ভারত ক্রিকেট দল
ভারত ক্রিকেট দল

নিজেদের মাঠ, দর্শকের সমর্থন আর দুর্দান্ত ফর্ম—তবু ভারতই চাপে

স্বাগতিক হওয়াটা কি সব সময়ই সুবিধাজনক?

চেনা মাঠ, চেনা কন্ডিশন, দর্শকদের বিশাল সমর্থন—এ রকম কিছু সুবিধা তো পাওয়া যায়ই। তবে সেই সঙ্গে বোঝা হয় প্রত্যাশার যে বিশাল চাপটা, তা সামলানো মোটেও সহজ নয়। আর সেই চাপ বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের চেয়ে বেশি আর কোনো দল বোধ হয় টের পায় না।

আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে আগামীকাল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে লড়তে হবে দেড় শ কোটি মানুষের হিমালয়সম প্রত্যাশার চাপ নিয়ে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতা কিংবা টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া—টি-টুয়েন্টির ইতিহাসে এর আগে কোনো দেশই এটা করে দেখাতে পারেনি। সূর্যকুমার যাদবের দল কি পারবে ইতিহাসটা নতুন করে লিখতে?

আহমেদাবাদের গ্যালারিতে থাকা এক লাখের বেশি ক্রিকেটপাগল দর্শক আর টিভির পর্দায় চোখ রাখা কোটি কোটি ভারতীয়র প্রত্যাশার চাপ কেমন হতে পারে, তা ভালোই জানা সূর্যকুমারদের। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৭ রানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর ভারতীয় অধিনায়ক বলছিলেন, ‘চাপ আর স্নায়ুর পরীক্ষা তো অবশ্যই থাকবে। বিশেষ করে নিজের দেশে খেলে শিরোপার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে দলের ছেলেরা এবং পুরো সাপোর্ট স্টাফ এই ম্যাচ নিয়ে দারুণ রোমাঞ্চিত।’

প্রতিপক্ষ হিসেবে নিউজিল্যান্ড সহজ হবে না ভারতের জন্য

ভারতের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক দল, যারা এই বিশ্বকাপে অনেক সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে ফাইনালে এসেছে। অপরাজিত দক্ষিণ আফ্রিকাকে সেমিফাইনালে ৯ উইকেটে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে ওঠেছে নিউজিল্যান্ড।

ইডেন গার্ডেনের সেমিফাইনালে ফিন অ্যালেনের মাত্র ৩৩ বলের ঝোড়ো সেঞ্চুরি দেখেছে বিশ্ব। এখন কিউইদের প্রবল বিশ্বাস, স্বাগতিকদের মাটিতেই তাদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের স্বাদ নিতে পারবে তারা। অ্যালেনের কণ্ঠে সেই আত্মবিশ্বাস, ‘আমরা বেশ ভালো ছন্দে আছি। আমার মনে হয়, নিজেদের সেরা ক্রিকেটটা খেলতে পারলে আমরা যে কাউকে হারাতে পারি।’

ভারত ফাইনালে এসেছে বেশ কাঁটায় ভরা পথ পেরিয়ে। সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল তারা। সেখান থেকে জিম্বাবুয়েকে ৭২ রানে হারানো কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৯৪ রান তাড়া করে জেতা—প্রতিটি ম্যাচই ছিল অঘোষিত নকআউট।

সেমিফাইনালে হ্যারি ব্রুকের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২৫৩ রানের পাহাড় গড়েও স্বস্তিতে ছিল না ‘মেন ইন ব্লু’রা। শেষ পর্যন্ত যশপ্রীত বুমরার জাদুকরী ১৮তম ওভারই বলা যায় ভারতকে ফাইনালের টিকিট এনে দিয়েছে। ১৮ বলে যখন ৪৫ দরকার, সেই সময় ১৮তম ওভারে বোলিংয়ে এসে বুমরা দিয়েছেন মাত্র ৬ রান! জ্যাকব বেথেলের ১০৫ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংসের পরও তাই শেষ হাসিটা হাসতে পারেনি ইংল্যান্ড।

বিশ্বকাপে অভিষেক ছন্দে নেই

তবু ভারতের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ হয়ে আছে ওপেনার অভিষেক শর্মা ও স্পিনার বরুণ চক্রবর্তীর ফর্ম। আইসিসি টি-টুয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে এই দুজনই আছেন ১ নম্বরে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে দুজনের পরিসংখ্যানই বেশ হতাশার। গ্রুপ পর্বে অভিষেক টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হয়েছেন!

পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর বলার মতো স্কোর কেবল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি ফিফটি। আর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে গত পরশু ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা যেন বরুণ চক্রবর্তীর ওপর রীতিমতো রোলারকোস্টার চালিয়েছেন! ৪ ওভারে এই স্পিনার দিয়েছেন ৬৪ রান। গ্রুপ পর্বের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি নিতে পেরেছেন মোটে ৪টি উইকেট।

অন্যদিকে মিচেল স্যান্টনারের নিউজিল্যান্ড যেন এক অদ্ভুত ধাঁধা। কখনো দারুণ, কখনো ছন্নছাড়া! এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছিল তারা। তবে আসল সময়ে এসে দলের সব খেলোয়াড় সেরা ছন্দে ফিরেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে ফাইনালে নামা কিউইদের আসলে হারানোর কিছুই নেই।

কিউই ওপেনার টিম সাইফার্ট টুর্নামেন্টে তিনটি ফিফটি করেছেন। ফিন অ্যালেন আর গ্লেন ফিলিপসদের ঝড় তোলার জন্য দারুণ একটা মঞ্চ তিনি নিয়মিতই তৈরি করে দিচ্ছেন। সেমিফাইনালে প্রথম উইকেটে ৯.১ ওভারে দুজন মিলে তুলেছিলেন ১১৭ রান, যেখানে সাইফার্টের অবদান ছিল ৩৩ বলে ৫৮ রান।

সেমিফাইনালে মাত্র ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করেছেন নিউজিল্যান্ডের ফিন অ্যালেন

সেই ম্যাচের পর সাইফার্টকে নিয়ে মুগ্ধ অ্যালেন বলেছিলেন, ‘আমি মূলত টিমের (সাইফার্ট) জন্য একটা সাপোর্টিং রোল প্লে করার চেষ্টা করেছি। সে অবিশ্বাস্য ফর্মে আছে। দারুণ একজন খেলোয়াড় এবং বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে সে কী করতে পারে। আমার মনে হয়, ওর এমন ব্যাটিং আমার কাজটা সহজ করে দিয়েছে। আমি নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে যেন গ্যালারির সেরা সিট থেকে ওর খেলা উপভোগ করেছি।’
সাইফার্টের ধারাবাহিকতা আর অ্যালেনের টর্নেডো ইনিংস—দুইয়ে মিলে নিউজিল্যান্ডের ওপেনিং এখন আগুনের ফুলকি। সেই আগুনের আঁচ ভারতের বোলারদের গায়ে কতটা লাগে, কাল সেটাই দেখার অপেক্ষা।