জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে  অংশগ্রহণকারীরা

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান

ক্লাইমেট জাস্টিস রেজিলিয়েন্স ফান্ড (সি জে আর এফ) এর সহায়তায় ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৮ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। আয়োজক: এসডিএসপ্রথম আলো

মো. জিয়াউল হক

অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেলেও আমাদের দেশে এটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। ২০১৩ সালের পর থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে আমরা এ সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে পেরেছি। এগুলোকে জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের মানদণ্ড নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ে আরও কাজ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি এবং ন্যাশনাল প্ল্যান অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমরা বর্তমানে ‘ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ফর লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ প্রস্তুত করছি,

যা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-তেও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ দুটো পরিকল্পনায় জলবায়ু তাড়িত স্থানচ্যুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে, যা এক ধরনের অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আসছে, তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন—কোনোটাই তারা সঠিকভাবে পাচ্ছে না।

আমাদের দেশে বিভিন্ন এনজিও ও সিভিল সোসাইটি ভালো কাজ করছে,

কিন্তু সেগুলোকে মূলধারায় আনা যাচ্ছে না। নীতিমালায় অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। অর্থায়নের বিষয়েও আমাদের সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে লস অ্যান্ড ড্যামেজের জন্য যে তহবিল তৈরি হয়েছে, সেখান

থেকে আমরা কীভাবে অর্থায়ন পেতে পারি, সে জন্য ভালো মানের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা জরুরি।

গওহার নঈম ওয়ারা

দুর্যোগবিশেষজ্ঞ ও চেয়ারপারসন, এসডিএস

অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা—তবু তারা আলোচনার বাইরে থেকে যায়; কারণ, তারা ভোটার নয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নেই। দক্ষিণাঞ্চলের অনেক শিশু কাজের জন্য চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ইটভাটায় যায়। নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত তারা বাইরে থাকে, ফলে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। কাজ শেষে বিদ্যালয়ে ফিরে এলে তাদের নানান বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এভাবে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়।

একইভাবে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে দুর্যোগ প্রবন এলাকার মেয়েরা । একটি মেয়ে বিয়ে হয়ে গেলে তাকে আর স্কুলে ফিরতে দেওয়া হয় না, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে তা হয় না। এই বৈষম্য দূর করতে ‘ব্রিং ব্যাক গার্লস স্টুডেন্ট’ ধরনের জাতীয় কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। কতজন মেয়ে পড়াশোনা থেকে ঝরে যাচ্ছে, সেটার হিসাবও আমাদের রাখতে হবে।

শরীয়তপুরে লবণাক্ততা বাড়ছে—এটা কেন হচ্ছে, সেটাও আমাদের ভেবে দেখা দরকার। পদ্মার পানি উজানের বিভিন্ন জেলায় নানা প্রকল্পে উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে ভাটির দিকে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাগর পর্যন্ত যেতে না পারলে লবণাক্ততা বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা সমন্বিতভাবে কোনো আলোচনা করছি না। চরের মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর দিকেও নজর দিচ্ছি না । তাদের অনেকের স্থায়ী ঠিকানা নেই, ফলে তারা এনআইডি বা পাসপোর্ট করতে পারে না। এতে তারা সরকারি সেবাও পায় না। জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

আগে নদী ভাঙলে গ্রাম ভাঙত, এখন নদী ভাঙলে সমাজ ভাঙে। আগে কাঁচা স্কুলঘর, কাঁচা ধর্মীয় স্থাপনা সহজে স্থানান্তর করা যেত, সমাজ অটুট থাকত। এখন সবকিছু পাকা হওয়ায় তা আর সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সমাজ ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের ভাবতে হবে—কীভাবে নদীভাঙনের মধ্যেও সমাজকে অক্ষত রাখা যায়, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামো সচল রাখা যায়।

কবিতা বোস

কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও মানুষের দুর্ভোগ আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফররত জার্মান পার্লামেন্টারিয়ানদের সঙ্গে আলোচনাতেও বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরেছি । জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নারী, কন্যাশিশু ও তরুণদের ওপর। ভোলা, বরগুনা, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জে দেখা গেছে—নারীরা শুধু ভুক্তভোগী নন, অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই সমাধান তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের এই ভূমিকার স্বীকৃতি নেই। প্রায় ৯০ শতাংশ নারী নিজেদের দুর্ভোগের কথা বললেও, তারা মনে করেন তাদের অবদান অস্বীকৃত রয়ে গেছে।

