‘নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
‘নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন

বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ৫ মে ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

অংশগ্রহণকারী

মো. নুরুল হক এমপি, প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম, যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (অর্থ ও বাজেট), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড; সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, বিলস; রাজেকুজ্জামান রতন, সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট; ফারজানা শাহনাজ, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, রি-ইন্ট্রিগেশন, লেবার মোবিলিটি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন, আইওএম; নু–এমং মারমা মং, উপব্যবস্থাপক (বৈদেশিক নিয়োগ), বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড; রাহনুমা সালাম খান, সিনিয়র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও); শারমিন ইসলাম, জেন্ডার এক্সপার্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ; এস কে মজিবুল হক, পরিচালক, বিএনএসকে; জাছিয়া খাতুন, পরিচালক, ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন; মেরিনা সুলতানা, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, রামরু; লিপি রহমান, নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ; মো. হারুন–অর–রশীদ, প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, ব্র্যাক; ফারিহা জেসমিন, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ; শেখ রোমানা, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন; মাহমুদা সুলতানা, সাধারণ সম্পাদক, অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশন; আসিফ মুনীর, অভিবাসন বিশেষজ্ঞ; মোছা. মরিয়ম, সভানেত্রী, অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশন; এবিএম ফরহাদ আল করিম, জেলা প্রকল্প সহযোগী, ইউনাইটেড ন্যাশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড; শাহাজাদী বেগম, উন্নয়ন অধিকারকর্মী। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

আলোচনা

মো. নুরুল হক এমপি

প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

অভিবাসনের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা বেশি ঘটে। আগে আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল, এখন কিছু দেশের সঙ্গে চুক্তির ফলে মামলা, ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়া, কোরিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার, সিন্ডিকেট, পরীক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় নানা সমস্যা আছে। কোথাও কোথাও অনিয়ম ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগও আসে। আমরা চাই এগুলো কমাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে।

একই ধরনের প্রশিক্ষণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে হচ্ছে—এটা সমন্বয় করা দরকার। যারাই প্রশিক্ষণ দিক, এটাকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। যাতে প্রশিক্ষণগুলো কার্যকর হয়।

কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোও (টিটিসি) আধুনিকরণে মনোযোগ দেওয়া হবে। প্রবাসী কল্যাণে অনলাইন সেবা চালু হয়েছে, যাতে ধীরে ধীরে দালাল–নির্ভরতা কমে এবং মানুষ সহজে সেবা পায়।

নারী শ্রমিকদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো, বিদেশে তাঁদের সুরক্ষায় আইনি ফার্ম নিয়োগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং–সুবিধা নিশ্চিত ও বিদেশফেরত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে।

বিদেশ গমনে ইচ্ছুক নারীদের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে জেলা পর্যায়ে জনশক্তি অফিস, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং ওয়েলফেয়ার সেন্টারগুলোকে একই ভবনে নিয়ে এসে ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু, প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু, আদর্শ অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ, ভালো রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে চিহ্নিত করতে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হবে।

ড. এ টি এম মাহবুব-উল করিম

যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (অর্থ ও বাজেট), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড

ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর থেকেই একজন নারী বা পুরুষ কর্মীর পুরো কল্যাণের দায়িত্ব ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড গ্রহণ করে। এমনকি দেশে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও আমাদের সহায়তার আওতায় থাকেন। বিদেশে পৌঁছানোর পর সেখানে কেউ অসুস্থ হলে, জেলে গেলে বা বিপদে পড়লে আমাদের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়।

নথিভুক্ত বা নথিবিহীন—সবাই ৪০০ টাকা দিয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হতে পারেন। দেশে ফেরার এক বছরের মধ্যে অসুস্থতার কারণে আবেদন করলে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এককালীন সহায়তা দেওয়া হয়। এক পরিবারে সর্বোচ্চ দুজন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ সাত বছর ভাতা দেওয়া হয়।

বিদেশে আহত হলে বা অঙ্গহানি হলে ৫০০ টাকা প্রিমিয়ামের বিপরীতে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়। জীবনবিমার আওতায় এক হাজার টাকার পাঁচ বছরের পলিসিও রয়েছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা দিয়ে মেম্বারশিপ থাকলে বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে মরদেহ দেশে এনে দাফন ও পরিবহন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অতিরিক্ত তিন লাখ টাকা ওয়ারিশদের দেওয়া হয়, আর বিমা থাকলে আরও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। বিদেশি পাওনা আদায়ে ১২টি দেশে ২২টি ল ফার্মের মাধ্যমে সহায়তা করা হয়।

