টেস্ট সিরিজের ট্রফি হাতে পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন।
টেস্ট সিরিজের ট্রফি হাতে পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন।

সিলেট টেস্ট

বাবরের ফেরার ম্যাচে বাংলাদেশ তাকিয়ে সিরিজ–জয়ে

মেঘে ঢেকে থাকা আকাশে আঁধার নেমেছে। পড়ছে টুপটাপ বৃষ্টি। সবুজ টিলা দেখা যাচ্ছে চোখ মেললে। একটু দূরে উঁকি দিলে টিলার ওপর আছে সবুজ চা–বাগানও। এতক্ষণে আপনার চোখের সামনে যে ছবিটা ভেসে এসেছে, তাতে নিশ্চয়ই বলতে ইচ্ছা করছে, ‘আহ্‌, আবহাওয়া!’

তাহলে এবার ভাবুন পাকিস্তান দলের ক্রিকেটারদের কথা। এ রকম পরিবেশে তাদের যে লড়াইটা করতে হচ্ছে, তা পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আসা প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদের একটা অংশ শুনলেও বুঝতে পারবেন।

তাঁর কাছে প্রশ্নটা ছিল এমন, মিরপুর টেস্টের পর তো আপনাদের নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে, বিশেষত সিনিয়র ক্রিকেটারদের, তা আপনাদের মধ্যে এ নিয়ে কী আলাপ হচ্ছে? উত্তরে তিনি এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গি আর মুখটা গম্ভীর করে ‘ওসব তো আমাদের জন্য নতুন নয়’ বললেন, তাতে অসহায়ত্বটা না দেখলে বোঝা মুশকিল।

আগামী পাঁচ দিনে তা বেড়ে যেতে পারে আরও। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে কোনো দলই টানা চার টেস্ট হারেনি—মিরপুর টেস্টে হারের পর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের এখন টানা তিন হারের ‘টাই’। সিলেটে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্ট পাকিস্তান হেরে গেলে রেকর্ডটা হয়ে যাবে তাদের একার।

অবশ্য ম্যাচটা যদি ঠিকঠাক হয়, তাহলে। গতকালও মুষলধারার বৃষ্টিতে দুই দলের অনুশীলনের বেশির ভাগটাই আটকে রাখতে হয়েছে ইনডোরে। শুধু তো অনুশীলনে বাগড়া হয়ে নয়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ঠিক থাকলে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টি আসার কথা প্রায়ই। ম্যাচটাও তাই থমকে যাওয়ার কথা বারবার। শেষ পর্যন্ত যদি আবহাওয়া ম্যাচটা ঠিকঠাক মাঠে গড়াতে না দেয়, তাহলেও অবশ্য সিরিজ জিতবে বাংলাদেশই।

পাকিস্তান এখন বড়জোর সিরিজ বাঁচাতে পারে

পাকিস্তান এখন বড়জোর সিরিজ বাঁচাতে পারে। এমন ম্যাচে নামার আগে তাদের জন্য সুসংবাদ বলতে অভিজ্ঞ বাবর আজমের ফেরা। এ ছাড়া সবকিছু আগের মতো। সিলেটের উইকেটে কাল পর্যন্ত যা ঘাস ছিল, তাতে বাংলাদেশের পেসারদের কাছে আরও একবার বিধ্বস্ত হওয়ার সব আশঙ্কা পাকিস্তানের আছে। কাল বিকেলে তাই রীতিমতো দল বেঁধে পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা উইকেট দেখেছেন।

সেখানে অবশ্য খুব একটা রহস্য ওই অর্থে নেই। এই মাঠেই গত মাসেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে যাওয়া মুশফিক কাল আশ্বস্ত করে গেছেন, এখানকার ড্রেনেজ সিস্টেম মিরপুরের মতোই ভালো; বৃষ্টি থামলে খেলা শুরু হতে খুব বেশি সমস্যা হয় না। এমনিতে ব্যাটসম্যানদেরই উইকেট বেশি সাহায্য করবে। মুশফিকের মত, বৃষ্টির কারণে হয়তো তাতে আর্দ্রতাটা থাকবে।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে অবশ্য বদলটা অবধারিতই। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে তা আসলে ওপেনিংয়ে। আগের ম্যাচের দুই ইনিংসে ১৮ ও ১৫ রানের জুটি গড়া সাদমান ইসলাম ও মাহমুদুল হাসানের কেউই হয়তো থাকবেন না আজ। বুকের ব্যথায় সাদমানের না থাকাটা গত পরশুই নিশ্চিত হয়ে গেছে। আঙুলে চোট পাওয়া মাহমুদুলও গতকাল অনুশীলনের সময় শুধু ফিল্ডিংটাই করেছেন।

মাহমুদুল খেলুন আর না–ই খেলুন, একজনের কিন্তু টেস্ট অভিষেক হওয়া একরকম নিশ্চিত। তাঁর নাম তানজিদ হাসান। গত কিছুদিন খোঁজখবর কম রাখলে হুট করে একটু খটকা লাগতে পারে—সাদা বলের আক্রমণাত্মক এই ওপেনার আবার টেস্টে কেন!

আজ অভিষেক হতে পারে তানজিদের

আগের টেস্টের দলেও তানজিদ ছিলেন। ওই ম্যাচে তাঁকে না রাখলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪০.৭২ গড়ে রান করা তানজিদের সিলেট টেস্টে অভিষেকটা একরকম নিশ্চিত। টেস্টে যেহেতু ওপেনাররা তেমন সুবিধা করতে পারছেন না, বাংলাদেশ চাইছে একটু আক্রমণাত্মক ঝাঁজ এনে শুরুতে যদি কিছু রান তুলে ফেলা যায়। ওই ভাবনা থেকেই তানজিদকে দলে নেওয়া।

তানজিদের সঙ্গে মাহমুদুল খেলার মতো অবস্থায় ফিরতে না পারলে কপাল খুলবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ফেলে হুট করেই সিলেটে আসা জাকির হাসানের। খারাপ ফর্মেই ২০২৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর আর জাতীয় দলের হয়ে খেলা হয়নি তাঁর। আগের ম্যাচে খেলা তিন পেসার ইবাদত হোসেন–নাহিদ রানা–তাসকিন আহমেদের একজনকে বিশ্রাম দিয়ে সুযোগ হতে পারে শরীফুল ইসলামেরও।

একাদশে এসব রদবদলের ভিড়ে বাংলাদেশের ভাবনাটা পরিষ্কার, মিরপুর টেস্টের তাল–লয়–ছন্দ ধরে রাখতে হবে। সিরিজ জেতার চ্যালেঞ্জটাও তাতে সীমিত হয়ে আসবে। একাদশে যেসব বদল আসছে, তা-ও খুব একটা ব্যবধান গড়ার কথা নয়। পাকিস্তানেরই দুশ্চিন্তাটা বেশি।

সরফরাজ যতই বলুন, ‘খারাপ খেললে সমালোচনা তো হবেই’, কিন্তু ঝড়টা টের পান তিনিও। দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হারের সময় তিনি ছিলেন ক্রিকেটার, এখন ভূমিকা বদলে প্রধান কোচ। এবারও যদি সিরিজ হারতে হয়, তাহলে ওই ঝড়ের তীব্রতায় পাকিস্তান ক্রিকেটের এলোমেলো হয়ে যাওয়ার কথা আরও।

সরফরাজের কাছে তাই মিরপুর টেস্ট যতই ‘অতীত’ হোক, বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই তা ফিরিয়ে আনতে চাইবে।