‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ৩ মার্চ ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে
‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ৩ মার্চ ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৩ মার্চ ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি

প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

জ্বালানি খাতে বড় চ্যালেঞ্জ আছে। দীর্ঘদিন লুণ্ঠন ও দুর্নীতি হয়েছে, জবাবদিহির অভাব ছিল। আমরা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে অতীতে এসব প্রশ্ন তুলেছি। এখন জনগণের ভোটে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকারের অংশ হিসেবে আমি মনে করি, প্রতিটি কাজের জবাবদিহি জনগণের কাছে নিশ্চিত করতে হবে। বাইরে থেকে জ্বালানি খাতকে যেভাবে দেখা যায়, ভেতরে এসে বাস্তবতা বোঝা ভিন্ন। তার ওপর রমজান ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট—চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।

সৌরবিদ্যুতের খরচ বেশি—এটা সত্য। আমরা অনলাইনে একটি ক্যালকুলেটর চালুর উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে গৃহস্থালি বা শিল্প—যে কেউ বিনিয়োগের ধারণা পেতে পারেন। মানসম্মত যন্ত্রপাতি নিশ্চিতের পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে মূল চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আনার পরিকল্পনা নিয়েছি।

রামপাল বা আদানি চুক্তি নিয়ে যে বিতর্ক আছে, সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে বসে বিস্তারিত বোঝার প্রক্রিয়া চলছে। যেখানে জনগণের স্বার্থ লঙ্ঘিত হয়েছে, তা চিহ্নিত করে আলোচনার মাধ্যমে স্বার্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেব—এটি আমাদের নীতিগত অবস্থান। রমজান ও বোরো মৌসুম সামনে রেখে আমরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেব না, যাতে অর্থনীতি বা জনগণের ভোগান্তি বাড়ে।

সরকার এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম কনসাইনমেন্ট দ্রুত আনার চেষ্টা চলছে, যাতে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার চ্যালেঞ্জ আছে। তাই বিকল্প উৎসে যোগাযোগ বাড়িয়েছি, যাতে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সংকট না হয়। আমি আশ্বস্ত করছি—মার্চ মাসে সংকট হবে না। এপ্রিল নিয়েও আমরা কাজ শুরু করেছি।

বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ১২৮টি কূপ খননের প্রকল্প নিয়েছি। নতুন দুটি রিগ কেনার কার্যক্রম চলছে। গৃহস্থালিতে স্মার্ট মিটার ও শিল্পে ইভিসি মিটার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিদেশ সফরের নামে প্রথাগত ভ্রমণ বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স ও দেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।

এম শামসুল আলম

জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

জনস্বার্থ ও জ্বালানি অধিকার রক্ষায় জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত নয়, মুনাফামুক্ত সেবা খাত হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও জনকর্তৃত্বের ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি দারিদ্র্য দূরীকরণ, লুণ্ঠন ও জ্বালানি অপরাধ প্রতিরোধ—এসব নিশ্চিত না করলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা সম্ভব নয়। এ জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষা অপরিহার্য।

আমাদের সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি। বহু সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করেও শতভাগ ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে। তেলের প্ল্যান্ট সচল রেখে কয়লা প্ল্যান্টের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা হয় না। স্পিডি অ্যাক্টের মাধ্যমে বহু অনিয়ম বৈধতার আবরণ পেয়েছে। বিআরসি গণশুনানিকে প্রহসনে পরিণত করেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি এখন নীতি, আইন ও চুক্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিভিন্ন তদন্তে নির্মাণ ব্যয় ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য এসেছে। এ বাস্তবতায় বিচার বিভাগের সক্রিয়তা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিআরসির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প নেই। সরকারি কাঠামো স্বার্থসংঘাতমুক্ত না হলে প্রশাসনিক সংস্কার একা যথেষ্ট নয়।

আমরা ক্যাব থেকে একাধিক আইনি উদ্যোগ নিয়েছি—বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি চ্যালেঞ্জ, স্পিডি অ্যাক্ট রহিতকরণ, বিআরসি আইন সংশোধন, পেট্রোলিয়াম মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি, ভুতুড়ে বিল ইত্যাদি বিষয়ে। এসব জনস্বার্থ মামলা নিষ্পত্তি হলে জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় সরকারের পথ সহজ হবে, ভোক্তার অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথ উন্মুক্ত হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কি সেবাদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে, নাকি মুনাফাভোগী সত্তা হিসেবে? ভোক্তার কাছ থেকে কর, ভ্যাট, মূল্য—সব নেওয়ার পর আবার মুনাফা কেন? ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা, সঞ্চিত তহবিল, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা—এসব দেখায় মূল্যকাঠামো ভোক্তাবান্ধব নয়। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যদি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বোর্ডে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে স্বার্থসংঘাত দূর হবে কীভাবে? এ ক্ষেত্রে বিচারিক হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।

ফারাহ্ কবির

কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

জ্বালানি খাতের সংকটে সাধারণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের বিদ্যুতের ব্যবহার ও খরচের সুযোগ খুব সীমিত। আর যেটুকু ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, সেটা মেটানো তাঁদের জন্য কষ্টসাধ্য। এ ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার, ক্রয়ক্ষমতা এবং প্রাপ্যতা—এই তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার গাছ লাগানোর, খাল খননের বা ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীর জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা দেখা দরকার। গ্রামাঞ্চলে নারী অন্তত পাঁচ ঘণ্টা বেশি সময় ব্যয় করেন রান্নার জন্য।

বায়ো গ্যাস, এলপিজি, বিদ্যুৎ ও উন্নত রান্নার যন্ত্রের ব্যবহার তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বড় বড় চুক্তি ও জটিল আলোচনায় তাঁরা অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু কেন সে আসতে পারবে না? সেও তো ব্যবহারকারী। এই অংশগ্রহণের জায়গায় বিশেষ করে যদি গৃহস্থালি পর্যায়ে দেখেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কিন্তু নারী বা পরিবার। তাঁদের কথা যদি শোনা যায় আমরা কিন্তু দেখতে পারব যে এই পরিবর্তনটা আনা সম্ভব হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির কর্মশক্তিতেও নারীর অংশগ্রহণ কম। বিশ্বে ২৪ শতাংশ, বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ। আমাদের যেকোনো নীতি, এমনকি ২০২৫ সালের পরিকল্পনাও জেন্ডার-রেসপন্সিভ ও বিভাজনভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে তৈরি হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীরা, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা থেকে, বস্তিতে বা ইনফরমাল বসতি এলাকায় চলে আসছেন। করাইল বস্তিতে এক ঘণ্টার রান্নার জন্য গ্যাস খরচ হয় ৫০০-৬০০ টাকা। তাদের অর্থ সীমিত, এবং সাপ্লাই ও খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই।

আমাদের অনুরোধ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিতে হবে। শক্তি সাশ্রয়ের উদ্যোগও তখন কার্যকর হবে। বর্তমানে আমরা একটি সংকটময় ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে আছি। এ অবস্থায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট মোকাবিলার জন্য পরিকল্পিত বাজেট বিনিয়োগ দরকার।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি নৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে, কোনো রূপান্তর সফল হবে না। আমাদের পরিকল্পনা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং তাদের জীবনমান উন্নত করা—এই মূল লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা উচিত।

ফরহাদ মজহার

কবি, প্রাবন্ধিক, চিন্তক

আমরা একটি বড় সংকটের দিকে এগোচ্ছি। বৈশ্বিক জ্বালানি যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। যদি আমরা সত্যিই বাজারব্যবস্থায় বিশ্বাস করতাম, তবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খাতগুলো বিকাশের সুযোগ দিতাম। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছি করপোরেট মুনাফার স্বার্থে। রাষ্ট্র ঝুঁকি নিচ্ছে, আর সেই ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। জনগণের সেবা করার কথা ছিল যে রাষ্ট্রের, সে রাষ্ট্র এখন চুক্তির মাধ্যমে করপোরেশনকে মুনাফা নিশ্চিত করছে—ক্যাপাসিটি পেমেন্ট থেকে শুরু করে নানা আইনি কাঠামো তার প্রমাণ।