রিইন্টিগ্রেশন নীতির আওতায় এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নারীদের মধ্যে ৩৩ জন ড্রাইভিংয়ে আরপিএল সম্পন্ন করেছেন। শুধু গার্মেন্টস বা কেয়ারগিভিং নয়, কনস্ট্রাকশন, ইলেকট্রিক ও ওয়েল্ডিং খাতে নারীদের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিন থেকে ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিলে দক্ষ হয়ে বিদেশে যাওয়া সম্ভব।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক, বিলস

এখনই সময় অভিবাসন ও অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক নীতিকাঠামো তৈরি করার। সবাই মিলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা নির্ধারণ করা যেতে পারে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে ও জবাবদিহির জায়গা তৈরি করতে হবে।

সরকারের নিবাচনী ইশতেহারে সংস্কারের একটি বড় জায়গা আছে। ফলে শ্রম সংস্কার কমিশনের অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের টিম যে সুপারিশ দিয়েছে সেটি বিবেচনায় নিয়ে মৌলিক সংস্কারের পথে অগ্রসর হওয়া যায়। এর মাধ্যমে সরকারের জন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং জবাবদিহিতার কাঠামোও স্পষ্ট হবে।

শ্রমিকদের মর্যাদার বিষয়টি আগে ততটা গুরুত্ব পেত না। শুধু নিরাপত্তা, মজুরি বা খরচ কমানোর কথাই বেশি বলা হতো। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, মর্যাদা হারানোর বিষয়টি মূল সমস্যা। আমরা যদি বাজারে যাওয়ার আগে দর–কষাকষির মাধ্যমে মূল্য কমানোর প্রবণতা বন্ধ না করি, এবং রাষ্ট্র যদি ন্যূনতম মানদণ্ড ঠিক না করে, তাহলে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কঠিন।

নেপালেও গৃহকর্মীদের জন্য আবাসন, পরিবহন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে সরকার। এতে শ্রমিকেরা বুঝেছে যে তাদের পাশে রাষ্ট্র আছে, ফলে নির্যাতনও কমেছে। ঢাকায়ও যদি গৃহকর্মীদের রেজিস্ট্রেশন শুরু করা যায়, তাহলে পরিবর্তন আসবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংগঠিত হওয়ার অধিকার। অভিবাসী শ্রমিকেরা দেশে ফিরে অনেক সময় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই অভিবাসী শ্রমিকদের আইনেই সংগঠন করার, প্রতিনিধিত্ব করার এবং কমিটিতে অংশ নেওয়ার অধিকার থাকা দরকার। এতে তারা নিজেদের কথা বলতে পারবে, একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হবে এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাও বাড়বে।

রাজেকুজ্জামান রতন

সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে। আমরা এত দিন অভিবাসন ব্যয়, হয়রানি বা দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু এখন কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এই কাজের রূপান্তর অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রস্তুত করা জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কত দিন শুধু গৃহকর্মী সরবরাহকারী দেশ হয়ে থাকব? কেয়ারগিভারসহ স্বাস্থ্যসেবা, হসপিটালিটি ও অন্যান্য নতুন খাতে প্রবেশের জন্য এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শ্রমবাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী এক বছরে কোন ধরনের নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়বে, সেই বিষয়ে আগাম বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাঝুঁকি ও নিপীড়নের মাত্রা বাড়তে পারে, তাই সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। নারীরা কষ্ট করে আয় করলেও অনেক সময় সেই অর্থ তাঁদের নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, ফলে তাঁরা দেশে ফিরে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। তাই উপার্জিত টাকার ওপর নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি; এ ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা তাঁদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।

অভিবাসন ব্যয় কমাতে রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্টের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের জন্য বিনিয়োগ সুরক্ষা, ছোট ব্যবসায় সহায়তা, কার্যকর ডেটাবেজ, থানাভিত্তিক সহায়তা ডেস্ক এবং হয়রানি থেকে রক্ষা ব্যবস্থা দরকার। কাজের পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রশিক্ষণ, আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

ফারজানা শাহনাজ

ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, রি-ইন্ট্রিগেশন, লেবার মোবিলিটি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন, আইওএম

অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা শুধু তাঁদের গন্তব্য দেশে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো প্রক্রিয়ায় তা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা অভিবাসনের পুরো চক্র ধরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে। সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও অভিবাসী কমিউনিটির সঙ্গে আমরা সরাসরি কাজ করি।

সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ তথ্য পেতে দালালের ওপর নির্ভর করে। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, বিএমইটির জেলা অফিসগুলোকে গ্রাম পর্যায়ে তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

ইতালির সরকারের অর্থায়নে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউডিসি সরকারের প্রান্তিক পর্যায়ের সেবাকেন্দ্র, এর মাধ্যমে অভিবাসনের আগের প্রস্তুতি বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষকে বুঝতে হবে—বিদেশ যেতে কত খরচ হবে, কত আয় হবে, কত দিন থাকবে আর শেষ পর্যন্ত লাভ কী থাকবে। কারণ, অনেক সময় বেশি খরচে ঋণ করে যাওয়া হয় আর আয় প্রায় ঋণ পরিশোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। তাই রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। সরকার যে প্রি–ডিপারচার মডিউল চালু করেছে, তা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

এ ছাড়া অভিবাসনের শুরু থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত মনিটরিং শক্তিশালী করা; নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নু-এমং মারমা মং

উপব্যবস্থাপক (বৈদেশিক নিয়োগ)

বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড

বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) ১৯৮৪ সাল থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। আমাদের মূল কাজ হলো নৈতিক, নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিত করা।

প্রক্রিয়াটি শুরু হয় যখন সরকার টু সরকার চুক্তি হয় বা নিয়োগকর্তা যখন আমাদের মাধ্যমে লোক নিয়োগের দায়িত্ব দেন। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাহিদা পাওয়া পর বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত লেবার উইংয়ের কর্মকর্তারা সেটি যাচাই করেন। সবকিছু সন্তোষজনক হলে সেই তথ্য বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়, যেখানে নিয়োগকর্তা বা তাঁদের স্থানীয় প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। পরীক্ষার পর বিদেশ যাওয়ার সব আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা সহায়তা করি।

২০১০ সাল থেকে আমরা জর্ডানের গার্মেন্টস খাতে নারী কর্মী পাঠাচ্ছি সম্পূর্ণ বিনা খরচে। মেডিক্যাল, প্রি–ডিপারচার ট্রেনিং থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে যাওয়া পর্যন্ত সব দায়িত্ব আমাদের কর্মকর্তারা পালন করেন।

বোয়েসেলের মাধ্যমে যাঁরা যান, তাঁদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে জর্ডানের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে করা হয়। আমরা তাঁদের প্রি-ডিপারচার ট্রেনিং দিই, যেখানে মালিকের সঙ্গে আচরণ, জরুরি যোগাযোগ, এমনকি বিমানযাত্রার নিয়ম পর্যন্ত শেখানো হয়। এতে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বিদেশ যান এবং অনেকে সফলভাবে দেশে ফিরে আবারও বিদেশে যান।

রাহনুমা সালাম খান

সিনিয়র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বিদেশে শ্রমিকদের ন্যায্য নিয়োগ ও মানসম্মত ও নিরাপদ কাজ নিশ্চিতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা তৈরিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক মান ও অধিকারভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা যায়।

সরকার ২০২৫ সালের এক নীতিমালায় অভিবাসন ব্যয় কমাতে রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্টের দায়িত্ব ও জবাবদিহি কী হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো এই বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ শুরু হয়নি।

দেশের ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি) নিয়ে একটি মূল্যায়নে দেখা গেছে, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীন টিটিসিগুলোর প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই টিটিসি ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার।

নারীদের জন্য আলাদা টিটিসি থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। ২০১৬ সালের নীতিতে বলা হয়েছিল শ্রম অধিকার সুরক্ষিত হয় এমন নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের কোনো ধরনের স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যেন সব ক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদনশীল মানসিকতার মাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

শারমিন ইসলাম

জেন্ডার এক্সপার্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ

একজন নারী যখন প্রথমবার দেশের বাইরে যান, তখন তাঁর যাত্রাটা শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, একই সঙ্গে মানসিক ও সামাজিক বড় ট্রমার অভিজ্ঞতা। এই যাত্রার বিভিন্ন ধাপে তাঁকে হয়রানি ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।

বিমানবন্দরে প্রায়ই দেখা যায়, নারী শ্রমিকেরা বিভ্রান্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের করণীয় সম্পর্কে ধারণা থাকে না। একই সমস্যা পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও হয়। তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন মানুষকে বিদেশে পাঠানো হয়, এই সময়ের মধ্যে ভাষা শেখা, সংস্কৃতি বোঝা বা কাজের বাস্তব দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়।

বিদেশে কাজের ধরনও এখন পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে শুধু গৃহকর্মী বা কেয়ারগিভার নয়, বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের দক্ষতা প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকদের সেই প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে দেওয়া হয় না।

বিদেশে কাজ শেষে ফিরে আসার পর তাঁদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক হয়, তাঁরা সামাজিক কুসংস্কার ও অবমূল্যায়নের শিকার হন। পরিবারের মধ্যেও তাঁকে ভুলভাবে দেখা হয়, যা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র যদি শ্রমিকদের সম্মান দেয়, তাহলে সমাজও তা অনুসরণ করবে। তাই তাঁদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

এস কে মজিবুল হক

পরিচালক, বিএনএসকে

অভিবাসনে আগ্রহী নারীরা সঠিকভাবে সহায়তার অভাবে বিদেশে কাজের জায়গা তৈরি করতে পারেন না। অধিকাংশ নারী শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টার বদলে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ফিলিপাইনের নারীরা হলে নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতেন না, উপরন্তু প্রতিবাদ করতেন, যা আমরা পারি না। যদি জায়গাগুলোতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব দেশে আমরা কর্মী পাঠাই সেই দেশের প্রবাসী কমিউনিটিকে যুক্ত করতে পারি। তাদের মাধ্যমে মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে ঘরের ভেতরে থাকা নারী কর্মীদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে মনিটর না করা হয় তাহলে দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্টদের ভুয়া প্রচারণায় কেউ ফাঁদে পড়বে না। নারী অভিবাসী কর্মীদের সেবাব্যবস্থাকে কমিউনিটি, সরকারি সব পর্যায়েই নারীবান্ধব করা দরকার। বিএমইটির অন্য সেবাকেন্দ্রগুলোতে সেবা থাকলেও তা আরও নারীবান্ধব হতে হবে। ডেমো অফিস, টিটিসি ও প্রবাসী কল্যাণ কেন্দ্রে নারীরা এসে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না তাই সেসব জায়গায় নারীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

জাছিয়া খাতুন

পরিচালক, ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৮ বছরে প্রায় ৭৯৯ থেকে ৮০০ জন নারী অভিবাসী মৃত্যুবরণ করে দেশে ফিরেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলা হয় হার্ট অ্যাটাক বা শারীরিক অসুস্থতা, কখনো আত্মহত্যা। কিন্তু সঠিক কারণটি আমরা জানি না। প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা রাষ্ট্রের অধিকার ও দায়িত্ব।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কর্মরত থাকলেও গত কয়েক বছরে নারী অভিবাসনের সংখ্যা কমেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায়, নতুন শ্রমবাজারের ঘাটতি ও নারীবান্ধব কাজের পরিবেশ অপ্রতুল। পাশাপাশি শারীরিক, মানসিক, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনাও রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যেসব কর্মী যাচ্ছেন, সেখানে নিয়োগদাতাদের তালিকা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মাধ্যমে কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ নিয়োগদাতাদের কালো তালিকাভুক্ত করে নারীদের সেখানে পাঠানো বন্ধ করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও এই সুরক্ষা জোরালোভাবে আনতে বর্তমানে মৃত্যু বা স্থায়ী ক্ষতির ক্ষতিপূরণ থাকলেও জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার জন্য ইনস্যুরেন্সর ব্যবস্থা করতে হবে।

মেরিনা সুলতানা

প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, রামরু

বর্তমানে মোট অভিবাসনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ নারী কর্মী যাচ্ছেন। কিন্তু বারবারই দেখা যাচ্ছে, নারীরা সুরক্ষার বাইরে থাকছেন। আমার দৃষ্টিতে এটি কেবল ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিষয় নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও যুক্ত।

