জোয়াকিম লো বেশ চতুর ট্যাকটিশিয়ান। যত বড় ম্যাচই হোক, জয়ের রসায়নটা তাঁর ভালোই জানা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো মেধাবী খেলোয়াড়ও আছে জার্মান কোচের হাতে। সেটারই ফল পেলেন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠে।
লোর জার্মানি এদিন প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল থার্ডের ওপরে, মানে অ্যাটাকিং থার্ডের একটু নিচে বলটা রাখতে চেয়েছে নিজেদের পায়ে। মুলাররা তাদের মূল খেলাটা ওখানেই খেলল। বাতাসে বল রাখতে চেয়েছে বেশি, কারণ শুরু থেকেই এই যুদ্ধে প্রথম একাদশে ক্লোসা। আড়াআড়ি, সমান্তরাল পাসও প্রচুর খেলেছে জার্মানরা। এতে ফ্রান্সের ডিফেন্ডারা ওপরে ওঠার সুযোগ তেমন একটা পাননি। বিশেষ করে এভরার কথা বলব, তাঁকে রক্ষণেই বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছিল জার্মানির খেলোয়াড়েরা।
দুর্দান্ত প্রেসিংও করল জার্মানি। সেটা মাঝমাঠের একটু সামনে যেখান থেকে ফ্রান্সের আক্রমণটা গড়ে ওঠার কথা। ফ্রান্সের খেলোয়াড়েরা বল নিয়ে কিছু করে ওঠার আগেই দেখা গেল বল কেড়ে নেওয়া হয়ে গেছে। অথবা নিজেরা ভুল পাস দিয়েছে, অনেক সময় ব্লকিংয়ের মুখে পড়ে খেই হারিয়েছে। ফ্রান্সকে খেলা থেকে দূরে রাখার ছকটা এভাবেই করেছিলেন লো। প্রতিপক্ষকে খেলা ধরার আগেই শেষ করে দেওয়ার ট্যাকটিকসে তিনি সফল।
তার পরও ফ্রান্স আক্রমণে আসেনি, এমন নয়। কিন্তু ঠিক গুছিয়ে আক্রমণে যাওয়া তেমন হয়নি। আসলে দ্রুত গোল খেয়ে যতটা উজ্জীবিত হয়ে খেলার কথা ফ্রান্সের, ততটা লাগেনি ওদের। নিশ্চয়ই গোল শোধের জন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল দিদিয়ের দেশমের, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে ফরাসিরা ‘গোল এসে যাবে’ মানসিকতা নিয়েই খেলল। এমন ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জয়ের ক্ষুধা যেভাবে দেখানো প্রয়োজন ছিল, সেটা ফ্রান্সের খেলায় দেখলাম না।
যোগ্যতর দল হিসেবেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল জার্মানি। এই দলে মেসি-রোনালদো জাতীয় খেলোয়াড় নেই। দুর্দান্ত একটা টিম ওয়ার্কেরই ফল তুলেছে ঘরে। জার্মানি ১৩ মিনিটে গোলটা করার পরই বুঝে যাই, ওদের জালে বল পাঠানো আরও কঠিন হয়ে গেল ফ্রান্সের জন্য। জার্মানি ২ গোলে এগিয়ে গিয়ে নির্ভার থাকলে খেলাটা অন্য রকম হতে পারত। সে ক্ষেত্রে ফ্রান্স একটু জায়গা পেত খেলার। কিন্তু ১ গোল করে রক্ষণের তালা এমনভাবে মেরে দিয়েছে জার্মানি, তা খোলার সাধ্য হয়নি ফ্রান্সের।
বলতে পারেন করিম বেনজেমা শেষ মুহূর্তে অমন গোল মিস না করলে ম্যাচ তো ১-১ হয়! আমি বলব, করিম বেনজেমা তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী সেরাটাই দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তো আর মেসি-রোনালদো নন যে অবিশ্বাস্য কিছু করে ফেলবেন। অনেক সময়ই দেখা গেছে, বেনজেমা যখনই দুর্দান্ত কিছু করতে চূড়ান্ত টাচ দিতে যাচ্ছেন, তখনই তাঁকে ট্যাকল করা হয়েছে। বেনজেমাকে তাই কাঠগড়ায় তুলব না, বরং কৃতিত্ব দেব জার্মান গোলরক্ষক নয়্যারকে। যিনি দারুণ দুটি সেভ করে জার্মানির জয়ে রেখেছেন বড় অবদান।
হামেলস যে হেডে ম্যাচের একমাত্র গোলটা করলেন, সেখানেও দুই দলের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট ব্যবধান তুলে ধরল। খেলোয়াড়দের মধ্যে সূক্ষ্ম এই ব্যবধান জয়-পরাজয়ের বড় অনুঘটক। জার্মানির খেলোয়াড়েরা সূক্ষ্ম কাজগুলো ভালোভাবে করতে পেরেছেন বলেই তাঁরাই জয়ী।