পানির সংকট একটি বড় উদাহরণ। পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারী ও কন্যাশিশুর ওপর। একটি শিশু প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে শুধু পানি আনার জন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এবং মেয়েদের নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে যা বড় সামাজিক সংকট।

সাতক্ষীরা ও খুলনায় আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপ ও উদ্বেগে ভুগছেন এবং ৫৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ রয়েছে। এটি প্রজন্মক্রমে প্রভাব ফেলছে। কৃষক পরিবারের সন্তানরা কৃষির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা সরকার, বিভিন্ন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি অংশীদারিত্ব ও যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

নুজহাত জাবিন

পার্টনারশিপ ও স্ট্র্যাটেজি লিড, এশিয়া মাল্টি কান্ট্রি ক্লাস্টার, ক্রিশ্চিয়ান এইড

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি, দুই ক্ষেত্রেই নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলনামূলকভাবে দেরিতে আলোচনায় এসেছে। এটি অনেক ক্ষেত্রেই হিসেব করে বের করা কঠিন এবং কিছুটা বিষয়ভিত্তিক। কিছু ক্ষতি আর ফিরে আসে না, তাই তার আর্থিক মূল্যমান নির্ধারণ করাও কঠিন। এই কারণে একটি সাধারণ বোঝাপড়া, সাধারণ সংজ্ঞা ও একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন । এখানে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সাথে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিদদের বড় ভূমিকা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথ্য সংগ্রহ হলো ডেটা বা তথ্যের উপস্থাপন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার। অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও উপস্থাপন করা হবে এবং কীভাবে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা হবে, সেখানে আরও কাজের সুযোগ রয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য, মনোসামাজিক সহায়তা এবং সামাজিক সহায়তার মতো অ-অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ধীরে ধীরে উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। যেমন কিছু আলোচনায় এসেছে, মানুষের মানসিক চাপ ও সামাজিক সহায়তার চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু তা এখনো মূলধারার প্রকল্পে যথেষ্টভাবে নেই।

এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার দরকার, বিশেষ করে দাতা সংস্থাদের মানসিকতা ও প্রকল্প নকশায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত হলেও, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কার্যক্রম এখনো সীমিত। তাই এই ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আরও উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

রাবেয়া বেগম কল্পনা

নির্বাহী পরিচালক, এসডিএস

অ–অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিকে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি সেগুলোর আর্থিক মূল্যমান নির্ধারণ করার বিষয়টি জরুরি। আমাদের জাতীয় কাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলকে কার্যকর করে আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করা দরকার, যাতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়।

অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি আলাদা করে চিহ্নিত ও পরিমাপ করা দরকার। বর্তমান নীতি ও তথ্য ব্যবস্থায় এসবের পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ নেই। ফলে আমরা বুঝতে পারি না কোন বছর কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কারা সহায়তা পেল বা পেল না এবং দীর্ঘ মেয়াদে কারা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়, যার ফলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক অবজ্ঞা ও অসম্মান, নিরাপত্তাহীনতা এবং নারী ও কন্যাশিশুর

নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু তারা

অনেক সময় স্থানীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা নাগরিক সুবিধা পায় না; কারণ, তারা নতুন এলাকায় তালিকাভুক্ত নয়। বিষয়টিতে নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বৈশ্বিক সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের জাতীয় পর্যায়ে ডেলটা পরিকল্পনা, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে এটাকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।

মজিবুর রহমান

প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী, এসডিএস

চরাঞ্চলের মানুষ সবসময় উপেক্ষিত থাকে। সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার হয়, যা আমরা ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি না। এখনো বেশিরভাগ চরে আধা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান, যেখানে মানুষকে প্রজা হিসেবে দেখা হয়। চর আজিজিয়া উচ্চবিদ্যালয় সাতবার বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছে। এতে বোঝা যায় ওই এলাকার মানুষের জীবন কতটা পরিবর্তনের মধ্যে থাকে।

গবেষণা মোতাবেগ নদীভাঙন কবলিত পরিবার সংখ্যা ক্রমে কমেছে, আমি এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করি। পদ্মা সেতুর পর নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নতুন এলাকায় ভাঙন হচ্ছে, সেখানে বসতি কম। বাস্তবে ভাঙন কমেনি, বরং তীব্রতর হয়েছে। শরীয়তপুর এখন সম্পূর্ণভাবে জোয়ার-ভাটা কবলিত এলাকা, যা নতুন বিপদাপন্নতা তৈরি করেছে। নদীভাঙনকে আমরা দুর্যোগ হিসেবে আংশিকভাবে স্বীকার করলেও ভাঙ্গন কবলিতদের সহায়তায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে ।

আমি বাংলাদেশের দারিদ্রতা ম্যাপ নিয়ে আগেও প্রশ্ন তুলেছি। আমার মনে হয়েছে এই ম্যাপের মাধ্যমে কিছু এলাকাকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে, সরকারি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছে। অ–অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতি কীভাবে পরিমাপ করা হবে এবং কীভাবে সমাধান করা হবে, তা নিয়ে পলিসি পর্যায়ে আরও আলোচনা, সিদ্ধান্ত ও সংস্থা গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মো. শামসুদ্দোহা

চিফ এক্সিকিউটিভ, সিপিআরডি

জলবায়ু আলোচনায় অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক নতুন হলেও বাস্তবে এটি বরাবরই অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। তবে যেকোন দুর্যোগে আমরা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নেই এবং দুর্যোগ মোকাবেলা শুধু ত্রাণ কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা, বাস্তুচ্যুতি এবং সামাজিক ক্ষতি—এসব আমরা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করি না। কারণ এগুলো কখনও সামনে আসে না ।

ফলে দুর্যোগ মোকাবেলাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন মূলক কাজ হিসেবে বিবেচনা করি না । জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের প্রভাব শিশু শ্রম, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, দারিদ্র্য স্বাস্থ্য সংকটে ইত্যাদি সরাসরি উন্নয়ন ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তাই এটি উন্নয়নকে, মানবিক সহায়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখা জরুরি।

বর্তমানে আমাদের নীতি কাঠামোও বিচ্ছিন্ন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক খাত আলাদা আলাদাভাবে কাজ করছে, যার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে গবেষণার ফলাফল নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয় – ক্ষতিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংযোগ তৈরি করা জরুরি।ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পরিকল্পনায় অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক শিক্ষা বাড়াতে হবে।

শামছুজ্জামান

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, হিউম্যানিটেরিয়ান ও রেজিলিয়েনস প্রোগ্রাম, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে দুর্যোগজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বরাবরই ছিল, কিন্তু তা নীতিনির্ধারণী সব পর্যায়ে যথাযথভাবে আলোচনায় আসেনি। বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য ও বুলিংয়ের বিষয় আছে, যেমন তাদের রোহিঙ্গা নামে অভিহিত করা হয়, যা একটি সামাজিক অবমূল্যায়ন ও অসম্মান।

আমাদের যুবসমাজ ও নারী-শিশুদের এ বিষয়গুলো অবহিত করা দরকার। পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে বোঝাপড়া বাড়ানো যেতে পারে।

যেকোনো ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্য–পরিমাণ নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, নীতিনির্ধারকেরা সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেন, তাই গবেষণা আরও ভালো তথ্য–উপাত্তভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। দক্ষ বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন এবং নীতিগত সংস্কারপ্রক্রিয়ায় এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আমরা এ সম্পর্কিত নীতি কাঠামোয় অ–অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতি আরও শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলি। নীতিনির্ধারণে সংখ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অদৃশ্য ক্ষতির দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সাকিব হক

ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আইসিসিসিএডি

তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু তথ্য ব্যবস্থাপনা থাকলেও তা যথেষ্ট বিশ্লেষণমূলক নয়। কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হলো, কতজনকে রিলিফ দেওয়া হলো—এসব শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়, সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতি হচ্ছে, কোথায় সহনশীলতা তৈরি হচ্ছে, কোথায় অভিযোজন কার্যকর হচ্ছে—সে বিশ্লেষণ আমাদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় নেই।

দুর্যোগের সময় মিডিয়া রিপোর্টের ফলে কিছু বা স্বল্পমেয়াদি সহায়তা পৌঁছায়, কিন্তু পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায় । ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না।

আমাদের একটি সমন্বিত ও ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োজন, যেখানে শুধু সংখ্যা নয়; বরং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন, কার্যকারিতা এবং

প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ও

স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংযোগ এবং সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

সাজিদ রায়হান

হেড অব নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট, স্টার্ট নেটওয়ার্ক

নদীভাঙনসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি টেকসই, স্থানীয়ভাবে নির্মিত এবং সমন্বিত কর্মসূচী কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। আমরা সবাই—সরকার, দাতা সংস্থা, এনজিও, প্রশাসন, গণমাধ্যম—নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করছি, কিন্তু সেই কাজগুলো সমন্বিতভাবে হচ্ছে না। আমাদের কাজ চারটি মূল ধারায় বিভক্ত—প্রতিরোধ, সংরক্ষণ, মর্যাদার সুরক্ষা এবং স্থানীয়করণ। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষা করি দুর্যোগ ঘটার পর ত্রাণ দেওয়ার জন্য। আমি মনে করি আমাদের উচিত আগে থেকেই ক্ষয়ক্ষতির পূর্বানুমান করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা।

আমি স্থানীয়করণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। নদীভাঙনের মতো সমস্যায় শুধু বাইরের অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সম্পদ, প্রবাসী আয় এবং কমিউনিটির সক্ষমতাকে যুক্ত করা দরকার। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং সরকারি কর্মসূচিগুলোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে সাজানো দরকার।

মৃত্যুঞ্জয় দাস

ডেপুটি চিফ অব পার্টি, নবপল্লব, কেয়ার

আমাদের কিছু মৌলিক দুর্বলতা আছে। অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিকে আমাদের শুধু সংজ্ঞায়িত না করে বরং এটিকে আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করা দরকার। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও জাতীয় ফ্রেমওয়ার্কগুলো এখনো পর্যাপ্ত নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তা সংকট-প্রতিক্রিয়াশীল করা দরকার, যাতে নদীভাঙনের মতো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত সহায়তা পায়। একই সঙ্গে এসব ক্ষতিকে দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যায় ।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ডেলটা প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে লস অ্যান্ড ড্যামেজকে যুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানবিক সাহায্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে আলাদা না দেখে একত্রে বিবেচনা করা জরুরি।

পাশাপাশি পানি উন্নয়ন, নদী ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ফারহানা আফরোজ

প্রকল্প পরিচালক,

ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাট লোকাল লেভেল প্রোগ্রাম,

হেলভেটাস সুইস ইন্টারকো–অপারেশন

অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অ–অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতির বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু এগুলো আমরা ঠিকভাবে টাকার অংকে হিসাব করতে পারি না। যেমন সামাজিক সম্পর্ক, নিরাপত্তাবোধ, মানসিক স্থিতি, বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা বা শৈশব হারানোর মতো বিষয়গুলো টাকার অংকে মাপা যায় না। ফলে এগুলো নিয়ে কথা বলা এবং এগুলোকে নথিভুক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা স্থানীয় প্রকল্পে ইউনিয়ন পরিষদের সম্পৃক্ততার কথা বলি, কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে সেখানে তথ্যের কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। তাহলে এই ক্ষতি নথিভুক্ত করবে কারা, তথ্য কোথায় যাবে—এ বিষয়টিও পরিষ্কার নয়।

মানুষের জীবিকা, মানসিক চাপ, সংস্কৃতি হারানো বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো কীভাবে পরিমাপ করব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন সংস্থা ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যেখানে কেবল জলবায়ু বিশেষজ্ঞ নয়, সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন।

বিলকিস আক্তার

নদীভাঙ্গনে স্থানচ্যুত , শরীয়তপুর

গত আট বছরে নদী আমার বসত ঘর তিনবার নিয়ে গেছে। নদীভাঙ্গনের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারিনি। প্রথম ভাঙনের পর আমরা খেজুরতলা বাজারে গিয়ে দুই বছর ছিলাম। সেখান থেকে পাচুকারকান্দি, সেখান থেকে আবার স্থানচ্যুত হয়ে এখন পোরাগাছায় আছি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর চালিয়ে নিতে পারিনি। অর্থনৈতিক অভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত আমার মেয়েকে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে দিতে হয়েছে।

