বিপিএলে কাল দিনের প্রথম ম্যাচ চলছিল তখন। কিন্তু মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের প্রেসিডেন্ট বক্স অনেকটাই ফাঁকা। হাতে গোনা যে কয়জন ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এক প্রান্তে সোফায় পাশাপাশি পাওয়া গেল জাতীয় দলের কোচ ফিল সিমন্স ও সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনকে। দুজনেরই সব মনোযোগ মাঠের রংপুর রাইডার্স–নোয়াখালী এক্সপ্রেস ম্যাচের দিকে।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আর বাকি মাত্র ১৯ দিন। ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে টুর্নামেন্ট, জটিলতা শুরুর আগের সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের ভারতে যাওয়ার কথা ছিল ২৫ জানুয়ারি। কোচ–ক্রিকেটারদের ভারতের ভিসার আবেদন এখনো করা না হলেও পূরণ করে রাখা হয়েছে ভিসা ফরম। যদি হুট করে শ্রীলঙ্কায় খেলার সিদ্ধান্ত হয়; নেওয়া আছে সেই প্রস্তুতিও।
কিন্তু তবু যেন ঠিক জমাট বাঁধতে পারছে না বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপ–ভাবনা। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে কি খেলবে না, সেটাই যে নিশ্চিত নয় এখনো! অবশ্য টিম ম্যানেজমেন্টকে বিসিবি জানিয়েছে, আগামী দু–এক দিনের মধ্যে নিশ্চিত হবে সবকিছু। ক্রিকইনফোর এক খবরে কাল বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে ২১ জানুয়ারির মধ্যে।
আইসিসির প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরশুর সভায় ভারতে দল না পাঠানোর ব্যাপারে আরও একবার নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছে বিসিবি। ওদিকে কাল পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছে, ভারতে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার দাবিতে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষ নিয়েছে পাকিস্তান। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজনের আগ্রহ আরও আগেই দেখানো পাকিস্তান নাকি এবার বলেছে, বাংলাদেশের দাবি পূরণ না হলে বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে তারাও।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের খবর, ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতির সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে পিসিবি। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ভারত সফরে দল না পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে এ ব্যাপারে বিসিবি বা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
শ্রীলঙ্কায় খেলতে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রুপ বদলের প্রস্তাবে আইসিসি ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ার পরই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার খবর সামনে এল। পরশু আইসিসির সঙ্গে সভায় শ্রীলঙ্কায় খেলা সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে গ্রুপে অদলবদলের প্রস্তাব দেয় বিসিবি।
পাকিস্তানের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জিও নিউজ বলেছে, বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে না সরিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হলে পাকিস্তানও টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। পাকিস্তান মনে করে, বাংলাদেশের দাবি যুক্তিসংগত এবং তা পূরণ করা উচিত। অবশ্য পিসিবি থেকে নাকি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে আগেই বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের দাবি মেনে ভারত থেকে তাদের ম্যাচ না সরালে পাকিস্তান সবাইকে চমকে দেওয়ার মতো কিছু করবে।
তবে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানে অটল থাকবে কি না, সেটা বড় প্রশ্ন। কারণ, বিশ্বকাপ না খেললে আইসিসি থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্বের ভাগ হারাতে হবে পিসিবিকে। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র অবশ্য দাবি করছে, পিসিবি তাদের এই মনোভাবের কথা এরই মধ্যে আইসিসিকে জানিয়েছে। যদিও অনেকের ধারণা, পাকিস্তানের এই অবস্থান মূলত দেশটির ভারতবিরোধিতার অংশ। বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক বছর ধরেই প্রভাব ফেলছে দুই দেশের ক্রিকেটে। সর্বশেষ তা চরমে পৌঁছায় গত টি–টুয়েন্টি এশিয়া কাপে, যখন এসিসি ও পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দল। এর কড়া জবাব দিতে গিয়ে ট্রফিটাই এখন পর্যন্ত ভারতকে দেননি নাকভি। এশিয়া কাপের ট্রফি বাক্সবন্দী পড়ে আছে দুবাইয়ের এসিসি কার্যালয়ে।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশ–ভারত মুখোমুখি অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভারতের ওপর চাপটা হয়তো আরও বাড়াতে চায় পাকিস্তান। এখনো ভারতের বাইরে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার আশায় থাকা বিসিবিরও শেষ ভরসা—পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থানে অটল থাকে! কারণ, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিশ্বকাপে না খেলা মানে বিশ্বকাপের আয়ে বড় টান পড়া। আইসিসি ও বিসিসিআই হয়তো সেই ক্ষতি স্বীকার করতে চাইবে না।
শ্রীলঙ্কায় খেলতে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রুপ বদলের প্রস্তাবে আইসিসি ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ার পরই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার খবর সামনে এল। পরশু আইসিসির সঙ্গে সভায় শ্রীলঙ্কায় খেলা সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে গ্রুপে অদলবদলের প্রস্তাব দেয় বিসিবি। বাংলাদেশকে ‘সি’ গ্রুপ থেকে ‘বি’ গ্রুপে এবং আয়ারল্যান্ডকে ‘বি’ গ্রুপ থেকে ‘সি’ গ্রুপে নিলে বাংলাদেশের সব খেলা পড়বে শ্রীলঙ্কায় আর আয়ারল্যান্ডের সব ম্যাচ ভারতে।
কিন্তু আইসিসি বিসিবির এই প্রস্তাবে তেমন আগ্রহ দেখায়নি বলে জানিয়েছে সূত্র। তারা উল্টো বিসিবিকে এটা বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে যে অবস্থান বদলে বাংলাদেশ দল যেন ভারতেই বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যেতে রাজি হয়। কলকাতা ও মুম্বাইয়ে দলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দিয়েছেন সভায় সশরীরে ও অনলাইনে যোগ দেওয়া আইসিসির দুই প্রতিনিধি।
জবাবে বিসিবি দেখিয়েছে আগের যুক্তি—খেলোয়াড়দের না হয় নিরাপত্তা দেওয়া হলো, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দর্শক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী! আইসিসি ভারতে খেলা দেখতে গেলে বাংলাদেশের দর্শকদের ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবতা হলো, দলের বাইরের কারও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া আসলে কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ভারতে দল পাঠাবে না। বাংলাদেশের গ্রুপ বদলানোর প্রস্তাবও দৃশ্যত নাকচ করে দিয়েছে আইসিসি। ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের খবর, আইসিসি এরই মধ্যে গ্রুপ বদলানো হবে না বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে আয়ারল্যান্ডকে। বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে বিশ্বকাপে সুযোগ দেওয়া হতে পারে স্কটল্যান্ডকে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের চাপেও যদি কাজ না হয়, এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপটা সম্ভবত হবে বাংলাদেশকে ছাড়াই।