হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘উত্তম কৃষি চর্চা (GAP) ও খাদ্য ব্যবস্থা: টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৮ জুন ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল
পরিচালক, সরেজমিন উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
২০২০ সালে নীতিমালা প্রণয়নের পর আমরা দেশে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করি। ২০২৩ সালে মানদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার পর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই উত্তম কৃষিচর্চা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি আমাদের বড় অর্জন। তবে এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে কৃষক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যম—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। উত্তম কৃষিচর্চা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি নয়, এটি একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।
আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও হর্টেক্স ফাউন্ডেশন উত্তম কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে কাজ করছে। বাস্তবতা হলো, উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। জেলা পর্যায়ে উত্তম কৃষিপণ্যের জন্য বিপণন কর্নার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার কৃষকের বাজারেও উত্তম কৃষিপণ্য বিক্রি হচ্ছে। বড় বিপণিবিতানগুলো যদি এসব পণ্য বাজারজাত করতে এগিয়ে আসে, তাহলে উৎপাদকদের আরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
আমরা এখন ব্যক্তির চেয়ে দলভিত্তিক সনদ প্রদানে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আগ্রহী উৎপাদক বা উৎপাদক দল উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে সহজেই আবেদন করতে পারে। তবে সনদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি আরও জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। উত্তম কৃষিচর্চা সফল করতে শুধু উৎপাদক নয়, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও সেটিকে টেকসই করা গেলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। খাদ্যের মান উন্নত হলে অনেক রোগও কমে আসবে।
নূরুন নাহার
কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান বিশাল হলেও যাঁদের পরিশ্রমে আমাদের খাদ্য উৎপাদিত হয়, সেই কৃষকেরাই নানা সেবা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা অনেক কাজ করছে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কৃষকের কাছে আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা পৌঁছে দেওয়া কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেইফার নিরাপদ খাদ্য ও টেকসই কৃষি নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশে আমরা কৃষিকে সামগ্রিকভাবে গুরুত্ব দিলেও প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ, হাঁস-মুরগি ও নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। শুরুতে আমরা শুধু নারী কৃষকদের নিয়ে কাজ করতাম। পরে আমরা বুঝেছি, শুধু একজন কৃষক নয়, পুরো কৃষক পরিবারকে নিয়েই কাজ করতে হবে। এ জন্য নারী কৃষকদের সমবায়ভিত্তিক সংগঠিত করেছি।
প্রতিটি সমবায়ে প্রায় এক হাজার সদস্য রয়েছেন। আমরা তাঁদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সক্ষমতা, সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করি। আর্থিক সহায়তা সরাসরি না দিলেও ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের সংযোগ তৈরি করি।
কৃষক যেন তাঁর উৎপাদিত নিরাপদ পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, কৃষক যদি লাভবান না হন, তাহলে তিনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আগ্রহী হবেন না। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কৃষক চান না তাঁদের সন্তান এই পেশায় আসুক। কারণ, তাঁরা নিজেরাই ন্যায্যমূল্য, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। অথচ কৃষক উৎপাদন বন্ধ করে দিলে আমাদের আমদানিনির্ভর হতে হবে এবং খাদ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তাই কৃষিকে টেকসই করতে হলে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ও নতুন প্রজন্মকে এই খাতে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
যাকীয়াহ্ রহমান মনি
পরিচালক (পুষ্টি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি ধাপই উত্তম কৃষিচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল গবেষণা সমন্বয়, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে দেশে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতীয় উত্তম কৃষিচর্চা স্কিমের স্কিমওনার হিসেবে বিএআরসি বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা মানদণ্ড, ফসলভিত্তিক প্রটোকল, পরিচালন নির্দেশিকা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রকাশনা প্রণয়ন করেছে, যা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল সার্টিফিকেশন বডি ও ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণায় উত্তম কৃষিচর্চা–সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা মানদণ্ডের পাঁচটি মডিউলের আওতায় প্রশিক্ষণ, নথি সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, পণ্যের গুণগত মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। কৃষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সক্ষমতা বৃদ্ধি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
উত্তম কৃষিচর্চা একটি মানদণ্ড, এর টেকসই বাস্তবায়নের জন্য বাজার সৃষ্টি, উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। পরীক্ষাগার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, খণ্ডিত জমি, সংগ্রহকেন্দ্র ও প্যাকেজিং অবকাঠামোর মতো চ্যালেঞ্জ ধাপে ধাপে মোকাবিলা করা হচ্ছে এবং দলভিত্তিক সনদব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে ভোক্তা সচেতনতা, গণমাধ্যমে প্রচারণা ও কৃষক প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করতে হবে। জলবায়ু–সহনশীল, নিরাপদ ও টেকসই কৃষি উন্নয়নে উত্তম কৃষিচর্চা একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
মো. আফছার আলী
মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব), মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট
উত্তম কৃষিচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুষম সার প্রয়োগ। কৃষকেরা সাধারণত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি ব্যবহার করেন, কিন্তু গন্ধক, দস্তা, বোরন ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো অণুপুষ্টি উপাদান খুব কম ব্যবহার করেন। অথচ অল্প পরিমাণে এসব উপাদান ব্যবহার করলে ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়। এ বিষয়ে আমাদের প্রদর্শনী ও গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান কাজ হলো প্রতিটি উপজেলার জমি থেকে নির্দিষ্ট ব্যবধানে মাটির নমুনা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ফসলভিত্তিক সুষম সার ব্যবহারের সুপারিশ দেওয়া। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিই। বর্তমানে অনলাইনে আমাদের সার সুপারিশ ব্যবস্থা রয়েছে। কৃষক তাঁর ইউনিয়নের মাটির ধরন ও ফসলের তথ্য দিলে প্রয়োজনীয় সার ব্যবহারের পরামর্শ পেতে পারেন।
উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সেই সক্ষমতা আছে, তবে এ ধরনের পরীক্ষা ব্যয়বহুল এবং বিশেষজ্ঞ জনবল ও উন্নত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো এলাকায় ভারী ধাতু পাওয়া গেছে—এ ধরনের তথ্য যথাযথ গবেষণা ও একাধিক পরীক্ষার আগে প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ, এতে ওই এলাকার কৃষিপণ্য ও রপ্তানি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই গণমাধ্যমে প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
সরকার কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভর্তুকিমূল্যে মাটি পরীক্ষার সুযোগ দিচ্ছে। আমরা দ্রুত ফলাফল দিয়ে থাকি, যাতে কৃষকেরা সেই তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এম নাজিম উদ্দিন
ন্যাশনাল হর্টিকালচারিস্ট ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা
বাংলাদেশের জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ ও উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা ২০২০ নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলো এফএওর ‘উন্নত উৎপাদন, উন্নত পুষ্টি, উন্নত পরিবেশ ও উন্নত জীবন’—এই লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে নীতিগত অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের পাশে থাকার বিষয়ে এফএও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশে এখনো ২৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে, যার অনেকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু রাসায়নিক সার যথেষ্ট নয়; জৈব সার ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা, অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে এসবের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো শনাক্তযোগ্যতা। কৃষক কার্ড এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি উত্তম কৃষিচর্চার তথ্য এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে পণ্যের উৎস শনাক্ত করা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণকারী কৃষকদের প্রণোদনা বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও সুযোগ তৈরি হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে এফএও প্রস্তুত।
উত্তম কৃষিচর্চা শুধু সরকারি কর্মসূচি নয়; এটি একটি ব্যবসাভিত্তিক ব্যবস্থা। সরকার প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সহায়তা তৈরি করবে, কিন্তু সনদভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনায় বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
এ কে ওসমান হারুনী
সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার–কৃষি, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস
উত্তম কৃষিচর্চাকে দৈনন্দিন জীবনের একটি ভালো অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেমন আমরা ঘুম থেকে উঠে ধাপে ধাপে কিছু কাজ করি, তেমনি উত্তম কৃষিচর্চাকেও একটি স্বাভাবিক চর্চা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এটি শুধু রপ্তানি বাজারের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের নিরাপদ খাদ্যের জন্যও জরুরি।
উত্তম কৃষিচর্চা শুধু ফসল উৎপাদনের বিষয় নয়; এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, খামার ব্যবস্থাপনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পুষ্টির বিষয়ও রয়েছে। আমরা যদি নিজেদের জন্য ভালো খাবার চাই, তাহলে এই পুরো ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আয়তনে ছোট হলেও তারা বিশ্বের অন্যতম বড় কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক। কারণ, তারা গবেষণা, সম্প্রসারণ, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও সেই ধরনের অংশীদারত্ব প্রয়োজন।
শুধু কৃষককে চাপ দিয়ে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়ন করা যাবে না। বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহকারী থেকে শুরু করে বাজারের ক্রেতা—সবার দায়িত্ব রয়েছে। সরকারকে নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, আর বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগ ও বাজার তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। উত্তম কৃষিচর্চা সনদপ্রাপ্ত পণ্য কেনা, শীতল সংরক্ষণাগার ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
দুই দিনের প্রশিক্ষণে উত্তম কৃষিচর্চা শেখানো সম্ভব নয়। এটি ধীরে ধীরে চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অনুশীলনই বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে ডিজিটাল কৃষি ও তথ্যভিত্তিক শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু হলে কৃষক সহজেই নিজের চর্চা নথিভুক্ত করতে পারবেন।
ফৌজিয়া ইয়াসমিন
পরিচালক, ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড
কোনো পণ্য উৎপাদনের আগে আমাদের জানতে হয়, বাজারে সেই পণ্যের চাহিদা কতটুকু। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি ইউনিট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সে বাজারের চাহিদা অনুযায়ীই উৎপাদন করে। উত্তম কৃষিচর্চার ক্ষেত্রেও উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও ভোক্তার চাহিদাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আমরা মাঠপর্যায়ে বীজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অতিরিক্ত রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। তাই আমরা জৈব বালাইনাশক ব্যবহার শুরু করি। কৃষকেরা এটি গ্রহণও করেন। কিন্তু পরে বাজারে সেই নিরাপদ পণ্য অন্য পণ্যের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনের জন্য কৃষক যে বাড়তি চেষ্টা করেন, তার কোনো স্বীকৃতি বা অতিরিক্ত সুবিধা তিনি পান না। এতে তাঁর আগ্রহ কমে যায়। যেকোনো ভালো উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে হলে স্বীকৃতি, প্রণোদনা বা লাভ—যেকোনো একটি উৎসাহ অবশ্যই থাকতে হবে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আম নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিই। জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত আম নিজেদের ব্র্যান্ডে বাজারজাত করি। আমরা দেখেছি, ভোক্তারা প্রিমিয়াম দামে সেই পণ্য কিনতে আগ্রহী। কারণ, মানুষ নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ খাদ্য চায় এবং সে জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতেও প্রস্তুত। বিদেশের বাজারেও আমরা দেখি, নিরাপদ ও জৈব খাদ্যের জন্য আলাদা কর্নার দিন দিন বড় হচ্ছে। তাই উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে না পারলে উত্তম কৃষিচর্চার মূল লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।
এ ক্ষেত্রে শনাক্তযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তম কৃষিচর্চার সনদপ্রাপ্ত পণ্যে যদি একটি প্রতীক বা কিউআর কোড যুক্ত করা যায়, তাহলে ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারবেন এটি নিরাপদ পণ্য। একই সঙ্গে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, যেকোনো একটি ধাপে ত্রুটি হলে পুরো খাদ্যই অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে।
আবুল কালাম আজাদ
প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর, পার্টনার প্রজেক্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
আমাদের লক্ষ্য শুধু নিরাপদ খাদ্য নয়; টেকসই কৃষি, জলবায়ু সহনশীলতা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো। বর্তমানে দেশের উৎপাদিত ফল ও সবজির খুব সামান্য অংশ রপ্তানি হয়। অথচ কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। সে জন্য উত্তম কৃষিচর্চার মান অনুসরণ অপরিহার্য।
উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা সেগুলো মোকাবিলা করছি। এক দিনের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়—আমরাও সেটি মনে করি। তাই পার্টনার প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে কৃষক মাঠবিদ্যালয়ের মাধ্যমে কৃষকদের ১০ সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে উত্তম কৃষিচর্চা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়গুলো ধাপে ধাপে শেখানো হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, এক দিনে শেখানো সম্ভব নয়।
রেকর্ড সংরক্ষণ নিয়ে যে সমস্যা আছে, সেটিও আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। কাগজভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। আমাদের আশা, খুব শিগগির কৃষকেরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন। নতুন একটি ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুরু থেকেই পূর্ণাঙ্গভাবে তা অনুসরণের চেষ্টা করতে হবে। পরে বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়গুলো বিবেচনা করা যাবে। একইভাবে জোর করে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। ভোক্তা যদি নিরাপদ পণ্যের মূল্য না বোঝেন, তাহলে বাজারও তৈরি হবে না। তাই ভোক্তার সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি শুধু অধিক ফলন নয়, রোগসহনশীল ও মানসম্মত জাত নির্বাচনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভোক্তাদেরও পণ্যের গুণগত মানকে মূল্যায়ন করতে হবে। নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়লে কৃষকেরাও সেই পথে আরও উৎসাহিত হবেন।
লাবনী খাতুন
কৃষক, বিজয়নগর কো–অপারেটিভ, সদর, যশোর
আমি প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক। আমি উত্তম কৃষিচর্চার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই মাটি পরীক্ষা করি। মাটি পরীক্ষার ফল অনুযায়ী আমরা সুষম সার ব্যবহার করি। পাশাপাশি জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা করি। উত্তম কৃষিচর্চার এসব পদ্ধতি অনুসরণ করলে উৎপাদন বাড়ে, তবে অনেক সময় উৎপাদন খরচও কিছুটা বেড়ে যায়।
সমস্যা হলো, এত পরিশ্রম করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করলেও বাজারে গিয়ে সাধারণ পণ্যের মতো একই দামে বিক্রি করতে হয়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কৃষকের বাড়তি শ্রম, সময় ও যত্নের কোনো আলাদা মূল্য আমরা অনেক ক্ষেত্রে পাই না। এ কারণে কৃষকেরা নিরুৎসাহিত হন।
অনেক সময় কৃষকদের জিজ্ঞেস করা হয়, লাভ হয়েছে, নাকি লোকসান? কিন্তু বেশির ভাগ কৃষক কোনো হিসাব না রেখেই আন্দাজে উত্তর দেন। বাস্তবে বীজ কেনা, শ্রমিকের মজুরি, সেচ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—সব খরচের সঠিক হিসাব না রাখলে লাভ-লোকসানের প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে বাজারদর কিছুটা কম হলেও হিসাব করলে দেখা যায়, লোকসান হয়নি; বরং কিছুটা লাভই হয়েছে।
এখন নিয়মিত সব তথ্য লিখে রাখার চেষ্টা করি। কতটি চারা লাগালাম, কত টাকা খরচ হলো, সেচে কত ব্যয় হলো, কতজন শ্রমিক কাজ করলেন, পরিবহনে কত খরচ হলো—সবই নথিভুক্ত করি। এতে আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করে সহজেই বুঝতে পারি, প্রকৃত অবস্থা কী। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, হিসাব সংরক্ষণ শুরু করার পর আর আন্দাজের ওপর নির্ভর করতে হয় না। বরং স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে খরচ থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা লাভজনক হতে পারে।
মো. মোশারেফ হোসেন
উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর
উত্তম কৃষিচর্চা শুধু ভালো কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি ভোক্তার স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাকে একসঙ্গে ধারণ করে কৃষির একটি নতুন দিগন্ত। উত্তম কৃষিচর্চা প্রটোকলের এই পাঁচটি মডিউলের আওতায় ২৪৬টি অনুশীলন রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে এসব অনুশীলন বাস্তবায়ন শুরু করেছি।
এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি হেইফার ইন্টারন্যাশনাল, জাগরণী চক্র ও আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করছেন। কৃষকদের মাটি পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবহার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, মাত্র এক বা দুই দিনের প্রশিক্ষণে উত্তম কৃষিচর্চার সব বিষয় কৃষকদের শেখানো কঠিন। তাই প্রশিক্ষণের সময় বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে উত্তম কৃষি চর্চার মডিউলগুলো আরও সহজভাবে কৃষকদের কাছে উপস্থাপন করা গেলে তা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
উত্তম কৃষিচর্চার প্রটোকল বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে নথি সংরক্ষণ বা রেকর্ড রাখার ক্ষেত্রে কৃষকদের এখনো ঘাটতি আছে। শনাক্তযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এই রেকর্ড সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
উত্তম কৃষিচর্চার অনুশীলন অনুসরণ করতে কৃষকদের বাড়তি শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু এখনো সে অনুযায়ী ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়নি। ফলে নিরাপদ পণ্য উৎপাদন করেও কৃষকেরা অনেক সময় বাড়তি মূল্য পান না। এ কারণে অনেক কৃষক এখনো পুরোপুরি উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণে আগ্রহী হতে পারছেন না। আমি মনে করি, উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে।
আবু নোমান ফারুক আহমেদ
অধ্যাপক, শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রেজিস্টার্ড ট্রেইনার, গ্লোবাল গ্যাপ
স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও এখনো উৎপাদনের পর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফল ও সবজিতে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। তাই নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টিকর খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানি—এই তিনটি বিষয় এখন আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ লক্ষ্য অর্জনে উত্তম কৃষিচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যব্যবস্থার জৈবিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, নীতিগত ও স্বাস্থ্য—এই পাঁচটি স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে বাজারব্যবস্থা, নারী কৃষকের স্বীকৃতি, বিভিন্ন নীতি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং স্বাস্থ্য খাতের সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করা দরকার। কৃষি এখন খোরপোশভিত্তিক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী কৃষির দিকে এগোচ্ছে। এই রূপান্তরকে টেকসই করতে হলে নারীকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, প্রণোদনা ও অর্থায়নের পরিকল্পনা করতে হবে।
মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আমরা দেখেছি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অধিকাংশ কৃষক উত্তম কৃষিচর্চা সম্পর্কে জানেন এবং অনেক ভালো চর্চা শুরু করেছেন। তবে রেকর্ড সংরক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার, ট্রেসেবিলিটি ও বাজারসংযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকেরা মনে করেন, উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করলে পণ্যের মান ভালো হয়, কিন্তু বাজারে তার আলাদা মূল্য পান না। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত যাঁরা যুক্ত থাকেন, তাঁদের অধিকাংশই উত্তম কৃষিচর্চা সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে কৃষকের উৎপাদিত নিরাপদ পণ্যের মান পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ধরে রাখা যায় না।
দীপেশ নাগ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড
গ্রামীণ ডানোন একসময় বাংলাদেশের একমাত্র বি করপোরেশন সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ছিল। এই সনদ সামাজিক ও পরিবেশগত কার্যকারিতা, জনস্বচ্ছতা ও আইনগত জবাবদিহির স্বীকৃতি দেয়। এত ব্যয় করে সব মানদণ্ড অনুসরণ করার পরও বাজারে তার প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। প্রতিযোগীর নিম্নমানের পণ্য যদি একই দামে বিক্রি হয়, তাহলে শুধু সনদ দিয়ে টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।
উত্তম কৃষিচর্চার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সচেতনতা তৈরি করা। আমরা নিরাপদ খাদ্যের কথা বলছি, উত্তম কৃষিচর্চা সনদের কথা বলছি, কিন্তু এটি কীভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে, সেটি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ কাজে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রাপ্তি ও শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবাই বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং এর অংশীদার হন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অংশীদারত্ব ও বাজারসংযোগ। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই বাজার তৈরি করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থাকলেও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তাদের কথা বলার সুযোগ সীমিত থাকে। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো দেশে শুধু প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে উত্তম কৃষিচর্চা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ওষুধশিল্পে যেমন মানসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করা হয়, তেমনি কৃষিপণ্যের পুরো সরবরাহব্যবস্থায়ও মান অনুসরণের বিষয়টি কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে, তাহলে উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
অয়ন বিশ্বাস
ম্যানেজার–সার্টিফিকেশন (নন টেক্সটাইল), কন্ট্রোল ইউনিয়ন
আন্তর্জাতিক উত্তম কৃষিচর্চা ও বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা—দুটি একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। উভয় ক্ষেত্রেই ট্রেসেবিলিটি, রেকর্ড সংরক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও মানসম্মত উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখন থেকেই এমনভাবে বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চাকে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করতে পারে। এই সমন্বয় করা গেলে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের সরবরাহব্যবস্থার জন্যও এটি বড় অবদান রাখবে।
সার্টিফিকেশন পুরো প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। আমরা মাঠে গিয়ে শুধু যাচাই করি, কৃষক নির্ধারিত মানদণ্ড ঠিকভাবে অনুসরণ করছেন কি না। কিন্তু এর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সঠিক নীতিমালা, বাস্তবায়ন নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের প্রস্তুত করা।
এই পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নের গুরুত্ব অনেক বেশি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজ করছে, তবে যারা উত্তম কৃষিচর্চা সনদ নিতে আগ্রহী, তাদেরও একইভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। সার্টিফিকেশন কেবল যাচাইয়ের কাজ করে, বাস্তবায়নের কাজ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ। আমি মনে করি, সার্টিফিকেশন কার্যক্রমে এই অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা দরকার। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। দেশের স্বার্থে যদি এই সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে আমরা সেই সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
উত্তম কৃষিচর্চা (GAP) বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে হবে।
উত্তম কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য ও আলাদা বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার।
ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ ও শনাক্তযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
সুষম সার, জৈব সার ও নিরাপদ বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানো।
নারী ও তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
গবেষণা, নীতি ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা আধুনিক করা প্রয়োজন।
মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল, পরিচালক, সরেজমিন উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;
নূরুন নাহার, কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ;
যাকীয়াহ্ রহমান মনি, পরিচালক, পুষ্টি ইউনিট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি);
মো. আফছার আলী, মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব), মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট;
আবু নোমান ফারুক আহমেদ, অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রেজিস্টার্ড ট্রেইনার, গ্লোবাল গ্যাপ;
এ কে ওসমান হারুনী, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-কৃষি, ঢাকাস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাস;
মাহবুবা মুনমুন, ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, পার্টনার প্রজেক্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;
মো. মোশারেফ হোসেন, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর;
বিথী খাতুন, কৃষক, স্বপ্নকুড়ি কোঅপারেটিভ, চৌগাছা, যশোর;
লাবনী খাতুন, কৃষক, বিজয়নগর কোঅপারেটিভ, সদর, যশোর;
এম নাজিম উদ্দিন, ন্যাশনাল হর্টিকালচারিস্ট ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও);
ফৌজিয়া ইয়াসমিন, পরিচালক, ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড;
দীপেশ নাগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড;
অয়ন বিশ্বাস, ম্যানেজার–সার্টিফিকেশন (নন টেক্সটাইল), কন্ট্রোল ইউনিয়ন;
এ কে এম মফিদুল ইসলাম, উপপরিচালক (রপ্তানি), উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;
মনিরুল হাসান, পলিসি হেড, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অন ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন);
আবুল কালাম আজাদ, প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, পার্টনার প্রজেক্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;
মো. আবু জাফর আল মুনছুর, উপপরিচালক (মনিটরিং), ফিল্ড সার্ভিস উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;
মো. জাহিদুল ইসলাম, উপপ্রকল্প পরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর;
মেহেদী হাসান, স্মলহোল্ডার ফার্মিং ম্যানেজার, বেয়ার ক্রপ সায়েন্স লিমিটেড।
সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।