নদীভাঙনের পর আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে, ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। জমি হারিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে গেছি– ভ্যান চালিয়ে সংসার চলে না। মানুষ আমাদের ‘নদীভাঙা’বলে ডাকে। কোনো অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকা হয় না। আমাদের বাচ্চারাও কষ্ট পায়—ওরা বলে, অন্যদের দাওয়াত দেয়, কিন্তু আমাদের দেয় না। অর্থনৈতিক অভাবের কারণে সমাজে আমাদের কোনো সম্মানও নাই। আমি আগে নড়িয়ায় ছিলাম। এখন সব হারিয়ে নতুন জায়গায় টিকে থাকার চেষ্টা করছি।

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প

আমার পূর্বপুরুষ নদীভাঙা এলাকার মানুষ। ভোলা, লক্ষ্মীপুর ও রামগতিতে গিয়ে দেখেছি, মানুষ বারবার নদীভাংগনে বাস্তুচ্যুত হয়ে নতুন করে বসতি গড়ে। আমি মনে করি, দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ—পর্যালোচনা ও মোকাবেলা। পর্যালোচনায় জরিপ, ট্রমা ও বাস্তুসংস্থানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে, কিন্তু মোকাবেলার উপায় খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এ ক্ষেত্রে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ; এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—এই তিনটি মন্ত্রনালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগের কথা আমরা বলি, কিন্তু অগ্রগতি দেখি না। ডেল্টা প্ল্যানসহ বিভিন্ন নীতিপত্র থাকলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় নদীভাঙন পুরোপুরি রোধ সম্ভব নয়। এটি কমানো ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন জরুরি। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এটি সম্ভব নয়। গবেষণাকে আমি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখি; এখান থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেতে হবে।

আবদুর রাজ্জাক

প্রকল্প সমন্বয়কারী, এসডিএস

‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়-ক্ষতি ও মোকাবেলায় বিশেষ উদ্যোগ’ প্রকল্পটি আমরা শরীয়তপুরে বাস্তবায়ন করছি। সিজিআরএফ অর্থায়নে প্রকল্পটি । জানুয়ারি ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত চলমান, আরো এক বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। চারটি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ৬০০০ পরিবারের সঙ্গে কাজ করছি।

প্রকল্পের লক্ষ্য নদীভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রধান কাজগুলো হলো মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনর্গঠন এবং নারী ও

শিশুদের সুরক্ষা।

অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিমাপ করা কঠিন, বারবার স্থানচ্যুতি বড় বাধা এবং কমিউনিটি

পর্যায়ে এ বিষয়ে ধারণা সীমিত। অনেকে সামাজিক বঞ্চনার ভয়ে কাউন্সেলিং নেন না। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এতে জন ও নীতিসম্পৃক্ততা জরুরি।

পাভেল পার্থ

প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক ও লেখক

দুর্যোগ ও জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত কত প্রাণসম্পদ, লোকায়ত জ্ঞান, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়েছে, তার কোনো রাষ্ট্রীয় নথি নেই।

২০২৪ সালে শেরপুরের বন্যায় তুলশিমালা ও পোড়াবিনি ধানের ক্ষতি হয়; তুলশিমালা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। পোড়াবিনি ধানের খই টাঙ্গাইল শাড়ি বুনতে লাগে। ২০২২ সালে সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যায় হাওরের নারীদের ধামাইল গানের খাতা হারিয়ে যায়। ২০২৪ সালে কমলগঞ্জে মণিপুরি আঠালো ধানের ক্ষতি হয়, যা ছাড়া শাড়ি তৈরি করা কঠিন।

মসজিদ, মন্দির, বিহারসহ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও ঝুঁকিতে আছে। জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য সনদে অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকৃতি আছে। তাই জাতীয় নীতিমালা, পরিকল্পনা ও নিবন্ধনব্যবস্থা জরুরি। আন্তমন্ত্রণালয় ও সর্বজনের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরা দরকার।

মোহাম্মাদ আবদুল বারেক

নদীভাঙ্গনে স্থানচ্যুত, শরীয়তপুর

নদীভাঙনে আমি তিন-চারবার ঘরবাড়ি হারিয়েছি। দুইবার ঘর ভেঙে গেছে, দুটি ঘর ও ছাগল-গরু হারিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় ছিলাম। কেউ খোঁজ নেয়নি, আত্মীয়স্বজনও পাশে ছিল না। জমি না থাকায় এখন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করি, পাশাপাশি দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চালাই। বাড়িঘর, ছাগল ও গরুর বাছুরও স্রোতে ভেসে গেছে। বর্ষার পানিতে বারবার ঘর সরাতে হয়েছে, তখন কোনো আশ্রয় ছিল না।

আমার মতে, এলাকায় শক্ত বেড়িবাঁধ তৈরি হলে ভাঙন ও ক্ষতি অনেক কম হতো। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে মানুষ কিছুটা নিরাপদ থাকত। নদীভাঙা মানুষের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ও সহায়তা জরুরি। আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না, তাই সরকারি নজরদারি ও সহায়তা বাড়ানো দরকার। নদীভাঙা পরিবার বাঁচাতে সবার সহযোগিতার অনুরোধ জানাই এবং দ্রুত পদক্ষেপ চাই।

হুমায়েরা আক্তার

যুব প্রতিনিধি, শরীয়তপুর

আমরা নিয়মিত জলবায়ু দুর্যোগের কবলে পড়ি। এর ফলে বিদ্যালয় থেকে শিশুর ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, স্থানচ্যুতি, সামাজিক অনিরাপত্তা ও মর্যাদাহানির মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা মূলত অর্থনৈতিক ও অনর্থনৈতিক—দুই ধরনেরই ক্ষতি।

একটি শিশু স্রোতে ভেসে গেলে বা সাঁতার না জানার কারণে প্রাণ হারালে সেই ক্ষতি অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। একইভাবে বাল্যবিবাহ বা শিশুশ্রম শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে নষ্ট করে, যা অর্থমূল্যে নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য টেকসই কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা, শিশুদের জন্য নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ চালু করা দরকার। উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশেষভাবে লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ধনী দেশগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।

সুপারিশ

  • অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি (মানসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক) জাতীয় নথিভুক্তকরণ ও নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা।

  • দুর্যোগ, জলবায়ু ও সামাজিক খাতের মধ্যে কার্যকর আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করা।

  • ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও

কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

  • শিশু, নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য বিশেষ কর্মসূচি

ও শিক্ষাবৃত্তি চালু করা।

  • গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা।

  • নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।

অংশগ্রহণকারী:

মো. জিয়াউল হক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর;

গওহর নঈম ওয়ারা, দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ এবং চেয়ারপারসন, এসডিএস;

কবিতা বোস, কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্লান ইন্টারন্যাশনাল;

নুজহাত জাবিন, পার্টনারশিপ ও স্ট্র্যাটেজি লিড, এশিয়া মাল্টি কান্ট্রি ক্লাস্টার,ক্রিশ্চিয়ান এইড;

রাবেয়া বেগম কল্পনা, নির্বাহী পরিচালক, এসডিএস;

মজিবুর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী, এসডিএস;

মো. শামসুদ্দোহা, চিফ এক্সিকিউটিভ, সিপিআরডি;

শামছুজ্জামান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, হিউম্যানিটেরিয়ান ও রেজিলিয়েনস প্রোগ্রাম, ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ;

সাকিব হক, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আইসিসিসিএডি; সাজিদ রায়হান, হেড অব নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট, স্টার্ট নেটওয়ার্ক,

মৃত্যুঞ্জয় দাস, ডেপুটি চিফ অব পার্টি, নবপল্লব, কেয়ার;

ফারহানা আফরোজ, প্রকল্প পরিচালক, ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যাট লোকাল লেভেল প্রোগ্রাম,হেলভেটাস সুইস ইন্টারকো–অপারেশন;

বিলকিস আক্তার, নদীভাঙ্গনে স্থানচ্যুত, শরীয়তপুর;

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান, উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প;

আবদুর রাজ্জাক, প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর, এসডিএস;

পাভেল পার্থ, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক ও লেখক;

মোহাম্মাদ আবদুল বারেক, নদীভাঙ্গনে স্থানচ্যুত, শরীয়তপুর; হুমায়েরা আক্তার, যুব প্রতিনিধি, শরীয়তপুর।

সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।