জ্বালানি একটি সেবা। জনগণের গ্যাস, বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবে অনেকের চুলা জ্বলে না, সংকট বাড়ছে। আমরা নবায়নযোগ্য সম্ভাবনাকে অবহেলা করেছি। কৃষি, বায়োগ্যাস, ঐতিহ্যগত জ্বালানি—এসব ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিইনি। উন্নয়নকৌশল এমনভাবে নেওয়া হয়েছে, যা আমাদের নিজস্ব পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকেই দুর্বল করেছে। ভবিষ্যতে আমরা টিকে থাকতে পারব কি না, সেই উদ্বেগও আমি অস্বীকার করি না।

আদানির মতো চুক্তি বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি—এসবের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র একবার বাধ্যবাধকতা নিলে তা থেকে বের হওয়া সহজ নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে কেবল আইনি বা কারিগরি সক্ষমতা যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের চরিত্র না বদলালে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। আমরা যদি সেবাভিত্তিক রাষ্ট্র চাই, তবে ঝুঁকি জনগণের নয়, মুনাফাভোগীর হওয়া উচিত। প্রতিযোগিতার কথা বলি, কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে মুনাফা নিশ্চিত করি—এ দ্বৈততা বন্ধ করতে হবে।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নামে জনগণকে সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা যাবে না। গণসার্বভৌমত্বই মুখ্য—জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ আইন পাস করেছে বলেই তা চূড়ান্ত নয়, যদি জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। জ্বালানি–সংকট এমন এক ক্ষেত্র, যা সবার জীবন ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

আমি আশা করি, সরকার অন্তত জ্বালানি খাতকে লুটপাটের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে এখানে সংস্কারের উদ্যোগ নেবে। আমার প্রত্যাশা একটাই—জনগণের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। জনগণ শুধু ভোটার নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। রাষ্ট্র যদি করপোরেশনের কাছে বন্দী থাকে, তবে মুক্তির পথ কঠিন। কিন্তু আলোচনা, সচেতনতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে অন্তত সংকটের ভেতরেও আমরা একটি বিকল্প পথ নির্মাণের চেষ্টা করতে পারি।

আতিকুর রহমান মুজাহিদ

সংসদ সদস্য, কুড়িগ্রাম ২

বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের দেশ দুই মাসের রিজার্ভের ওপর নির্ভরশীল। তেল ও গ্যাসের মজুত যথেষ্ট নয়; গ্যাসের স্টক
৬০ দিন, তেলের ৪৫ দিন। অর্থাৎ যদি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটে, দেশ অন্ধকারে পড়তে পারে। তাই আমাদের দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য বাংলাদেশকে শক্তিশালী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতা জ্বালানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্টক ম্যানেজমেন্ট, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় বাজেটের ব্যবহারও সঠিকভাবে হয় না। দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। পেট্রোলিয়াম ও জ্বালানি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মতামত সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও প্রজেক্টকে সরকারি নীতির সঙ্গে সংযুক্ত করা হলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করে দেশের সেবা করতে সক্ষম হবে। এ জন্য দরকার সরকারি দল, বিরোধী দল ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত কার্যক্রম।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বলতে আমরা মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা বুঝি। যদি এটি নিশ্চিত না করা হয়, কোনো দেশই সুরক্ষিত থাকবে না। বর্তমানে ট্রিটি ও চুক্তি, স্টক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশে অস্বচ্ছ, যা জনগণের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি খাতের সংস্কার কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি রাজনৈতিক ইচ্ছা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্টক, রিজার্ভ ও লজিস্টিক সিস্টেম দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত হতে হবে, যাতে জনগণ হঠাৎ সাপ্লাই কমে যাওয়ার কারণে সমস্যায় না পড়ে।

শুধু আলোচনা নয়, হাতে–কলমে বাস্তবায়ন ও ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা দরকার। জ্বালানি খাতের সংস্কার, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

মনীষা চক্রবর্তী

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আমাদের চিন্তিত করেছে, কারণ আমরা অত্যধিক আমদানিনির্ভর। এলপিজি সৌদি আরব থেকে, এলএনজি কাতার ও ওমান থেকে আসে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে সরবরাহে সমস্যা হবে।

আমরা গ্যাস উত্তোলন ও কূপ খননের জন্য ফান্ড ব্যবহার না করে আমদানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছি। পেট্রোবাংলার সংরক্ষিত অর্থ জনগণের, কিন্তু তা বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে। ভোলায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে। বাপেক্স কূপগুলো আবিষ্কার করলেও গ্যাসপ্রম প্রথমে উত্তোলনের সুযোগ নেয়নি, পরে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে দেয়। এভাবেই একদিকে আমদানিনির্ভরতা বাড়ে, অন্যদিকে দেশীয় সক্ষমতা তৈরি হয় না। এ কারণেই ৫৫ বছরেও বাংলাদেশ জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

পেট্রোলিয়াম ও খনি প্রকৌশল বাংলাদেশে ২০০৪ সালে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্স আছে, তবে বুয়েটে শুধু মাস্টার্স। এভাবে দক্ষতা তৈরি করা অনেক সময়সাপেক্ষ। নতুন সরকারকে এ সক্ষমতা গড়ার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও জ্বালানিতে মাত্র দেড় হাজার কোটি। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট, চাহিদা ১৬ থেকে ১৮ হাজার। তবে নির্ভরতার কারণে সম্পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার হয় না। ভোলায় পাইপলাইন এখনো সম্পূর্ণ সংযুক্ত নয়।

কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে মানুষকে অতিরিক্ত খরচে বাধ্য করা হয়েছে। রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি দায়মুক্ত, যা লুণ্ঠনে সহায়ক। নতুন সরকার যদি আমদানিনির্ভরতা, দুর্নীতি ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ না নেয়, মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না।

আমরা চাই বাংলাদেশ স্বনির্ভর ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। সক্ষমতা অর্জন ও নির্ভরতা কমাতে হবে। এই সরকারের ভূমিকা হবে নীতিগত সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু আয় প্রায় ৯২ হাজার ডলার হলেও সেখানে গৃহস্থালি বিদ্যুতের মূল্য প্রতি কিলোওয়াট ১৫ সেন্ট। চীনের মাথাপিছু আয় প্রায় ১৪ হাজার ডলার, বিদ্যুতের মূল্য ৭ দশমিক ৭ সেন্ট; নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলার, বিদ্যুতের মূল্য ১৩ সেন্ট; বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ৩ হাজার ডলার, বিদ্যুতের মূল্য ৬ দশমিক ২ সেন্ট এবং পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭০০ ডলার বা তার চেয়ে কম, বিদ্যুতের মূল্য ৬ দশমিক ৫ সেন্ট।

আবার করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার বিশ্বে অবস্থান ১৩৫ থেকে ১৫০–এর মধ্যে, অর্থাৎ দুর্নীতি প্রতিরোধের সক্ষমতায় এই দেশগুলো একদম তলানিতে। আবার চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যথাক্রমে ৭৬তম ও ২৮তম। তার মানে হলো মাথাপিছু আয় এবং দুর্নীতিগ্রস্তের বিবেচনায় যেসব দেশে সাধারণত দুর্নীতি বেশি, সেখানে গৃহস্থালির প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের মূ্ল্যও বেশি।

এটা দাবি করা যায় যে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা একধরনের জবাবদিহিবিহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, গোষ্ঠীতান্ত্রিক ও শাসকগোষ্ঠী দ্বারা কুক্ষিগত হওয়ার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের ক্রয় চুক্তি, আদানির চুক্তি, স্পিডি অ্যাক্ট ২০১০—এসবই নির্দেশ করে যে রাষ্ট্রশাসনে থাকা রাজনীতিবিদ-আমলা-ব্যবসায়ী-দাতাগোষ্ঠী-দেশি-বিদেশি মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের মুনাফাকেন্দ্রিক জনগণের স্বার্থবিরোধী কাঠামোগত লুণ্ঠনের বন্ধন বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় যে আদানির সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ৯০ দিনের সহজ এক্সিট ক্লজ নেই। শুধু টানা ৯০ দিন আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ না পেলে বাংলাদেশ চুক্তিটি বাতিল করার আবেদন জানাতে পারে! আবার অন্য আমদানি করা বিদ্যুতের চেয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য গড়ে চার থেকে পাঁচ ডলারের বেশি। এ কারণে প্রতিবছর আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি খরচ হচ্ছে।

শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা সমাধান সহজ নয়। জনচাপ, বিচারিক সক্রিয়তা বা জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজম ও আইনি লড়াই অব্যাহত রাখা জরুরি।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

ক্যাব জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪ প্রণয়ন করেছে, কিন্তু বিগত সরকার তা গ্রাহ্য করেনি। দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে কোনো সর্বজনীন জ্বালানি নীতি ছিল না। মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে সাময়িক নির্দেশনা থাকলেও সেগুলোকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এর ফলে কোনো নীতি না থাকায় দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান স্টেলমেট অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আইনগত পর্যবেক্ষণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজন। গৃহস্থালি বিদ্যুতের খরচ, নাগরিকদের মালিকানা ও জাস্ট ট্রানজিশনের ধারণা এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোর মধ্যে বৈধতা দেওয়া অপরিহার্য।

বিদ্যমান এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩-এর আওতায় দুর্বল সংগঠনটি চলছে। প্রধান নিয়োগে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আছে—যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা নিজস্ব জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার বাইরে প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন, কখনো আমলাতন্ত্রে, কখনো আবেদনকারীর অবস্থায়। ফলে এক সম্পূর্ণ জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারেই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; আইনগুলো অনেক সময় অলিগার্কদের স্বার্থ রক্ষা করে।

উদাহরণ হিসেবে এলপিজি মূল্য নির্ধারণ উল্লেখযোগ্য। বিআরসি ১৬ বছর মূল্য নির্ধারণ করেনি। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও প্রয়োগ হয়নি। অবশেষে ২০১৬ সালে পাবলিক হেয়ারিংয়ের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ শুরু হয়, তবে আজও প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়।

ক্যাবের উদ্যোগে বিভিন্ন মামলা আদালতে গেছে যাতে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা যায়। প্রতিষ্ঠান মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করবে। বড়পুকুরিয়া কয়লা উত্তোলনে চুরি ও অনিয়ম দেখিয়েছে, কৌশলগতভাবে পানি মেশানো হয়েছে, যা সরকারের অর্থের অপচয়। এই কাঠামোগত লুণ্ঠন রোধ করতে আইনি হস্তক্ষেপ ও জনগণকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া জরুরি।

আইনগত হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছ নীতি, সক্ষম প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে খাতটি জনকল্যাণমূলক ও স্বনির্ভর হয়ে দাঁড়ায়।

নাজিফা তাজনূর

সদস্য, ক্যাব যুব সংসদ

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব আমরা দেখেছি, তার অন্যতম মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে ন্যায্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আমরা নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিলাম। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

আমাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো জ্বালানি খাতকে একটি বাণিজ্যিক খাত থেকে সরিয়ে পুনরায় ‘সেবা খাত’ হিসেবে ঘোষণা করা। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে পরিচালিত সরকারি সেবা কোনোভাবেই মুনাফামুখী হতে পারে না। আমরা চাই সরকার ‘কস্ট প্লাস’ নয়, বরং ‘কস্টভিত্তিক’ মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করুক।

নতুন সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি জ্বালানি খাতে যারা লুণ্ঠন ও দুর্নীতি করেছে, তাদের কেবল অপসারিত করলেই হবে না, বরং তাদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও অতিরিক্ত মুনাফা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য কমিয়ে আনতে হবে।

সাদমান সাকিব খান

সদস্য, ক্যাব যুব সংসদ

দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, আমরা তাদের কাছে প্রত্যাশা করি অনেক। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিশ্চিত করার যে লক্ষ্যমাত্রা আমরা দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বিএনপি তাদের ৩১ দফায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে অঙ্গীকার করেছিল, এখন তার প্রতিফলন দেখার সময় এসেছে।

ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। আমরা চাই সরকার এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চেয়ে দেশি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করুক। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ অন্য খাতে অপচয় না করে বাপেক্সসহ দেশি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করা এবং ক্যাব প্রস্তাবিত ‘জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪’ বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।

তরুণ প্রজন্ম একটি পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার অপেক্ষায় আছে, যেখানে জনগণের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

মিজানুর রহমান

সাংগঠনিক সম্পাদক, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তাঁরা এলাকার উন্নয়ন ও প্রকল্পে বেশি মনোযোগ দেন। ফলে অনেক আইন এমনভাবে প্রণয়ন বা সংশোধিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

প্রশাসনিক সংস্কার একা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আইন ও নীতিমালার কাঠামোতে দীর্ঘদিনের অসংগতি এবং অনিয়মের কারণে গৃহীত উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছে না। এ জন্য সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের সময় আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ক্যাব ও অন্যান্য সংগঠনের পক্ষে আমরা আশা করি, সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন ও সংশোধনে আরও দায়িত্বশীল হবেন, যাতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয়, প্রশাসনিক জটিলতা কমে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সম্ভব হয়।

আজকের এই আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে আমরা অনুপ্রাণিত। আশা করি, সরকারের সঙ্গে আমাদের সংলাপ অব্যাহত থাকবে এবং আমরা একসঙ্গে জনগণের স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারব।

ক্যাবের ১৩ দফা

  • বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে পুনরায় সেবা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ কস্ট প্লাস নয় কস্টভিত্তিক নিশ্চিত করা।

  • জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি গড়ে আগামী সরকারের ৫ বছর মেয়াদে কমপক্ষে ৫% কমানো নিশ্চিত করা।

  • সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত বৃদ্ধি দ্বারা ওই ৫ বছরে গড়ে ১৫% বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি।

  • এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রহিত করা এবং কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা।

  • গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানি দ্বারা শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা।

  • গণশুনানির ভিত্তিতে ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা/দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত গ্যাস ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা।

  • আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করানো এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি রদ নিশ্চিত করা।

  • ক্যাবের দায়েরকৃত স্পিডি অ্যাক্ট ২০১০ রহিতকরণ অধ্যাদেশ ২০২৪ সংক্রান্ত রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে এই আইনের আওতায় সম্পাদিত সব চুক্তি ও লাইসেন্স বাতিলসহ সব ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা।

  • ওই সব চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় নিশ্চিত করা।

  • জ্বালানি খাতসংশিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার নিশ্চিত করা।

  • লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো।

  • বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত ক্যাবের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসির আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

  • আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।

অংশগ্রহণকারী

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি

প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়

এম শামসুল আলম

জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

ফরহাদ মজহার

কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তক

ফারাহ্‌ কবির

কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

আতিকুর রহমান মুজাহিদ

সংসদ সদস্য, কুড়িগ্রাম ২

মনীষা চক্রবর্তী

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাসদ

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

মিজানুর রহমান

সাংগঠনিক সম্পাদক, ক্যাব

হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া

সাধারণ সম্পাদক, ক্যাব

শুভ কিবরিয়া

গবেষণা সমন্বয়ক, ক্যাব

নাজিফা তাজনূর

সদস্য, ক্যাব যুব সংসদ

সাদমান সাকিব খান

সদস্য, ক্যাব যুব সংসদ

 

সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো