
ভুয়া আইডি তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ভিডিও তৈরিসহ নানাভাবে অনলাইনে নারীদের হয়রানি, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এ গত ৫ বছরে ৭৮ হাজারের বেশি অভিযোগ এসেছে নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা ও হয়রানি নিয়ে। এ ধরনের হয়রানি বন্ধে অনলাইনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নারীকে যেমন করণীয় জানতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও সচেষ্ট হতে হবে নারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। নারীর প্রতি অনলাইন হয়রানি বন্ধে সামাজিক পরিবর্তন দরকার। গতকাল সোমবার প্রথম আলো ও সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা।
‘নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা: ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিতে করণীয়’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর কারওয়ানবাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে।
বৈঠকে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) তাপতুন নাসরীন বলেন, অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা যেন ঘটতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অনেকে ‘ভিউ ও রিচ’ পাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত অনেক তথ্যও অনলাইনে দিয়ে দেন। এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা নিয়ে গত ৫ বছরে ৮৭ হাজার ৭২৭টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫২ হাজার ৭০২টি অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাত্র ১৮০টি মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, সাইবার সহিংসতা বন্ধে সবাইকে এক হয়ে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের আইনি প্রক্রিয়া ও নতুন অপরাধ সংঘটনের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। সময়ের সঙ্গে অপরাধের নতুন নতুন ধরন আসে। তাই আইন আরও দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। একটি গোষ্ঠী নারীদের পেছনে টেনে রাখতে চায়। নারীবিদ্বেষ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাসহ নানা কারণে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়। এসবের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক পরিবর্তন দরকার।
অভিযোগ পাওয়ার পর সাক্ষ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে দুর্বলতা রয়েছে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, অনলাইন সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে, পুলিশের সদস্যরা জানেন না তদন্তের জন্য কীভাবে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে।
অনলাইনে নিজে প্রতিদিন ঘৃণামূলক মন্তব্য ও হয়রানির শিকার হন বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান। তিনি বলেন, নারীর প্রতি এ ধরনের হয়রানি বন্ধে সরকারকেই সবচেয়ে বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায় আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, নারীদের প্রতি সহিংসতায় ডক্সিং সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হয়রানির উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগী নারীর ফোন নম্বর ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র ও পুলিশ ব্যবস্থা নেবে ঠিকই; কিন্তু পাশাপাশি নিজেকেও প্রযুক্তিশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট ফর প্রফিট ল–এর আইনবিষয়ক পরামর্শক শারমিন খান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার সহিংসতা ও তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়গুলোতে এমন কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করা উচিত, যাঁরা তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন।
‘মেয়ে নেটওয়ার্ক’–এর প্রতিষ্ঠাতা তৃষিয়া নাশতারান বলেন, অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কনটেন্ট নামিয়ে নেওয়ার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়; কিন্তু কেউ স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারে, কেউ স্টোর করতে পারে কনটেন্ট। ফলে এসবের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থেকেই যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো আয়ের জন্য ভুয়া আইডি ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বন্ধে ব্যবস্থা নেয় না; বরং রাষ্ট্রের এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি চাওয়া যায়।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও গণযোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা সোমা বলেন, অনলাইনে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিতে আইন সংস্কারের পাশাপাশি সাংগঠনিক শক্তি ও সামাজিক শক্তি বাড়াতে হবে।
সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্মের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, আইনের প্রয়োগ না থাকলে সহিংসতার ঘটনা বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজির (বিডব্লিউআইটি) সাবেক পরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, যাঁরা অনলাইনে অপরাধ করছেন, তাঁরা কেন অপরাধ করছেন, সেটি নিয়েও গবেষণা করা দরকার।
প্রতিবন্ধী নারীদের সুরক্ষার দিকেও নজর বাড়ানোর আহ্বান জানান উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) কর্মসূচিসহ সমন্বয়কারী শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, সাইবার সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন সংশোধন ও নীতিমালা তৈরিতে প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, নারীদের ওপর অনলাইন সহিংসতা বিশদ আকারে ঘটছে। ফলে শুধু ব্যক্তির ওপর দায় না চাপিয়ে রাষ্ট্রকে সহিংসতা রোধে দায়িত্ব নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী লাবণ্য প্রজ্ঞা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে হয়রানিমূলক কনটেন্ট বানানো হচ্ছে। তাই এআই নিয়ে মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে স্কুল পর্যায় থেকে কাজ করা দরকার।
স্বাগত বক্তব্যে ব্লাস্টের পরিচালক (পরামর্শ ও যোগাযোগ) মাহবুবা আক্তার বলেন, অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বেশির ভাগ ভুক্তভোগী জানেন না, কোথায় কী অভিযোগ জানাবেন, কোথায় গিয়ে প্রতিকার পাবেন।
গোলটেবিল বৈঠকে ‘নারী ও প্রযুক্তি: লিঙ্গভিত্তিক সমস্যা নিরসন এবং আইনি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, জনসচেতনতা তৈরি, স্কুলভিত্তিক নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি খাতে সমন্বয়, গোপনীয়তা রক্ষা, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংগৃহীত তথ্য সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া, সহিংসতা সৃষ্টিকারী কনটেন্ট মুছে ফেলার জন্য বিশেষ উইং গঠন, প্রতিটি বিভাগীয় শহর ও প্রতিটি থানায় সাইবার সেল গঠন, কেন্দ্রীয়ভাবে মামলার তদারকি, লিংক ব্লকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ইত্যাদি সুপারিশ করা হয়। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।