নারীর মর্যাদা ও কর্মক্ষেত্রে তাঁর সম্মান নিশ্চিত না হলে নিরাপদ অভিবাসন সম্ভব নয়। আমরা এখনো নারীকে শুধু শ্রমিক হিসেবে দেখি। এ কারণেই হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো বাজার ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কেয়ারগিভারের মতো নতুন বাজার তৈরি করতেও ব্যর্থ হচ্ছি।

রামরুর পক্ষ থেকে আমরা সাব–এজেন্ট রেগুলেশন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমরা সরকারকে সহায়তা করে নিয়ম প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছি, যা পরে আইনগতভাবে সাব–এজেন্টদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এখনো এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থার উন্নয়নেও আমরা কাজ করেছি, যাতে বিএমইটির সালিশি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয়। কারণ, নারীরাই এখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

সাব–এজেন্ট ব্যবস্থার বাস্তবায়ন ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থার কার্যকারিতা যেন গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিং, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নারীর সুরক্ষায় আমরা অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগোতে পারব।

লিপি রহমান

নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ

আমাদের সংগঠন ‘বাদাবন সংঘ’ নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করি। আমাদের যাত্রা শুরু ২০১৬ সালে। বাদাবন নামটি সুন্দরবন থেকে নেওয়া, স্থানীয়ভাবে যাকে ‘বাদাবন’ বলা হয়। প্রথমে আমরা নারীদের ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করি, পরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীদের অধিকার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নিয়ে কাজ করি। ২০১৬ সালে শুরু করলেও আমরা ২০১৮-১৯ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হই। তখন আমরা নারী অভিবাসী শ্রমিকদের পুনঃএকত্রীকরণ নিয়ে একটি গবেষণামূলক কাজ পাই। সেখানে কাজ করতে গিয়ে আমাদের আগ্রহ আরও বাড়ে। শুধু নারী নয়, সব অভিবাসী শ্রমিকই অধিকার থেকে বঞ্চিত।

আমাদের সংগঠন ছয়টি বিষয়ে কাজ করে, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার। ২০২০ সালে ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় কোভিডের সময় দেশে ফেরা নারী শ্রমিকদের নিয়ে কেরানীগঞ্জে কাজ করি।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ সালে ছয় জেলায় নারী নেতৃত্বে ফোরাম গঠন করি—কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও পাবনায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বড় পরিসরে ফোরাম গঠন করি এবং নিয়মিত অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো শুনি। আমরা চাই এই কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি হোক।

মো. হারুন–অর–রশীদ

প্রোগ্রাম কো অর্ডিনেটর, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, ব্র্যাক

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অভিবাসন বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলতে চাই আর তা হলো অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার। নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারলে রাষ্ট্রের মর্যাদাও বাড়ে। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকরা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, তাদের মর্যাদা রক্ষায় সেবা ও সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হয়। শুধু রেমিট্যান্স বা সংখ্যার দিকে তাকালে প্রকৃত সুরক্ষা হারিয়ে যায়।

আমাদের ৪২টি দেশের কাজের অভিজ্ঞতায় দেখি, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছে। তারা প্রয়োজনে শ্রমিক পাঠানোও বন্ধ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় যেতে পারেনি। অভিবাসনসংক্রান্ত অনেক ধরনের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।

আমরা এখনো দুর্বল ডেটাবেজ, কম প্রশিক্ষণ ও অনিয়মপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে শ্রমিক পাঠাই। ফলে মর্যাদাপূর্ণ মাইগ্রেশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এখন সময় এসেছে শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, দক্ষতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন নীতি গড়ার।

ফারিহা জেসমিন

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ

অভিবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং এই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ গত দুই দশকে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে গৃহভিত্তিক সেবা এবং নিম্ন ও মধ্যদক্ষতার শ্রমচাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশি নারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১০ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি নারী বিদেশে গেছেন এবং এ প্রবণতা এখনো ঊর্ধ্বমুখী।

বাদাবন সংঘের ২০২৫ সালের গবেষণায় উঠে আসে, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা ও পাবনায় ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী কোনো আয়ের উৎস ছাড়াই অভিবাসনে গেছেন, যা বাধ্যতামূলক অভিবাসন নির্দেশ করে। অনেক নারী উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন বা সম্পদ বিক্রি করেছেন, ফলে ঋণনির্ভর চক্র তৈরি হয়েছে। বিদেশে তাঁরা কম বেতন, পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ হারানো, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও নির্যাতনের শিকার হন।

সরকার কিছু উদ্যোগ নিলেও কাফালা ব্যবস্থা, দালাল সিন্ডিকেট ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে ঝুঁকি রয়ে গেছে। তাই কাফালা সংস্কার, ডিজিটাল মজুরি সুরক্ষা, দ্রুত শ্রম আদালত, নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন নীতি জরুরি।

শেখ রোমানা

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন

অনেক উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রয়োগের সময় নারী অভিবাসী বা পুরুষ অভিবাসী কারও ক্ষেত্রেই কোনো পদক্ষেপ ঠিকভাবে কার্যকর হয় না। তাঁরা দেশে ও বিদেশে নির্যাতনের শিকার হন, এমনকি দেশে ফিরে এসেও সেই নির্যাতনের ছাপ বহন করেন। বিদেশফেরত অভিবাসীদের জন্য পুনর্বাসনসহায়তা থাকলেও কতজন সত্যিকারে পুনর্বাসন পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় ২ হাজার ২০০ এজেন্সির মধ্যে ১ হাজার ১০০টি বৈধ হলেও এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট এখনো বাস্তব হয়নি।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আমরা তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক করি, প্রি-ডিপারচার ট্রেনিং দিই; যেখানে টাকা রাখা, দুটি অ্যাকাউন্ট খোলা—এসব শেখাই। আমাদের লক্ষ্য, ফিরে আসা কর্মীরা যেন অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

আমাদের অনেক বোন বিদেশে নির্যাতিত হয়ে সন্তানসহ দেশে ফেরেন। সেই সন্তানের দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। দূতাবাসে জনবল কম, তাই শক্ত মনিটরিং দরকার। সময় এসেছে এই খাতকে সত্যিকারের নিরাপদ ও মানসম্মত করার।

মাহমুদা সুলতানা

সাধারণ সম্পাদক, অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশন

আমরা অনেকেই নিজের ইচ্ছায় বিদেশে যাই না। পারিবারিক চাপ বা পরিস্থিতির কারণে শ্রমিক হিসেবে যেতে বাধ্য হই। ফলে মানসিক প্রস্তুতি কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ—কিছুই আমাদের থাকে না। বিদেশগমনের আগে জেলা কর্মসংস্থান অফিসে তিন দিনের একটি বেসিক ট্রেনিং দেওয়া হয়। সেখানে মূলত ভাষার কিছু প্রাথমিক ধারণা, সংস্কৃতি ও নিয়মকানুন শেখানো হলেও কাজের বাস্তবতা, ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।

যদি আগে থেকেই আমাদের দক্ষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো এবং বিদেশে কোনো ধরনের হয়রানি হলে সাহায্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিংবা আইনি সহায়তার বিষয়ে অজ্ঞতা না থাকত, সে ক্ষেত্রে আমাদের অভিবাসন আরও নিরাপদ ও সফল হতো। বিদেশে গিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের পর দেশে ফিরলেও আমরা তেমন কোনো পুনর্বাসনসহায়তা পাই না। পরিবার ও সমাজে মানিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়। বিশেষত ৪৫–৫০ বছর বয়সী যাঁরা দেশে ফিরে আসেন, তাঁদের করুণ অবস্থা হয়। তাই ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের জন্য সরকারি কার্ড বা ভাতার মতো একটি কাঠামো থাকা দরকার।

সুপারিশ:

  • অভিবাসনের পুরো চক্র মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ অভিবাসন নীতি কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

  • কাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ও বাজারভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।

  • কেয়ারগিভার ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, কনস্ট্রাকশন, ইলেকট্রিক, ওয়েল্ডিংসহ নতুন খাতে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।

  • রিক্রুটিং এজেন্সি ও সাব-এজেন্টদের জন্য কঠোর লাইসেন্সিং, গ্রেডিং ও জবাবদিহির ব্যবস্থা চালু করা।

  • নারীদের উপার্জনের ওপর পূর্ণ আর্থিক অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

  • অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করে নারী–পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ।