ থাকুন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো । সায়েন্টিফিক পার্টনার অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড।
উচ্চ রক্তচাপ বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে তাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আবার যাঁরা জানেন, তাঁদের বড় অংশ চিকিৎসা নেন না বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন না। ফলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলসহ নানা জটিলতায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সুস্থ থাকুন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এ আলোচনার আয়োজন করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো। সায়েন্টিফিক পার্টনার অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড।
বৈঠকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী উচ্চ রক্তচাপের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় পৌনে তিন লাখ মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত বিভিন্ন জটিলতায় মারা যান। আগে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত থাকলেও এখন তা বেড়ে প্রতি চারজনের একজন হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে মৃত্যুর পেছনে উচ্চ রক্তচাপ বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। লবণ কম খাওয়া, ধূমপান পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম—এসবের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হারুন-আর-রশিদ উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কিডনি রোগের সরাসরি সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—এই দুটি রোগই কিডনি বিকলের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না, ফলে রোগীরা দেরিতে বুঝতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এক পর্যায়ে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার পরীক্ষা করা উচিত।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। উচ্চ রক্তচাপ শরীরের প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণেই একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টি তুলে ধরে ফজিলা-তুন-নেসা বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক নারী নিজেদের শারীরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না এবং দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। ফলে জটিলতা বাড়ে। নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গর্ভকালে উচ্চ রক্তচাপ নারী ও শিশুদের জন্য ঝুঁকি
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর জন্য বড় ঝুঁকি বলে জানান জেড এইচ সিকদার উইমেনস মেডিকেল কলেজের প্রসূতি ও গাইনি বিভাগের অধ্যাপক এস কে জিন্নাত আরা নাসরীন। তিনি বলেন, গর্ভকালে উচ্চ রক্তচাপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অবস্থা, যা মাতৃমৃত্যুর ২০ থেকে ২৪ শতাংশের জন্য দায়ী হতে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণও এই গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ। এ অবস্থায় রোগীর খুব ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকের নিবিড় তদারকি প্রয়োজন।
শিশু ও তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তওফিক শাহরিয়ার হক। তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়, শিশু ও তরুণদের মধ্যেও এর ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে অন্তত আটজন জন্মগত হৃদ্রোগ নিয়ে জন্মায় এবং অনেকেই পরে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ আরাফাত বলেন, উচ্চ রক্তচাপকে এখনো অনেক রোগী গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। অনেকে মাথা বা ঘাড়ব্যথা হলেই মনে করেন তাঁদের প্রেশার বেড়েছে এবং নিজেরাই ওষুধ খেয়ে ফেলেন। আবার অনেকে কিছুদিন ভালো লাগলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ বন্ধ করে দেন। তাঁর মতে, উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে। ফলে রোগী সচেতন হন না, যতক্ষণ না স্ট্রোক বা কিডনি জটিলতার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট মীর ইশরাকুজ্জামান বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট হওয়া উচিত জীবনধারা পরিবর্তন। ওষুধ শুরু করলেই হবে না। খাদ্যাভ্যাসে লবণ কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ক্ষতিকর অভ্যাস যেমন ধূমপান ও এনার্জি ড্রিংকস পরিহার করতে হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কনট্রোল প্রোগ্রামের সাবেক লাইন ডিরেক্টর সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মানসিকতা। তিনি একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, অনেক রোগী পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও নিজের ওষুধ বন্ধ করে দেন, যা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস মিলিয়ে লক্ষাধিক রোগী থাকলেও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান মাহমুদুল হাসান বলেন, উচ্চ রক্তচাপের কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালি সরু বা ছিঁড়ে গিয়ে স্ট্রোক হয়। তার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ ইস্কেমিক এবং ১৫ শতাংশ হেমোরেজিক স্ট্রোক এবং উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপ বড় ঝুঁকি। তিনি বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবন স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন জাহান বলেন, উচ্চ রক্তচাপের ৮৫ শতাংশের কোনো নির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে হরমোনজনিত কারণ দায়ী। তিনি বলেন, ‘১৪ ধরনের হরমোনজনিত রোগ আছে, যা উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে। এগুলো যদি দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তাহলে নিরাময় সম্ভব। কিন্তু দেরি হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।’ তিনি জানান, অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়া, ওষুধে নিয়ন্ত্রণ না আসা, বা রক্তচাপের অতিরিক্ত ওঠানামা হলে হরমোনজনিত কারণ খুঁজে দেখা উচিত।
অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধের দাম কম ও সহজলভ্য বলে জানান অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন তালুকদার। তিনি বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম এবং সহজলভ্য। প্রতিদিনের চিকিৎসা ব্যয় প্রায় এক থেকে দশ টাকার মধ্যে সীমিত, যা রোগীর জন্য বড় কোনো বোঝা নয়। তিনি বলেন, ওষুধের দাম সরকার নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে কাঁচামালের খরচ বাড়লেও গত কয়েক বছরে কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়াতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।