বাংলাদেশ মেডিকেল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রথম আলো আয়োজিত ‘জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি: অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৩০ মার্চ ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
মাননীয় মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর
প্রধান, মিডিয়া সেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
ডা. রেজা আলী
অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনি;
সদস্য, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ
ডা. মো. সাহাব উদ্দিন তালুকদার
কার্ডিওলজিস্ট, এভারকেয়ার হাসপাতাল
ডা. রোকেয়া ফকির
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস ও জিপি স্পেশালিস্ট, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
ড. সায়েদ আহমেদ
পেডোরথিস্ট, কো-চেয়ার,
পেডোরথিস্ট ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস গাইডলাইন কমিটি (অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা)
ডা. রাসেল আহমেদ
বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট, নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া
ডা. ফারহানা হাসান
জিপি রেজিস্ট্রার, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
ডা. গোলাম সারোয়ার
ইমার্জেন্সি কনসালট্যান্ট, কুইন্সল্যান্ড হেলথ ক্লিনিক লিড, জেরিয়াটিক ইমার্জেন্সি মেডিসিন ইউনিট, লোগান হসপিটাল, অস্ট্রেলিয়া
ডা. বিলকিস আকতার
সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার,
নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া
ডা. পাভেল হোসেন
বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট
কাউসার খান
প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অস্ট্রেলীয় অভিবাসন আইনজীবী
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন
মাননীয় মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে রোগী যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আসে, তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত সেবা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের অভিজ্ঞতা এখানে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে রোগীদের জন্য চিকিৎসকের কাছে সহজ প্রবেশাধিকার সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি বড় শক্তি। অনেক ক্ষেত্রেই কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া যায়। তবে আমাদের প্রধান ঘাটতি রয়েছে ব্যবস্থাপনা, নৈতিকতা ও আস্থার জায়গায়।
চিকিৎসাসেবার মূল ভিত্তি আস্থা। এই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে চিকিৎসকদের নৈতিকতার জায়গাটি আরও শক্ত করতে হবে। চিকিৎসায় নৈতিকতার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীদের বেশি সময় দিতে হবে, মন দিয়ে রোগীর কথা শুনতে হবে, পারলে কম রোগী দেখতে হবে। চিকিৎসকদের চেম্বারে অচিকিৎসকদের বসে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় রোগ শনাক্তকরণ প্রতিবেদন জাল করা হয়। জরুরি সেবার ক্ষেত্রেই রোগীকে দ্রুত ও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের চিকিৎসকেরা জ্ঞান ও দক্ষতায় পিছিয়ে নন, কিন্তু তাঁদের যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। জরুরি সেবার জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, আধুনিক জ্ঞান অর্জন এবং কারিকুলাম উন্নত করার বিকল্প নেই। আমরা চাই, বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে আমাদের চিকিৎসকেরা স্থানীয় পর্যায়ে সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিন।
আমি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাই—সমালোচনা অবশ্যই করবেন, কিন্তু নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে করবেন, যাতে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়। সরকার, চিকিৎসক, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম—সবাই মিলে কাজ করলে তবেই আমরা একটি কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব। নৈতিকতা, আস্থা ও জরুরি সেবার উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে আমরা এগোতে চাই। আপনাদের সহযোগিতা পেলে আমরা অবশ্যই আরও ভালো করতে পারব।
প্রধান, মিডিয়া সেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জরুরি সেবার ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি রোগী নেওয়ার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়, ফলে তাৎক্ষণিক সেবা বাধাগ্রস্ত হয়। আবার সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে ঘুরতে ঘুরতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, কখনো মৃত্যুও ঘটে। একটি সমন্বিত জরুরি সেবাকাঠামো না থাকায় এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এখনো আমরা ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার’, ‘ইমার্জেন্সি মেডিসিন’ ও ‘ক্যাজুয়ালটি’—এই ধারণাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারিনি।
আমাদের আরেকটি বড় ঘাটতি হলো প্রাথমিক চিকিৎসাজ্ঞান। দুর্ঘটনার পর রোগীকে কীভাবে সরাতে হবে, তা সাধারণ মানুষ জানে না। অনেক সময় ভুলভাবে নাড়াচাড়া করায় ক্ষতি বেড়ে যায়। এমনকি অনেক চিকিৎসকের মধ্যেও সিপিআরসহ জরুরি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে এই দিকগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করা উচিত। রক্তপাত বন্ধ করা, ডুবে যাওয়া বা আগুনে পোড়া রোগী সামলানো, সাপে কামড়ালে করণীয়—এসব বিষয় জানা জরুরি। একইভাবে একজন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটের কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়া ও ভাঙা হাড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা জানা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
হাসপাতালে নিয়মিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মহড়া থাকা দরকার। অ্যাম্বুলেন্স সেবায় প্যারামেডিকদের দক্ষ করে তুলতে হবে। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে তারা আন্তর্জাতিক মানের প্যারামেডিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা সহজ নির্দেশিকা ও ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রমেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে আমাদের চিকিৎসকেরা দেশে ও বিদেশে সমানভাবে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন।
অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনি;
সদস্য, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ
বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঠিক করার আগে আমাদের বুঝতে হবে, জরুরি চিকিৎসা আসলে কী। এটি নতুন কিছু নয়, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকসহ নানা ধরনের মেডিক্যাল জরুরি পরিস্থিতিও বাড়ছে। এখানে বড় সমস্যা হলো, রোগীরা যখন আসে তখন তাদের সমস্যাটি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে না। এই ‘অনির্ধারিত রোগী’কে দ্রুত সঠিকভাবে শনাক্ত করা না গেলে ভুল রোগনির্ণয় হয় ও সঠিক চিকিৎসা শুরু হয় না।
জরুরি সেবায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। পেটব্যথা নিয়ে আসা একজন রোগীকে যদি শুধু সার্জিক্যাল সমস্যা ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু সেটি যদি আসলে হার্টের সমস্যা হয়, তাহলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক রোগনির্ণয় না হলে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিলম্বিত শনাক্তকরণ ও ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মারা যাচ্ছে, আবার হাসপাতালে ভাঙচুরসহ নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
জরুরি বিভাগ যেকোনো হাসপাতালের ‘প্রবেশদ্বার’। এখানে সঠিকভাবে কাজ না হলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আমাদের দেশে গুরুতর অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বেশি, কিন্তু রোগনির্ণয়ে দেরি হচ্ছে, ফলে চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হচ্ছে। এতে হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়ছে, অনেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভর্তি হচ্ছে, আবার অনেকের সঠিক চিকিৎসা না হওয়ায় মৃত্যুও বাড়ছে। একটি শক্তিশালী জরুরি সেবাব্যবস্থা এসব সমস্যার সমাধান দিতে পারে। এটি হাসপাতালের চাপ কমাবে, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালকে কার্যকর করবে ও রোগীর চিকিৎসা অভিজ্ঞতা উন্নত করবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এই সমস্যা শুধু আমাদের নয়। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য—সব দেশই একসময় একই সমস্যায় ছিল। তারা ইমার্জেন্সি মেডিসিনকে একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে গড়ে তুলেছে ও একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এই ব্যবস্থার জন্য কিছু অবকাঠামো প্রয়োজন—হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি। এগুলোর অনেকটাই আমাদের দেশে ইতিমধ্যে আছে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে দক্ষ জনবল, ক্লিনিক্যাল প্রটোকল, তথ্যব্যবস্থা, অ্যাম্বুলেন্স–সেবা ও সুশাসনে। এই ‘অদৃশ্য অবকাঠামো’ তৈরি করতে হবে, যেখানে চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রোগী ব্যবস্থাপনা করবেন।
একটি শক্তিশালী জরুরি বিভাগ থাকলে হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় ভর্তি কমানো সম্ভব। অস্ট্রেলিয়ায় আমরা দেখেছি, অধিকাংশ রোগীকেই জরুরি বিভাগ থেকে বাড়ি পাঠানো যায়, শুধু প্রয়োজনীয়দের ভর্তি করা হয়। এতে হাসপাতালের ভিড় কমে, খরচও কমে, রোগীর ফলাফল ভালো হয়।
বাংলাদেশে বড় সমস্যা হলো বিচ্ছিন্ন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, মানসম্মত চিকিৎসা পথনির্দেশের অভাব, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা ও গ্রামীণ বৈষম্য। এসব ঠিক করতে একটি জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। ধাপে ধাপে একটি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে—প্রথমে নির্বাচিত কিছু হাসপাতালে পাইলট প্রকল্প চালু করা, সেখানে মানসম্মত সেবা প্রয়োগ করা, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। দেড় বছরের মধ্যে এর ফল পাওয়া সম্ভব। পরবর্তী দুই থেকে চার বছরে ইমার্জেন্সি মেডিসিনকে একটি স্বতন্ত্র বিশেষায়িত শাখা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই জরুরি সেবাব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। এই ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে খরচ বাড়বে না, বরং কমবে। কারণ, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা দিলে অপ্রয়োজনীয় ভর্তি কমবে, জটিলতা কমবে এবং মৃত্যুহারও কমবে।
আমরা ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় জরুরি চিকিৎসাবিষয়ক একটি সার্টিফিকেট কোর্স চালু হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। আমাদের লক্ষ্য, এই প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানকে আরও বিস্তৃত করা। অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা দ্রুত রোগনির্ণয়, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পাদন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার—যেমন বেডসাইড আলট্রাসাউন্ড—এসব দক্ষতায় প্রশিক্ষিত থাকেন। এই দক্ষতাগুলো আমাদের দেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব। আমাদের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দরকার। আমরা আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে তা সরকারের কাছে উপস্থাপন করা যাবে। সুযোগ পেলে আমরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে একটি কার্যকর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব।
কার্ডিওলজিস্ট, এভারকেয়ার হাসপাতাল
আমাদের দেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে ধারণা এখনো খুব সীমিত। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, চিকিৎসক, নার্স, ড্রাইভার ও প্যারামেডিকদের মধ্যেও এই ঘাটতি রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ও ক্লিনিক্যাল জরুরি পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, কিন্তু তা মোকাবিলার মতো প্রস্তুতি আমাদের নেই। জরুরি বিভাগে কাজ করার মোটিভেশন তৈরি করতে হলে ইন্টার্নশিপ থেকেই শুরু করতে হবে। আমরা সাধারণত মেডিসিন, সার্জারি বা গাইনি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চাই, কিন্তু ইমার্জেন্সি মেডিসিনকে কেউ অগ্রাধিকার দিই না। অথচ সময়ের দাবি হলো এ বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া।
ইন্টার্নশিপে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত তিন মাস জরুরি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও এর ওপর পরীক্ষা চালু করা উচিত। এতে চিকিৎসকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে। একইভাবে নার্স ও প্যারামেডিকদের জন্যও প্রশিক্ষণ ও কোর্স কারিকুলাম চালু করা জরুরি। বর্তমানে দেশে ইমার্জেন্সি মেডিসিনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অনেক চিকিৎসক গ্রামীণ এলাকায় পোস্টিং পান, কিন্তু সেখানে জরুরি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তাঁদের থাকে না। আবার যাঁদের অধীনে কাজ করেন, তাঁরাও অনেক সময় এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত নন। ফলে শেখার সুযোগও সীমিত থাকে। তাই এই খাতে বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের হাসপাতালগুলোতে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে আমরা প্রায় অর্ধেক রোগীকেই জরুরি বিভাগ থেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিতে পারি। এতে হাসপাতালের চাপ কমে এবং রোগীর দ্রুত সেবা নিশ্চিত হয়। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বড় সমস্যা হলো সরঞ্জামের ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকলে চিকিৎসকের পক্ষে কার্যকর সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
অ্যাম্বুলেন্স–সেবার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা আছে। অনেক সময় ড্রাইভাররা নিজেদের সুবিধামতো হাসপাতালে রোগী নিয়ে যায়। অথচ রোগীকে এমন হাসপাতালে নেওয়া দরকার যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া যাবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে কাছাকাছি কোথাও নিয়ে গিয়ে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস ও জিপি স্পেশালিস্ট, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশ এখন একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে, যদি আমরা সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অনেক নতুন চিকিৎসক অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও পেশাগত নানা বাধার মুখে পড়েন। আমাদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস তাঁদের জন্য বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করে, যেখানে সাধারণত এ ধরনের প্রশিক্ষণ অনেক ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো নতুন গ্র্যাজুয়েটদের উচ্চমানের পেশাদারত্ব বজায় রেখে অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে সহায়তা করা। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন চ্যারিটি কার্যক্রম ও স্বাস্থ্য ক্যাম্পও পরিচালনা করি।
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ চিকিৎসকেরা। তাঁরা মেধাবী, পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল। কিন্তু তাঁদের সামনে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ, বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। সঠিক গাইডলাইন ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ থাকলে তাঁরা আরও দক্ষভাবে রোগীদের সেবা দিতে পারবেন।
একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, বরং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক, নার্স এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখতে হয়, যাতে তাঁরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।
যদি আমরা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। রোগীরা বড় শহরের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়েই মানসম্মত সেবা পাবে, যা সময় ও খরচ দুটোই কমাবে।
আমাদের সংগঠন এই লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান স্থানীয় পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়। আমরা চাই, চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হোক এবং একটি কার্যকর ও আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠুক।
আমাদের কাছে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতা আছে। এখন প্রয়োজন এগুলোকে একত্র করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো, যাতে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারি।
পেডোরথিস্ট, কো-চেয়ার, পেডোরথিস্ট ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস গাইডলাইন কমিটি (অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা)
অস্ট্রেলিয়ায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় রোগ নির্ণয় অত্যন্ত সংগঠিত ও দ্রুত হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিক ফুট আলসারের ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ এবং উচ্চ ঝুঁকির ফুট ক্লিনিকের সঙ্গে দ্রুত সংযোগের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই অঙ্গচ্ছেদ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। জরুরি বিভাগের সঙ্গে এই সমন্বিত ব্যবস্থাই রোগীর জীবন বাঁচানোর মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিক ফুট আলসার ও অন্যান্য জরুরি জটিলতার কারণে অঙ্গচ্ছেদের হার এখনো অনেক বেশি। এর একটি বড় কারণ হলো জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় দেরি, ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাব। অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসেন, আবার এলেও দ্রুত সঠিক সেবা পান না।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, স্পষ্ট ক্লিনিক্যাল প্রটোকল এবং উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের দ্রুত বিশেষায়িত সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা। ডায়াবেটিক ফুট আলসারের মতো রোগে যদি শুরুতেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা যায়, তাহলে জরুরি বিভাগ থেকেই অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক চাপ তৈরি হয় শুধু ডায়াবেটিক ফুট আলসারজনিত হাসপাতালে ভর্তির কারণে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এই চাপ আরও ভয়াবহ, যদিও তা অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। তাই জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে এখানে শুধু চিকিৎসা নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দুটি বিষয়—অপ্রয়োজনীয় হাসপাতালে ভর্তি কমানো এবং অঙ্গচ্ছেদ প্রতিরোধ করা। এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব যদি জরুরি বিভাগে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সঠিক প্রটোকল এবং দক্ষ সহায়ক স্বাস্থ্যসেবা দল কার্যকরভাবে কাজ করে।
বর্তমানে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় এই খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার নিয়েও গবেষণা করছি, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং জরুরি সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল হয়। আমি বিশ্বাস করি, এ ধরনের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা যদি বাংলাদেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এটি একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতালের একটি বিভাগ নয়—এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন। এই লাইন শক্তিশালী হলে আমরা বহু জীবন বাঁচাতে পারব এবং অঙ্গচ্ছেদসহ জটিলতা অনেক কমিয়ে আনতে পারব।
বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট, নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশে জনবল আছে, অবকাঠামো আছে, ডাক্তারও আছে; কিন্তু নেই একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা, সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রটোকল বা প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা। এ কারণেই আমরা এখন চেষ্টা করছি বাংলাদেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করার জন্য। এটি খুব ব্যয়বহুল কিছু নয়। আমরা এখানে সবাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছি, আমাদের লক্ষ্য একটাই—দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উন্নত বিশ্বের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।
কয়েকটি কেন্দ্রকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে শুরু করা যেতে পারে। আমরা মোনাশ ইউনিভার্সিটির অধীন জরুরি চিকিৎসা সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছি। গত ছয় মাসে যে ৩০ জন সেনা কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, তাদের অভিজ্ঞতা খুবই ইতিবাচক। তারা জরুরি বিভাগে কাজ করতে আগ্রহী। আগামী ছয় মাসে যদি আরও ৩০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব। এটি কঠিন কিছু নয়। শ্রীলঙ্কার মতো দেশও উন্নত জরুরি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, আমরাও পারব।
আমাদের জরুরি বিভাগে এমন কর্মী দরকার, যারা যেকোনো রোগীকে দ্রুত মূল্যায়ন করে সঠিক বিভাগে পাঠাতে পারবে। এতে ওয়ার্ডের চাপ কমবে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে। অস্ট্রেলিয়ায় আমরা শুধু স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক নয়, পড়ে গিয়ে হাড় সরে গেলেও জরুরি বিভাগেই চিকিৎসা দিই। বাংলাদেশে অনেক সময় রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, যা অস্ট্রেলিয়ায় প্রটোকলের কারণে হয় না। সেখানে আমরা দ্রুত ব্যথা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে দিই। এই সিস্টেমগত পার্থক্যই মূল সমস্যা।
জিপি রেজিস্ট্রার, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
আমাদের দেশে সবকিছুই আছে। জনবল আছে, অবকাঠামো আছে; শুধু একটি কার্যকর সিস্টেমের পরিবর্তন দরকার। আমরা গ্রামীণ পর্যায় থেকেই জরুরি সেবা সংস্কার শুরু করতে পারি। ছোট পরিসর থেকে শুরু করলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সফল করা সম্ভব।
এ পাইলট প্রকল্পে প্রথম ধাপে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী প্রশিক্ষণ দিতে পারি। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের সিপিআরসহ মৌলিক জরুরি সেবা শেখানো সম্ভব। অস্ট্রেলিয়ায় ছোট শিশুরাও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব শেখে। আমাদের ক্ষেত্রেও এটি বাস্তবসম্মত।
দ্বিতীয় ধাপে মুঠোফোনভিত্তিক জরুরি সহায়তাব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে হার্ট অ্যাটাক বা গর্ভবতী মায়ের রক্তক্ষরণের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাহায্য চাওয়া যায়। তৃতীয় ধাপে গ্রামীণ অ্যাম্বুলেন্স–ব্যবস্থায় ছোট যানবাহন ব্যবহার করে অক্সিজেনসহ প্রাথমিক সরঞ্জামের পরিবহন নিশ্চিত করা যেতে পারে।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় হাসপাতাল থাকলেও মূল গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ জনবল তৈরিতে। শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স ও সহায়ক কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ রোগীকে প্রাথমিক সেবা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ায় সবাই নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে কাজ করেন। ঢাকার বড় হাসপাতালের মতো একই প্রটোকল গ্রামেও কার্যকর করা উচিত।
এ প্রটোকল যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে ভুল কমবে এবং চিকিৎসা আরও নির্ভুল হবে। রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে আনা ও সঠিক সেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
ইমার্জেন্সি কনসালট্যান্ট, কুইন্সল্যান্ড হেলথ ক্লিনিক লিড, জেরিয়াটিক ইমার্জেন্সি মেডিসিন ইউনিট, লোগান হসপিটাল, অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা, আর বাংলাদেশের ব্যবস্থায় মূল ঘাটতি হলো সিস্টেম, জরুরি বাছাইপদ্ধতি ও প্রটোকলের অভাব।
বাংলাদেশে জেলা সদর হাসপাতালে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার সময় আমি দেখেছি, জরুরি বিভাগে আগে আসলে আগে দেখা—এই নিয়মে চিকিৎসাসেবা চলে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু না করায় অনেককে বাঁচানো যায় না।
অস্ট্রেলিয়ায় ব্যথার রোগী এলে সঙ্গে সঙ্গে ইসিজি করা হয় ও জরুরি চিকিৎসা শুরু হয় বা প্রয়োজন হলে দ্রুত রেফার করা হয়। সেখানে একটি কার্যকর জরুরি বাছাইব্যবস্থা আছে, যেখানে নার্স রোগীর অবস্থা অনুযায়ী এক থেকে পাঁচ ক্যাটাগরিতে ভাগ করেন। সবচেয়ে গুরুতর রোগীকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় ভর্তি কমে যায় এবং সঠিক রোগী সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায়। বাংলাদেশে অনেক সময় ২০০ শয্যার হাসপাতালে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকে, যার একটি বড় অংশের ভর্তি প্রয়োজনই থাকে না। অস্ট্রেলিয়ায় জরুরি বিভাগের অনেক রোগীকেই কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। আমাদের দেশে জরুরি বিভাগকে কেন্দ্রীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই এই চাপ তৈরি হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় কেউ জরুরি অবস্থায় হটলাইনে ফোন করলে কয়েক মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে যায়। প্রশিক্ষিত কর্মীরা রোগীর অবস্থা বুঝে ঠিক হাসপাতালে নিয়ে যান। আবার যাদের অবস্থা গুরুতর নয়, তাদের সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হয়। আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাকেও এভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। বাংলাদেশে সব সম্পদ আছে, কিন্তু সেগুলোকে একত্র করে একটি কার্যকর জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার,
নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় আমরা জরুরি বিভাগে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করি। রোগী ব্যথা নিয়ে এলে আগে তাঁর ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করি, তারপর বিস্তারিত মূল্যায়ন করি। আমি চাই, বাংলাদেশেও এই দ্রুত ও প্রটোকলভিত্তিক জরুরি চিকিৎসাপদ্ধতি চালু হোক। অস্ট্রেলিয়ার আলফ্রেড ইমার্জেন্সি একাডেমিক সেন্টার ও মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের জরুরি চিকিৎসা সার্টিফিকেট প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। এই ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশে জরুরি বিভাগের পুরো দল—ট্রায়াজ, অ্যাম্বুলেন্স, জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসক, নার্স—সবাইকে একই প্রটোকলে প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে সবাই একে অপরের নির্দেশনা ও তথ্য স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। আমি নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করব, আমাদের মেধা ও সম্পদ আছে, শুধু প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণ ও প্রটোকলভিত্তিক ব্যবস্থা। এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মেডিকেল থেকে প্রান্তিক হাসপাতাল পর্যন্ত সবাই একই মানের সেবা দিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট
বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার তেমন অগ্রগতি হয়নি। ফলে প্রতিদিন বিপুল অর্থ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। রোগীদের নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় ৭৪ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ অনেক বেশি।
এ পরিস্থিতি থেকে আমরা আলোচনা করেছি, কীভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ব্যবস্থাকে উন্নত করা যায়। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি বিভাগ ও প্রি-হাসপাতাল সিস্টেমের ধাপে ধাপে উন্নয়ন করা যায় বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে।
বাংলাদেশে যেহেতু সম্পদের সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, তাই অ্যাম্বুলেন্সের আঞ্চলিক বণ্টন, জনঘনত্ব অনুযায়ী হাসপাতাল বণ্টন এবং জেলা পর্যায়ে সেবার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায়। প্যারামেডিক সেবা ও জরুরি চিকিৎসার প্রশিক্ষণব্যবস্থাও আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য, যাতে তাদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অস্ট্রেলীয় অভিবাসন আইনজীবী।
আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই অধ্যাপক ডা. রেজা আলীকে। আরো যাঁরা উপস্থিত আছেন, তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশ থেকে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু দূর থেকে দেখলে বোঝা যায়, পথটি মোটেও সহজ নয়; এটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
দেখা যায়, ভারত বা শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকেরা তুলনামূলকভাবে সহজে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসকদের অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। এখনো অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বিভিন্ন কারণে এগোতে পারছেন না।
আমার মনে হয়, এ কাজগুলো যদি শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও বড় পরিসরে করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জন্য পথটি কিছুটা সহজ হতে পারে। এতে আরও বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসক অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সবারই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত।