সংবাদ সম্মেলনের নাজমুল নিজেই দায়িত্ব নিলেন সেলফি তোলার। আজ পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পর।
সংবাদ সম্মেলনের নাজমুল নিজেই দায়িত্ব নিলেন সেলফি তোলার। আজ পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পর।

পাকিস্তানের সঙ্গে জয় থাকবে, থেকে যাবে এসব মুহূর্তও

স্কোরবোর্ডে টাঙানো বড় বড় সংখ্যাগুলো নেমে গেছে ততক্ষণে। লাল চাতালের তিন তলা ভবনটাও নীরব হয়ে এসেছে প্রায়। মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্যামেরাগুলো সরে গেছে। টিলার সবুজ সুন্দর গ্যালারিতে খাঁ খাঁ শূন্যতা। কোথাও কেউ নেই পুরো মাঠজুড়ে। এসব খণ্ড খণ্ড ছবির সময় ঘড়ির কাঁটায় ঠিক তিনটা।

এখনকার যুগে কাঁটার ঘড়ি দেখা মেলে কালেভদ্রে। ডিজিটাল ডিভাইসের সংখ্যাই বেশি দৃশ্যমান বহুদিন ধরে। সেই সময় কি পিছিয়ে দেওয়া যায় চাইলেই? তাহলে ২০২৬ সালের ২০ মের সকাল ১১টা ২০ মিনিটে থমকে দেওয়া যাক তা। কারণ? বহু বছর পর ক্রিকেটে যখন বাংলাদেশের লোকগাথা লেখা হবে, এই সময়েই তো ফিরে আসতে হবে বারে বারে!

তাইজুল ইসলাম চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর আওয়াজটা শুনতে পেলেন সবাই, ‘এই তামিম, ক্যাচ! বলটা (বাউন্ডারি লাইনের ভেতরে) আছে’—যতক্ষণে তা মুঠোয় বন্দি হলো তানজিদ হাসান তামিমের, হয়তো ঠিক ওই মুহূর্তটাতেই ফিরতে হবে। টানা চার টেস্টে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাস তো লেখা হলো তখনই।

পাকিস্তানের শেষ উইকেট পড়ার পর তাইজুলকে নিয়ে সবার উল্লাস।

কিংবা আরও ১২ বল আগে। একটু একটু করে ‘চাপে’ ফেলে দেওয়া সাজিদ খান নাজমুলের হাতে স্লিপে ক্যাচ তুলে দিলেন যখন, তখন। অথবা ওই আউটটার আরও ৫ বল পরে, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মোহাম্মদ রিজওয়ান ক্যাচ দিয়ে ড্রেসিংরুমে হাঁটা ধরলেন, তখন। যিনি প্রায় একাই বাংলাদেশের জয় কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন!

আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন রিজওয়ান।

অথবা চাইলে ফ্রেমে আটকে রাখা যায় আরও কিছুক্ষণ পরের কিছু ছবিও। ম্যাচটা শেষ হওয়ার ঠিক পরপর, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হয়নি তখনও। পুরো দলটাই একসঙ্গে এগিয়ে এল পিচের কাছে ছবি তুলতে। ট্রফি ছাড়া এমন ছবি তুলতে দেখা যায় না তেমন। তাহলে? স্পোর্টিং পিচেও বাংলাদেশ যে বলেকয়ে কাউকে টেস্ট হারিয়ে দিতে পারে, সেই কর্তৃত্বটা বোঝাতেই কি!

