
দেশের স্বায়ত্তশাসিত ৪টি ছাড়া ৩৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নেই। এর ফলে উপাচার্য হওয়ার জন্য একজন শিক্ষকের প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা আনুগত্য।
১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার কথা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিমাত্রায় রাজনীতির চর্চা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু উপাচার্যরা সরকারের মনোনীত হয়ে নির্বাচনকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটিতেই এখন অনির্বাচিত উপাচার্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ বছর ধরে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী অন্য সব নির্বাচন হয়ে থাকে। গত ১৫ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন মোটামুটি নিয়মিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচিত উপাচার্যরা মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। বর্তমান উপাচার্য ফারজানা ইসলাম নির্বাচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রথম দফায় অনির্বাচিত হিসেবে চার বছর দায়িত্ব শেষ করেন। ২০১৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার তাঁকে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দিয়েছে।
দেশের ৩৮টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তা অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। ভারত ও পাকিস্তানে উপাচার্য হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশেও সার্চ কমিটির মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের বিধান চালু হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘোষণা ছাড়াই এ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার মান পড়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক মর্যাদাক্রমে (র্যাংকিংয়ে) বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম না থাকা, দু-একটি নাম থাকলেও তা তলানিতে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য উপাচার্য না থাকা। দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যোগ্য অধ্যাপকদের উপাচার্য করা হচ্ছে না। যোগ্যদের অনেকে আবার ওই পদে যেতেও চান না। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক দৌড়ে পিছিয়ে পড়েন। আর এসব কিছু মিলিয়ে উপাচার্য পদ অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য বা অতিমাত্রায় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের কাছে চলে যাচ্ছে।
অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বক্তব্য হচ্ছে, একজন উপাচার্য নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত সম্মতি দিলে আদেশ জারি হয় মন্ত্রণালয় থেকে। যদিও উপাচার্য কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত সাধারণত আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে থেকে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ১৩৪টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তিনজন করে ধরলে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে ৪০২ জন অধ্যাপক দরকার, যাঁদের চূড়ান্ত নিয়োগ অনুমোদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বা রাষ্ট্রপতি। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এত যোগ্য অধ্যাপক দেশে নেই, আবার এমন কোনো তালিকা মন্ত্রণালয় সংরক্ষণও করে না। এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুঁজতে হয় বলে বিরোধী দলের সমর্থক বা নিরপেক্ষ অধ্যাপকদের মধ্যে যাঁরা যোগ্য, তাঁদের একটি বড় অংশ শুরুতেই বাদ পড়ে যায়।
প্রচলিত নিয়মে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার আচার্য তথা রাষ্ট্রপতির। তবে রাষ্ট্রপতি এককভাবে এই নিয়োগ দেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে আসা নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব আকারে নথি তৈরি করে। এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বা অন্যান্য পদে কে নিয়োগ পাচ্ছেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের ওপর।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী যে অধ্যাপককে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করছেন, তাঁর উপাচার্য হওয়ার বা একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা আছে কি না, এটি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সব সময় জানা সম্ভব হয় না। তাঁকে নির্ভর করতে হয় অন্যদের ওপর। এর ফলে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ পেয়ে যান।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া ও সরকারি দলের অঙ্গ, সহযোগী বা ছায়া সংগঠনে নাম না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হওয়া অসম্ভব ব্যাপার হয়ে গেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতায় ঘাটতি থাকলেও মেনে নেওয়া হয়, পিএইচডি ডিগ্রি না থাকলেও চলে, কিন্তু নানা রংয়ের আড়ালে রাজনৈতিক আনুগত্য ও সম্পৃক্ততা ষোলো আনা থাকতেই হবে।
প্রচলিত রেওয়াজ হচ্ছে, ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা প্রথমে উপাচার্য খুঁজতে শুরু করেন। সে ক্ষেত্রে দলীয় বা আস্থাবান শিক্ষক কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তা খোঁজা হয় সবার আগে। তারপর সাংসদ, মন্ত্রী বা অন্য কোনো প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে উপাচার্যের নাম পৌঁছে যায় সরকারের শীর্ষপর্যায় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তৃণমূলের এসব পছন্দই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হয়।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্বান লোক অনেক সময় ভালো প্রশাসক না-ও হতে পারেন। তাই মেধাবী হলে বা পিএইচডি থাকলে তিনি উপাচার্য হিসেবে যে ভালো করবেন, এমনটি নয়। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে, এটি অতিমাত্রায় রাজনীতিনির্ভর হয়ে গেছে। দলীয় রাজনীতির মতো এখানেও পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়েছে, যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক মনে করেন, যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে রাজনীতির প্রভাব যত কম থাকবে, ততই তা মঙ্গলজনক।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় দেখার যে রেওয়াজ প্রায় আড়াই দশক ধরে চালু হয়ে গেছে, তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতি প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে। শিক্ষকদের বড় অংশ যতটা না শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণায় ব্যস্ত, তার চেয়ে বেশি মনোযোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ উপাচার্য থেকে নিচের দিকের হাউস টিউটরের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতায় তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে না থাকলে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ জুটবে না। মিলবে না অন্য সুযোগ-সুবিধাও।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এখন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ৩৮টি (আরও দুটি চূড়ান্ত), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যত বাড়ছে, ততই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে উচ্চশিক্ষার মান।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত রাজনীতি-সম্পৃক্ত বা প্রভাবিত অধ্যাপকেরা উপাচার্য হন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মালিকপক্ষের অনুগত শিক্ষক, যাঁদের অনেকেই আবার ওই পদের যোগ্য নন। নব্বই-পরবর্তী সময়ে এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলেও দৃষ্টান্ত হিসেবে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ঘুরেফিরে আসে জামিলুর রেজা চৌধুরী, ফরাসউদ্দিন আহমেদ, এম শমসের আলী, হাফিজ জি এ সিদ্দিকী, আইনুন নিশাত, ড. বজলুল মবিন চৌধুরীসহ গুটিকয়েক নাম।
অধ্যাদেশের অপপ্রয়োগ হচ্ছে
স্বাধীনতার পর থেকে স্বায়ত্তশাসিত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন কমপক্ষে ৬১ জন অধ্যাপক। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও তাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন অনির্বাচিত।
অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষকের অভাবও তৈরি হয়েছে। অভিযোগ আছে, আশির দশকের শেষভাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে মানের সঙ্গে আপস করা শুরু হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের আড়ালে ভোটার নিয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিকে মেধাবীরা আসতে পারছেন না, অন্যদিকে শিক্ষকতার প্রতি মেধাবীদের একটি অংশও আর আকৃষ্ট হচ্ছেন না। এই নাজুক পরিস্থিতি তৈরির জন্য সমালোচিত ও বিতর্কিত উপাচার্যদের ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষাবিদেরা মনে করেন, রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রথম গুরুত্ব দেওয়ায় উপাচার্য পদে যোগ্য লোক পেতে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। তাঁদের মতে, উপাচার্য হওয়ার মতো যোগ্য লোক অনেকেই আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বড়জোর এক-চতুর্থাংশ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একই অবস্থা জাহাঙ্গীরনগর বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষকদের অনেকেরই মত, যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদেরই খোঁজা হয়। অথচ সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নীতিমান ও দক্ষ শিক্ষক আছেন।
যদিও সংখ্যাটি কম বলে মনে করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ খারাপ ছিল না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো আর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। গত ২০-২২ বছরে আমরা সংসদীয় গণতন্ত্র, সুশাসন সেভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এর প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষায়ও পড়ছে।’
অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে যেভাবে নিয়োগ
একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। কিন্তু যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আচার্য ও উপাচার্য নির্বাচিত হন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি, গবেষক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অ্যালামনাই বা প্রাক্তনী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অংশের মানুষের প্রতিনিধিরা আচার্য ও উপাচার্যকে নির্বাচিত করেন।
বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম কেমব্রিজেও ‘দ্য রিজেন্ট হাউস’-এর সদস্যরা উপাচার্য মনোনয়ন করেন। ‘দ্য রিজেন্ট হাউস’-এর সদস্য হন বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলোর প্রধান ও ফেলো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অংশের মানুষের প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরও বোর্ড অব ওয়ারিয়রস অর্থাৎ পরিচালন সমিতির সব সদস্যই নির্বাচিত হন হার্ভার্ডের প্রাক্তনীদের মাধ্যমে।
ভারতে উপাচার্য নিয়োগ
উপাচার্য নিয়োগের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসরকার একটি সার্চ কমিটি গঠন করে, যেখানে আচার্যের মনোনীত সদস্য, ইউজিসির সভাপতি বা প্রতিনিধি ও সিনেটে মনোনীত প্রতিনিধি থাকেন। এই কমিটি তিনজনের নামের তালিকা তৈরি করে তা আচার্যের কাছে পাঠায়। আচার্য সেখান থেকে একজনকে নিয়োগ দেন।
আইন অনুযায়ী, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য উপাচার্য পদে যোগ্য হবেন না। গত ১৭ আগস্ট বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, রাজ্যের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টিতে স্থায়ী উপাচার্য না থাকায় সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপাচার্যরা রাজনৈতিক কমিটিতে
পশ্চিমবঙ্গে উপাচার্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে নিন্দা করা হয়, কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন ওই অধ্যাপকেরা। কিন্তু বাংলাদেশে উপাচার্যরা রাজনৈতিক দলের কমিটিতেও থাকেন। বিএনপি সরকারের সময়ে গঠিত শত নাগরিক কমিটিতে দেশের বিএনপি-সমর্থক প্রায় সব উপাচার্য ছিলেন, ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদে আছেন বেশির ভাগ উপাচার্য। এমনকি রাজনৈতিক দলের উপদেষ্টা বা বিভিন্ন কমিটিতে কয়েকজন উপাচার্যের নাম আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমান উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদে আছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামরুল ইসলাম খান পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব। আওয়ামী লীগ-সমর্থক এই সংগঠনটি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। মাঠে রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্তের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এর আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রখ্যাত নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ প্রাণ গোপাল ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই দফা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ওই পদে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হয়ে গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপর তিনি যুবলীগের পদ ছাড়েন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে মতবিরোধের জের ধরে তাঁকে কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে সরে যেতে হয়। এর বেশ কিছুদিন পর তাঁকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আগে তিনজন উপাচার্যের মধ্যে দুজন বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল এবং একজন আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তবে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় অতটা প্রকাশ পায়নি। কিন্তু মীজানুর রহমান উপাচার্য হওয়ার পর শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য দেন, তাঁর কর্মকাণ্ডে রাজনীতি চলে আসে সবার সামনে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান উপাচার্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। খুলনার সরকারি ব্রজলাল কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতক (সম্মান) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেন তিনি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। ১৯৯৪ সালে প্রভাষক, ২০০৭ সালে অধ্যাপক ও ২০১৩ সালে উপাচার্য হন। তাঁর এই দ্রুত উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আঞ্চলিকতার ভূমিকাই মুখ্য বলে মনে করা হয়।
গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মাহবুবুর রহমানের জীবনবৃত্তান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। চারটি প্রথম শ্রেণি থাকা এই উপাচার্য রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দীর্ঘ ফিরিস্তি দিয়ে লিখেছেন, বিএনপি-জামায়াত ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বেআইনি কর্মকাণ্ডের তিনি প্রতিবাদ করেছেন। ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হল শাখার সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ তিনি ধারণ করেন।
রাজনৈতিক নিয়োগে প্রতিদান-পদত্যাগ
রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকে যেমন উপাচার্য হন, তেমনি কেউ কেউ রাজনৈতিক কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এইচ এম জেহাদুল করিম স্থানীয় সাংসদের চাপে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং বিষয়টি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন।