কিংবা আরও পরে। মাঠে লোকে ভরে গেছে ততক্ষণে। তাদের আড়াই যুগের লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে আসা মুহূর্তটা বন্দি করে রাখার চাওয়া। যখন যে ক্রিকেটারই আসছেন, তারা অভিনন্দন পাচ্ছেন, পিঠ চাপড়ানোও। ডিজিটাল যুগে ছবি স্মৃতি আটকে রাখার প্রধান মাধ্যম, তাও চলছে একটু পরপর। তা তিনি বড় কর্মকতা হন, মাঠকর্মী হোন অথবা নিরাপত্তাকর্মী, তাতে কীইবা যায় আসে— সবাই দিন কিংবা মুহূর্ত ধরে রাখতে চান নিজের কাছে।

অধিনায়ককে নাজমুলকে ছবি তোলার জন্য ঘিরে ধরেছিলেন আলোকচিত্রীরা

অধিনায়ক নাজমুল হোসেন ছবি তুলতে তুলতে ক্লান্ত হয়ে যান যখন, চাইলে আটকে রাখা যায় ওই মুহূর্তটাও। তিনি তখন মনে করান, ‘সংবাদ সম্মেলন আছে তো!’ যে পথটা তাঁর চেনা বহুদিন ধরে। যেখানে গিয়ে তাঁকে বহুবারই দিতে হয়েছে এমন উত্তর, ‘অনেক ট্রোল সহ্য করেই তো আপনি…’

নাজমুল জানতেন, ওখানে এখন স্তুতির কথাই শোনা যাবে। নাজমুল তাই তাড়া দেন, ‘এই রাবিদ (বিসিবির সিনিয়র মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম) ভাই চলেন, যাই!’

ড্রেসিংরুমে ফিরে ট্রফিটা নিয়েই অধিনায়ক আসেন উল্টো পথের কক্ষে। নাজমুল আসতে আসতে তাঁকে ঘিরে ধরে অনেকগুলো ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন। জানতে চাওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর একটা ছবির ক্যাপশন নিয়েও, ‘এখন কি সত্যিই গ্যাংস্টার প্যারাডাইসের নায়ক মনে হচ্ছে নিজেকে?’

সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হোসেন।

নাজমুল কিছু বলেন না উত্তরে, শুধু হাসেন। যে হাসিটা বহু বছর পরও খুঁজে ফিরবেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা টেস্ট অধিনায়ক হয়ে কেমন লাগছে, এভাবে সিরিজ জিততে পারার অনুভূতি কী কিংবা টেস্টে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা— নাজমুলের কাছে যায় এমন প্রশ্ন। তিনি তাঁর উত্তর দেন এমনভাবে, যেন তিনিই এখন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচে এখন বাংলাদেশ, টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়েও ৭ এ; আগেরটা স্বপ্নের মতো ছিল কয়েক বছর আগেও, পরেরটা ঘটেনি কখনো। এসব সংখ্যা বদলে যাবে সময় গেলেই। পাকিস্তানকে টেস্টে ঘরে–বাইরে ধবলধোলাই করা প্রথম দল বাংলাদেশ; তখন ধূসর হবে এই স্মৃতিও।

কিন্তু থেকে যাবে তৈরি হওয়া মুহূর্ত। যেখানে মুশফিকুর রহিম মধ্যমণি হয়ে ওঠেন উদযাপনের, নাহিদ রানা বড় তারকা হয়ে ওঠেন যেই সময়ে, লিটন ত্রাতা হন বিপদে, তাইজুল বহুবারের পরও আরও একবার এনে দেন ব্রেক থ্রু— এমন আরও অনেক স্মৃতিও।

টেস্ট সিরিজের ট্রফি নিয়ে বাংলাদেশের উল্লাস

নাজমুল তবু এসে বলেন, ‘যাঁরা খেলেনি, মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, কোচিং স্টাফের অংশ…সবারই অবদান এই জয়ে।’ এভাবে সিরিজ জিতেও উদযাপনে সংযমী হন অধিনায়ক, ‘আরও অনেক ভালো ভালো অর্জন হবে।’

কিংবা ওই মুহূর্তটাও বন্দি থাকবে, যখন নাজমুলের মুখটা সেলফিতে সবার আগে থাকে। পেছনে? যাঁরা তাদের খবর লিখে যান সারা বছর, থাকেন তারা। মুহূর্তটা যে তাদের জন্যও স্পেশাল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্যও কী নয়!