গত বছরের ৪ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যকে উদ্দেশ করে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘আপনি আপনার যোগ্যতায় ভিসি হননি, প্রোভিসি হননি। আপনি আওয়ামী লীগ করেন বলে ভিসি-প্রোভিসি হয়েছেন।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিটন উপাচার্যের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি বলেছিলেন, “আমি একবার শুধু ভিসি হই, লিটন ভাই লিস্ট ধরে ধরে চাকরি দেব”।’ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের ধমক খেয়েছেন কয়েকবার, এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেশির ভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়ার পর নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেন না। স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সরকারি ছাত্রসংগঠনের ঝোঁক থাকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের দিকে। এর সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত হয় আর্থিক সংশ্লেষ। উপাচার্যদের কেউ কেউ নিজের দল ভারী করার চিন্তা করেন, কেউবা জনবল নিয়োগ জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সঙ্গে। এর সঙ্গে আছে ঠিকাদারদের সঙ্গে উপাচার্যের সুসম্পর্ক রাখার লজ্জাজনক বিষয়টি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ছাত্রদলের নেতারা ঢুকে পড়ে নিয়োগপত্র দিতে বাধ্য করেছিলেন উপাচার্য এ এম ফারুককে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন উপাচার্য আবদুল হাকিম সরকার ও এম আলাউদ্দিন অপসারিত হওয়ার নেপথ্যে ছিল জনবল নিয়োগ। উভয় উপাচার্যই নিয়োগে অনিয়ম করেন। নিয়োগের বেলায় ছাত্রলীগের সব দাবি মানতে না পারায় তারা বিশেষ পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আফতাব আহমাদ জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে কঠোরভাবে সমালোচিত হন। তাঁর সময়ে নিয়োগ পাওয়া সহস্রাধিক কর্মকর্তা–কর্মচারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এরশাদুল বারী জনবল নিয়োগসহ বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত হয়ে অপসারিত হওয়ার পর দেশের বাইরে অবস্থান করেন এবং সেখানেই মারা যান। নব্বই-পরবর্তী সময়ে দু-চারজন ছাড়া সব উপাচার্যের বিরুদ্ধেই জনবল নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল।
বর্তমান সরকারের সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দুজন নারী উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁদের নিয়ে বিতর্ক নেই বললেই চলে। তাঁদের একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খালেদা একরাম, যিনি প্রথম নারী উপাচার্য। এ বছরের ২৩ মে উপাচার্য থাকা অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেলে সরকার ২০১৪ সালের ২ মার্চ তাঁকে নিয়োগ দেয়। খালেদা একরাম ও ফারজানা ইসলাম ওই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আন্দোলন ও অস্থিরতা ছিল, যা তাঁরা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
অনুসন্ধান কমিটির অপমৃত্যু
উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনুসন্ধান কমিটির (সার্চ কমিটি) মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রাথমিকভাবে চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়কে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। ওই কমিটির মাধ্যমে তিনজন অধ্যাপকের একটি প্যানেল তৈরি করে তা আচার্যের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই প্রক্রিয়ায় তখন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগও পেয়েছিলেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সার্চ কমিটির কর্মকাণ্ড থেমে যায়। প্রজ্ঞাপন জারি করে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া ঠিক করা হলেও এটা বন্ধের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞার নেতৃত্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশনের (২০০৩) প্রতিবেদনে নিরপেক্ষ সার্চ কমিটির মাধ্যমে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ওই সুপারিশ না মেনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোগ্য এবং দলীয় শিক্ষকদের ওই পদে নিয়োগ দেয়। ইউজিসি ২০ বছরের (২০০৫-২৫) যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল, তাতেও উপাচার্য নিয়োগের জন্য জাতীয় অনুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন লিখেছেন, ‘অতীত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দলীয় বিবেচনা এই সম্মানজনক পদের নিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উপাচার্য নিয়োগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিটি হওয়া উচিত।’ (দ্য মেকিং অব এ ‘পলিটিক্যাল ইউনিভার্সিটি’, ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা: মেকিং আনমেকিং রিমেকিং, পৃষ্ঠা: ৩১১, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬)।
জানতে চাইলে সাবেক শিক্ষাসচিব ও বর্তমান জনপ্রশাসনসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থাও নেয়। তাঁর মতে, আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে ও অন্য দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করা যেতে পারে।
pintu.dhaka@gmail.com
আগামীকাল পড়ুন
অভিযুক্ত হলেও উপাচার্যরা রেহাই পেয়ে যান! রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রতিবেদন, ইউজিসি চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎকার
আরও পড়ুন...